No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    উত্তর কলকাতার রকের আড্ডা : চায়ের কাপে তুফান আর হৃদয়ে বিপ্লব

    উত্তর কলকাতার রকের আড্ডা : চায়ের কাপে তুফান আর হৃদয়ে বিপ্লব

    Story image

    টলডাঙার টেনিদা (Tenida) পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিলেন না। সাতবারের চেষ্টাতে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেছিলেন তিনি। তাঁর মতে, পাশ করাতে কোনো বাহাদুরি নেই। দু-পাতা বিদ্যে পড়ে কত ছেলেই পাশ করে যাচ্ছে টকাটক। খাতা ভরে লিখে আসার পরেও যে টেনিদাকে কেউ পাশ করাতে পারছে না, সেখানেই তো তাঁর কৃতিত্ব। চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে খাঁড়ার মতো নাকওয়ালা টেনিদা আর তাঁর সাগরেদদের নিত্যকার আড্ডা। চাটুজ্যেদের রোয়াকে বসে চলা সাগরেদদের সঙ্গে নিয়ে আড্ডা, গল্প, কাজকর্ম নিয়েই নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের (Narayan Gangopadhyay) টেনিদা।

    এবার ঘনাদার (Ghanada) আড্ডা। কলকাতার ৭২নং বনমালী নস্কর লেনের মেসবাড়ি। সেখানেই জমাটি আড্ডা। আড্ডায় ঢুকে কারো কাছ থেকে সিগারেট নিয়ে তাঁকে ধন্য করে দামোদরের বন্যার প্রসঙ্গটাকে কেড়ে নিয়ে তাহিতি দ্বীপের টাইডাল ওয়েভ বা ভয়ংকর সমুদ্র-জলোচ্ছ্বাসে নিয়ে গিয়ে ফেলেন বিস্ময়াহত মুখ্য শ্রোতাদের এবং আমাদেরও। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং ঘনাদা ওরফে ঘনশ্যাম দাশ, যাঁর রূপকার প্রেমেন্দ্র মিত্র (Premendra Mitra)।

    উত্তর কলকাতার রোয়াক

    তাহলে বুঝে দেখুন, একসময়ে আড্ডার কী বহরটাই না ছিল! উত্তর কলকাতার রকের আড্ডাটা (North Kolkata Adda) আজ আর নেই। ষাটের দশকের উত্তর কলকাতা পাড়া সংস্কৃতির পীঠস্থান, আর তার গর্ভগৃহটি হল রোয়াক বা রক। শুধু টেনিদা বা ক্যাবলা, প্যালারা নন। যুবক থেকে প্রৌঢ়, সকলেরই ঠাঁই সেখানে। ঘনাদার চিলেকোঠার আড্ডা ছিল অন্যরকম। কিন্তু রকের আড্ডায় রাজনীতি থেকে যামিনী রায়, মোহনবাগান থেকে সোফিয়া লোরেন মিশে যেতেন অনায়াসে। সেই আড্ডা আজ নেই বললেই চলে।

    সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানচিত্রে পরিবর্তন। আয়তনে বড়ো হয়েছে কলকাতা শহর। কিন্তু সংখ্যায় কমেছে কলকাতার (Kolkata) বাড়ি। এ কালের কলকাতায় পাড়াগুলি বদলে গেল হাউসিং সোসাইটিতে। সকালে চায়ের দোকানে খবরের কাগজ নিয়ে উত্তেজিত চর্চা, আর সন্ধ্যাবেলা বাড়ির সামনে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো বসার জায়গা, যাকে রক বলা হত, সেখানে পাড়ার সমবয়সী বা অসমবয়সীদের নির্ভেজাল আড্ডা। কে কত বড়ো বক্তা এই আসরে প্রমাণ করার সুযোগ ছিল। চেনা এই ছবি অনেক দিন ধরে বদলাতে শুরু করেছে।

    ষাটের দশকের উত্তর কলকাতা পাড়া সংস্কৃতির পীঠস্থান, আর তার গর্ভগৃহটি হল রোয়াক বা রক। শুধু টেনিদা বা ক্যাবলা, প্যালারা নন। যুবক থেকে প্রৌঢ়, সকলেরই ঠাঁই সেখানে। ঘনাদার চিলেকোঠার আড্ডা ছিল অন্যরকম।

    কলকাতার যে কয়েকটা পাড়া এখনও বেঁচে আছে, সেগুলির রকে এখন আর টেনিদাদের দেখা যায় না। সেগুলি এখন আশি ঊর্ধ্ব বয়স্কদের ইইকালের দিন শেষ হওয়ার জল্পনা করার জায়গা। বাগবাজারের কোনও কোনও বাড়ির রকে এখনও বিকেলে হয়তো বসেন বৃদ্ধরা। তাঁদের কণ্ঠে আক্ষেপ, সোনালি সেই বিকেলগুলো আজ আর নেই। হয়তো আর ফিরেও আসবে না। কলকাতার বুকে রকের গঙ্গাপ্রাপ্তির আরও উদাহারণ আছে।

    বাগবাজারে (Bagbazar) শ্যাম স্কোয়ার অর্থাৎ সুভাষ বাগ শিশু উদ্যানের পশ্চিমে রামকান্ত বোস স্ট্রিট ও বোসপাড়া লেন। মা সারদামনি সরণির সংযোগস্থলের সম্মুখে অর্থাৎ দক্ষিণে ১৩/৪নং রামকান্ত বোস স্ট্রিটে অবস্থিত যামিনীভূষণ রায়ের অষ্টাঙ্গ আয়ুর্বেদ মহাবিদ্যালয়। এর প্রাক্তন সুপারিনটেন্ডেন্ট ও প্রিন্সিপাল কবিরাজ ও ডাক্তার মণীন্দ্রলাল ও তাঁর পিতা কবিরাজ রাজেন্দ্রলাল দাশ গুপ্ত মহাশয়দের বাড়ি- ‘কবিরাজ বাড়ি’ (Kabiraj House)। সেটির সদর দ্বারের দুই ধারে প্রতিদিনের আড্ডার স্মৃতি বিজড়িত রক আজ বিলুপ্ত। সেদিনের সেই সদর দরজা বহন করছে পুরোনো আড্ডার স্মৃতি। সেই আড্ডা একসময়ে কতই না তর্কের তুফান তুলেছিল।

    এঁদো গলি থেকে বড়ো-ছোটো রাজপথ সর্বত্র রোয়াক থাকলেও, আড্ডা জমত কোনও গলি বা ছোটো রাজপথের মোড়ের রোয়াকগুলিতে। উত্তরে বাগবাজার, দর্জিপাড়া, ফড়েপুকুর থেকে দক্ষিণে বৌবাজার, তালতলা অবধি রোয়াক সংস্কৃতির প্রচলন ছিল। কাছাকাছি অবশ্যই চায়ের দোকান থাকত। পান-বিড়ির দোকান থাকলে সোনায় সোহাগা। বিকেল পাঁচটা – ছটা থেকে আড্ডা শুরু হয়ে রাত আটটা-নটা অবধি গড়াত। আড্ডা কিছুটা এলোমেলো হত বর্ষার দিনে, যদি না কাছাকাছি কোনও ঝুলবারান্দার ছাউনি থাকত। বৃষ্টি থামলে যখন সুকিয়া স্ট্রিট, আমহার্স্ট স্ট্রিট, ঠনঠনিয়া বা কলেজ স্ট্রিটের অনেক জায়গা ‘ভেনিস’-এর চেহারা নিত, তখন অনেক নাছোড় আড্ডাধারীর ভরসা ছিল কলকাতার ‘ট্র্যাজেডি’ সেই হাতে টানা রিকশো। মাথায় বজ্রাঘাত না হলে দুরন্ত আড্ডাধারীরা কিন্তু আড্ডার আসরে আসা থেকে বিরত থাকতেন না।

    অনেক সময় বয়স অনুযায়ী আড্ডার বিষয় ভিন্নতর হত। বয়স্কদের আড্ডা হলে চলত কিছুটা ধর্ম, কিছুটা দাবা, কিছুটা পুরোনো সংস্কৃতি, বাকিটা হা-হুতাশ। একদম ছেলে ছোকরাদের আড্ডায় থাকত রাজনীতি, হিন্দি ছবি কিংবা পাড়ার সুন্দরী মেয়েদের রূপচর্চা। আর বাড়ির গিন্নিদের আড্ডায় থাকত পরচর্চা। সে আর দোষের কী! আড্ডা বলে কথা! ভাবছেন এত অতীত ঘাঁটছি কেন! দেখুন আড্ডা দিতে কারই বা মন না চায়! বাঙালির সব গেল সব গেল বলে কান্না জুড়ে বসার কিছু নেই। ‘উত্তরের আড্ডা’ নামে স্বয়ং একটি দোকানও খোলা হয়েছে বাগবাজার অঞ্চলে। যেখানে কিছু মানুষ আজও বাঁচিয়ে রেখেছেন আড্ডার ট্র্যাডিশন। বন্ধু হয়ে গেছেন একে অপরের। অন্যের আনন্দে হাসেন, দুঃখে সমব্যথী হন।

    একদম ছেলে ছোকরাদের আড্ডায় থাকত রাজনীতি, হিন্দি ছবি কিংবা পাড়ার সুন্দরী মেয়েদের রূপচর্চা। আর বাড়ির গিন্নিদের আড্ডায় থাকত পরচর্চা। সে আর দোষের কী! আড্ডা বলে কথা!

    উত্তরের আড্ডা

    একটা সময় রকের আবার টাইম ডিভিশন ছিল। একেবারে সকালে বাজার ফেরত বাড়ির কর্তারা বসতেন গল্প করতে। আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে তাঁরা বাড়িতে ঢুকে যেতেন, কারণ তখন দুবেলা রান্না করতেন মা-কাকিমারা। সাধারণ মানুষের বাড়িতে গ্যাস ওভেন, ফ্রিজ এসব ছিল না। উনুনে রান্না হত। এরপর নটায় সাইরেন বাজত। সাইরেন মানেই কাজের জন্য দৌড় শুরু। অফিসযাত্রীরা বেরিয়ে পড়তেন ট্রাম বাস ধরার জন্য। ব্যবসায়ীরাও পৌঁছাতেন কাজের জায়গায়। এরপর স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বেরনোর পালা। বেলার দিক থেকে রকে দেখা যেত বেকার যুবকদের। মাঝদুপুর অবধি তাদেরই দৌরাত্ম্য চলত। বিকেলে বসতেন দাদুস্থানীয় বয়স্করা। আর সন্ধেবেলা আবার রকের দখল নিতেন বাবা-কাকারা। কাজ থেকে ফিরে চা জলখাবার খেয়ে চলে যেতেন আড্ডা দিতে। অদ্ভুত একটা রকে বাঁধা ছন্দে চলত জীবন।

    অস্বীকার করার উপায় নেই, এখন হাইরাইজ-মাল্টিপ্লেক্স কেড়ে নিয়েছে কলকাতার পাড়ার বন্ধন। বেশিরভাগ পাড়ায় পুরোনো বাড়িগুলো ভেঙে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। বদলে গেছে পরিবারের মানুষজন। কলকাতার মানচিত্র বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে মন। তাই কিছুটা হলেও ভাটা পড়েছে আড্ডা সংস্কৃতিতে। ১৯৬৭-র প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের পর থেকে উত্তর কলকাতার পাড়া ও রোয়াকের আড্ডার চরিত্র পাল্টাতে থাকে। ‘নকশালবাড়ি’ (Naxalbari) নাম ছোটো ছোটো কানেও পৌঁছায়। গলির দেওয়ালগুলো ততক্ষণে ‘চিনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান’ হয়ে উঠেছে। সার্কুলার রোডের ওপারে গড়পার থেকে মুহুর্মুহু পেটো ফাটার আওয়াজ ভেসে আসে। রাস্তাঘাটে সিআরপির গাড়ি বাড়তে থাকে। রাতারাতি রোয়াকের ছেলেরা ‘বিপ্লবে’ নেমে পড়ে। এই এলোমেলো সময়েই উত্তর কলকাতার পাড়া ও রোয়াকের আড্ডা প্রাণশক্তি হারাতে থাকে। যাঁরা আজ জীবনের অনেকগুলো বসন্ত কাটিয়ে প্রাচীনতার সীমান্তে দাঁড়িয়ে, তাঁদের কণ্ঠে আজ শুধুই হা-হুতাশ...

    ____

    কৃতজ্ঞতা: আনন্দবাজার পত্রিকা, টেলিগ্রাফ, Roarmedia, কালি ও কলম

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @