উত্তরবঙ্গের ‘বোরোলি’ মাছে মজেছিলেন শক্তি চাটুজ্জে থেকে জ্যোতি বসু

সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, উত্তরবঙ্গ বলতেই তাঁর ‘বোরোলি’র কথা মনে পড়ে। তিস্তা-তোর্সার মাছের রাজা বোরোলি। এ কথা অনেকেই স্বীকার করবেন যে পাহাড়, জঙ্গল, চা-বাগানের পাশাপাশি ‘তিস্তার ইলিশ’ (অনেকে ভালোবেসে এই নামেও ডাকে)-ও বাঙালিকে হাতছানি দেয়। উত্তরবঙ্গে গেছেন অথচ সুস্বাদু এই মাছের বাহারি পদের স্বাদ আত্মস্থ করেননি, এ বড়ো বিরল ব্যাপার! ভাপা বোরোলি, বোরোলি সর্ষে, দই বোরোলি, বোরোলি কালিয়া, বোরোলি ঝাল, মুচমুচে বোরোলি ফ্রাই কিংবা নিদেন পক্ষে বোরোলি টক, যেভাবেই রাঁধা করা হোক না কেন, যাঁরা চেখে দেখেছেন, তাঁদের কথায়, অমৃতসম। তিস্তা পাড়ে একাধিক রেস্তরাঁ তৈরি হয়েছে শুধুমাত্র এই মাছের নানা পদ দিয়ে পর্যটকদের রসনা তৃপ্তির জন্য। পাহাড় ভ্রমণ সেরে অনেকেই মালবাজার কিংবা গজলডোবায় সেসব রেস্তরাঁয় একবার ঢুঁ মেরে যেতে ভোলেন না। ভাজা, চচ্চড়ি, ঝাল কিংবা কালো জিরে ফোড়নে বোরলির পাতলা ঝোল দিয়ে উত্তরবঙ্গের সুগন্ধী চাল তুলাইপাঞ্জির ভাত মানেই জিভে জল।খাঁটি বোরলি ঈষৎ মিষ্টি, মুখে দিলেই গলে যাবে।
‘কিছুদূর যেতেই দেখতে পেলাম রাস্তার পাশ দিয়ে ঝোরার জল গড়িয়ে যাচ্ছে ঢালুর দিকে। আদিবাসী দুই রমণী থালা পেতে বোরলি মাছ ধরছিল। আমাকে বুঝতে না দিয়ে শক্তিদা অনায়াসেই নেমে গেলেন। জলে নেমে চেঁচাতে শুরু করলেন, রণজিৎ কী দেখছো, দেখো কত বোরোলি মাছ। আজ আর যাব না, ওরা বোরোলি মাছের ঝোল খাওয়াবে আমাকে।’ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মনের অভিব্যক্তি তুলে ধরে লিখেছিলেন কবি রণজিৎ দেব। শক্তির আলুথালু কাব্যময়তা বোরোলি-কে পেয়েছিল কিছুক্ষণ।
কোচবিহারের মহারানি ইন্দিরা দেবীর এতটাই পছন্দ ছিল যে বম্বে কিংবা কলকাতায় থাকলে বিমানে করে তোর্সার বোরোলি পৌঁছে যেত তাঁর কাছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর বোরোলি প্রেম ছিল সর্বজনবিদিত। শোনা যায়, উত্তরবঙ্গে এলেই তাঁর লাঞ্চে, খাবার টেবিলে সাজানো থাকত বোরলির রকমারি পদ। বন দফতরের রাঁধুনি অধীর দাস সামান্য জিরে-আদা বাটা দিয়ে এমন বোরোলি রাঁধতেন, চেটেপুটে খেতেন জ্যোতিবাবু। প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিংবা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ ব্যক্তিত্বদের বোরোলিপ্রীতির কথা বিশেষ ভাবে শোনা যায়।
ইলিশের মতোই নদীর স্রোতের বিপরীতে ঝাঁক বেঁধে চলে বোরলি। মূলত বর্ষার আগেই এপ্রিল-মে মাসে কিংবা বর্ষার পরে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এদের দেখা মেলে। রাত জেগে জেলেরা তিস্তার এই রূপোলি শস্যকে জালবন্দি করেন। সকালের নরম রোদে রূপোলি মাছের ঝিলিকে হাসি ফোটে তিস্তাপাড়ের জেলেদের ৷ জলঢাকা, কালজানি, তিস্তা, তোর্সা - শুধু উত্তরবঙ্গের এই নদীগুলিতেই বোরোলি পাওয়া যায়। জলঢাকা ও তোর্সার বোরলি তুলনামূলক খর্বকায়। তবে স্বাদে গন্ধে তিস্তার বোরোলিই সবার সেরা। তিস্তার স্রোত বেয়ে আসা এই মাছের স্বাদ অন্য কোথাও আর মেলে না। সেজন্য অনেকে একে আদর করে ‘তিস্তার ইলিশ’ নামে ডাকেন। আগে অসমের ধুবুরিতে ব্রহ্মপুত্রেও এক আঙুল সাইজের এই মাছটি পাওয়া যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সব নদীতেই বোরোলির সম্ভার কমেছে। ক্রমাগত নদীর জল শুকিয়ে যাওয়া, কীটনাশক প্রয়োগ, জল দূষণ, ব্যাটারির মাধ্যমে বিদ্যুতের শক দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ ধরার প্রবণতা, বর্ষায় নেট ব্যবহার করে ডিমভর্তি মাছ ধরা ইত্যাদি কারণে আগের মতো আর দেখা পাওয়া যায় না তাদের। চাপলা, নেদস, কাজলি, মৌরালার মতো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বোরলি। বাজারে দামও বেশ চড়া। যেকারণে অনেক মৎসজীবি এখন পুকুরে বা ভেড়ীতে বোরোলি চাষ করছেন।
শিলিগুড়ির কলেজপাড়ার বাসিন্দা পরিমল বসু। নিজে একজন শিল্পোদ্যোগী। ১৯৯৭ সালে গাজলডোবা তখনও আজকের গাজলডোবা হয়নি। তবে তিস্তার পাশে জঙ্গলের ধারে এই গাজলডোবাকে ঘিরে যে বিরাট পর্যটন শিল্পের বিকাশ হতে পারে, তার ভাবনা একটু একটু করে শুরু হয়েছিল। একদিন ডুয়ার্স ঘুরে গাজলডোবার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন পরিমলবাবু। হঠাৎই তাঁর মাথায় চেপে বসে, এখানকার তিস্তার পাশেই অপরুপ পরিবেশে একটু জমি নিলে কেমন হয়। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। তিনি কিছু জমি কিনে রাখেন। পরবর্তীতে তাঁর মাথায় আসে, উত্তরবঙ্গের হারিয়ে যেতে থাকা সুস্বাদু বোরোলি মাছ নিয়ে একটি রেস্তোরাঁ গড়ে তোলা যায় কিনা। সবকিছু বিচার করে বোরোলি নাম নিয়ে রেস্তোরাঁ তৈরি করেন। পরিমল বসুর কথায়, “বোরোলিকে কেন্দ্র করে কিছু তৈরি করা হলে আশপাশের কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হবে, এই ভাবনাটা প্রথম থেকেই কাজ করেছিল। স্থানীয় মৎস্যজীবিদের থেকে মাছ কিনি। এখন আমার রেস্তোরাঁয় চার রকমের পদ তৈরি হচ্ছে বোরোলি মাছের। বোরোলি ফ্রাই বা ভাজা মাছ, কালোজিরা সম্বর দিয়ে বোরোলির ঝোল, সরষে দিয়ে বোরোলি আর বোরোলি ঝাল। রেস্তোরাঁর সামনে আছে একটি বিরাট পুকুর। সেখানেও মাছ চাষ হচ্ছে। আমার কাছে বোরোলি মানে শুধু মাছ নয়। বোরোলি মানে অ্যাম্বিশন, ইনডিপেনডেন্স, স্ট্রেনথ, রিলায়াবিলিটি, ডিটারমিনেশন এবং প্রফেশনালিজম। আবার ইউরোপের পাঁচটি দেশে পদবি হিসাবেও বোরোলি নামটি রয়েছে।”
তথ্যসূত্রঃ
বঙ্গদর্শন আর্কাইভ
এই সময়
দেশের সময়