No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    পর্দাপ্রথা উপেক্ষা করেই সংখ্যালঘুদের ‘মডেল’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন নুরজাহান বেগম 

    পর্দাপ্রথা উপেক্ষা করেই সংখ্যালঘুদের ‘মডেল’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন নুরজাহান বেগম 

    Story image

    যে সময় তাঁর জন্ম, তখনও দেশভাগ হয়নি। অখণ্ড অবিভক্ত বাংলা। নবজাগরণের আলো তখনও বাংলার গ্রামে গ্রামে ঢুকে পড়েনি। মুসলিম জনসমাজের ছবিটা আরও অনগ্রসর, রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপে তখন মুসলিম মহিলারা পর্দানসীন পণ্যমাত্র। যে সমাজে মহিলারা প্রকাশ্যে কর্মজীবনেই পদার্পণ করতে পারেন না, সেখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে মহিলা লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা কিংবা প্রথম একটি মহিলাদের সচিত্র পত্রিকা সম্পাদনার ভার নেওয়া যে কত দুষ্কর এবং দুঃসাহসিক কাজ তা আলাদা করে বলাই বাহুল্য। সেই কাজটাই করেছিলেন এক মহিয়সী নারী – নুরজাহান বেগম (Nurjahan Begum)। বাংলাদেশের (Bangladesh) প্রথম মহিলা সাংবাদিক হিসেবেই সকলে চেনে তাঁকে।

    ১৯২৫ সালের ৪ জুন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির চাঁদপুর জেলার অন্তর্গত চালিতাতালি গ্রামেই জন্ম নুরজাহানের। বাবা সওগাত পত্রিকার বিখ্যাত সম্পাদক মহম্মদ নাসিরউদ্দিন। ‘সওগাত’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠাও করেছিলেন তিনি নিজেই। ফলে ছোটোবেলা থেকেই পত্র-পত্রিকা, লেখক-লেখিকাদের এক মহলের মধ্যেই বড়ো হয়েছেন নুরজাহান। বাবার সম্পাদিত ‘সওগাত’ পত্রিকার পাতাতেই ঈদ সংখ্যায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে নুরজাহানের প্রথম লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে মহম্মদ নাসিরউদ্দিন মহিলাদের জন্য প্রথম একটি সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন ‘বেগম’ (Begum) নামে। সময়টা ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই। পত্রিকাটি প্রকাশ হওয়ার পর পরই বাংলাদেশের মুসলিম মহিলাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বহু মুসলিম লেখিকা সমাজের প্রতিবন্ধকতার কারণে যারা আত্মপ্রকাশ করতে পারছিল না, তাদের কাছে এই ‘বেগম’ পত্রিকাই হয়ে উঠেছিল আত্মপ্রকাশের একমাত্র অবলম্বন। এর মাঝেই প্রথাগত পড়াশোনাও চলছিল নুরজাহানের। আরেক বিখ্যাত মহিলা সমাজ-সংস্কারক বেগম রোকেয়ার অনুরোধেই নুরজাহান বেগম ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল হাই স্কুলে (Sakhawat Memorial High School)। সেখান থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে তিনি ভর্তি হন লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে (Lady Brabourne College)। ১৯৪৬ সালে বি.এ উত্তীর্ণ হন নুরজাহান বেগম।

    চার আনা মূল্যের সেই বেগম পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রচ্ছদে ছাপা হয় বেগম রোকেয়ার ছবি। এরপর থেকে এই প্রচ্ছদের জন্য বহু মুসলিম মহিলাকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এও এক সুপ্ত প্রতিবাদই বলা চলে।

    পরের বছরেই দেশভাগ। অবধারিতভাবে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কলকাতায় (Kolkata) বসে পত্রিকা চালানো দুষ্কর হয়ে পড়ে। ফলে ১৯৫০ সালে ‘বেগম’ পত্রিকার দপ্তর কলকাতা থেকে চলে আসে ঢাকায়। পুরোনো ঢাকার পাটুয়াটুলিতে এই পত্রিকার স্থায়ী দপ্তর ছিল। তখন বেগম সুফিয়া কামালের (Begum Sufia Kamal) সম্পাদনায় প্রকাশিত হত এই পত্রিকা, নুরজাহান তখন তাঁকে সহায়তা করতেন নানাভাবে। পরে পত্রিকা সম্পাদনার ভার নেন নুরজাহান বেগম। একেবারে হু হু করে ৫০০ কপি পত্রিকা বিক্রি হয়ে যেত তখন। চার আনা মূল্যের সেই বেগম পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় প্রচ্ছদে ছাপা হয় বেগম রোকেয়ার (Begum Rokeya) ছবি। এরপর থেকে এই প্রচ্ছদের জন্য বহু মুসলিম মহিলাকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এও এক সুপ্ত প্রতিবাদই বলা চলে। পর্দানসীন মহিলারা যেখানে প্রকাশ্যে নিজের মুখাবয়বই দেখাতে পারতেন না, সেখানে একটি বহুল জনপ্রিয় পত্রিকার প্রচ্ছদে মুসলিম মহিলাদের ছবি ছাপার জন্য যথেষ্ট দুঃসাহস লাগে যা নুরজাহান বেগমের মধ্যে ছিল। আর সেই সাহসের দীপ্তিটাই তিনি সঞ্চারিত করেছিলেন সেকালের অন্যান্য সকল মুসলিম মহিলাদের মধ্যে। সে সময় বছরে মোট ৪৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হত ‘বেগম’-এর। ‘ইদ সংখ্যা’, ‘বিশ্বনবী সংখ্যা’ ইত্যাদি বিশেষ সংখ্যাগুলি ঢাকার দপ্তর থেকেই প্রকাশিত হত। যেখানে মুসলিম মহিলারা নিজেদের ছবিও তুলতে পারতেন না, সেখানে ‘বেগম’ পত্রিকার ‘ইদ সংখ্যা’য় নুরজাহানের সম্পাদনায় প্রচ্ছদে লেখিকাদের নামের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেকের ছবিও থাকতো যাতে তাঁরা নিজেরা পরস্পরকে চিনতে পারে।

    ‘বেগম’ পত্রিকার পাশাপাশি ‘বেগম ক্লাব’ও (Begum Club) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নুরজাহান বেগম। পাটুয়াটুলির অফিসেই বছরে অন্তত একবার করে পত্রিকার সমস্ত লেখিকাদের একত্রিত করার উদ্দেশ্যেই এই ক্লাব গঠন করেছিলেন নুরজাহান। অদ্ভুতভাবে শুধুই মুসলিম মহিলা সমাজে নয়, মুসলিম পুরুষদের মধ্যেও এই ‘বেগম’ পত্রিকা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা সাংবাদিক (Journalist) হয়ে ওঠার শিরোপা পেয়েছিলেন নুরজাহান। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদক দিয়ে সম্মান জ্ঞাপন করে। স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজে মহিলাদের উন্নয়নের লক্ষ্যে নুরজাহানের সম্পাদনায় এই ‘বেগম’ পত্রিকা বহুদিন পর্যন্ত এক বিরাট অবদান রেখেছিল। বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষত মহিলারা তাই আজও ভোলেননি নুরজাহান বেগমের নাম।

     

    ঋণ - 

    ‘বেগম’-এর নুরজাহান বেগম, সুমনা শারমিন, প্রথম আলো, ২৩ মে ২০১৬

    বেগম পত্রিকা যেভাবে গড়ে তুলেছিলেন নুরজাহান বেগম, আকবর হোসেন, বিবিসি বাংলা, ঢাকা, ২৩ মে ২০১৬ 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @