বাংলার খাঁটি ‘নলেন গুড়’-এর সুলুক-সন্ধান

‘নলেন গুড়’, এই শব্দবন্ধের মর্ম কতখানি তা একজন বাঙালির পক্ষেই বোঝা সম্ভব। শীতকালীন রসনাতৃপ্তিতে এর জুড়ি মেলা ভার। পৌষের শুরুতেই নতুন ধানে ভরে ওঠে গোলা। আর তাই দিয়ে হয় নবান্ন। এদিন থেকেই পিঠে-পুলি শুরু হয়ে যায় গ্রাম বাংলার বাড়িতে বাড়িতে। অঘ্রাণের শেষ থেকেই নতুন গুড়ের সুঘ্রাণে ভরে ওঠে গ্রাম বাংলা। ভোরবেলা খেজুরের রস আর দুপুরের পর সেই রসে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় খেজুর গুড় বা নলেন গুড়। তৈরি হয় পাটালি। আর তারপর সেই গুড়ের পিঠে, পায়েস, সন্দেশ, রসগোল্লা, মোয়া এসব তো আছেই।
সিনেমা-সাহিত্যেও বারবার এসেছে ‘নলেন গুড়’ প্রসঙ্গ। এই গুড় তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রধান বিষয়বস্তু করে ১৯৭৩ সালে পরিচালক সুধেন্দু রায় নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ছোট গল্প ‘রস' অবলম্বনে বানিয়েছিলেন 'সওদাগর', যা মনে রাখার মতো একটা সিনেমা। নলেন গুড় কীভাবে তৈরি হয়, শুধু এটা নিয়েই একটা গোটা প্রবন্ধ লেখা যায়। সংক্ষেপে বললে- খেজুর গাছের গা চেঁচে নরুন দিয়ে ফুটো করে ফাঁকা হাড়িগুলো ঝুলিয়ে দিয়ে আসা হয় আর আগে থেকে রস ভরতে দেওয়া হাড়িগুলো নিয়ে আসা হয়। পরেরদিন ভোরে সেই রস নামিয়ে এনে বিভিন্ন হাড়ি থেকে ঢালা সমস্ত রস একত্র করে বড়ো পাত্রে ফোটানো হয়। ফুটিয়ে ফুটিয়ে ধীরেধীরে রস থেকে গুড় প্রস্তুত করেন তাঁরা। গুড়কে নিদিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে ঠান্ডা করে পাটালি তৈরি করা হয়, তাই নলেনগুড়ের এই দুই ধরনকে ঝোলাগুড় ও পাটালি গুড় বলেই পরিচিত। দুপুরের পর আবার ভরতি হাড়িগুলো আনা হয় আর ফাঁকা হাড়িগুলো ঝুলিয়ে দিতে আসা হয়। তারপর একইভাবে সকালের মতো বিকালের দিকেও গুড় প্রস্তুত করা হয়। দিনে দু’বার এইভাবে প্রস্তুত হয় গুড়।
আরও পড়ুন: বাংলার নিজস্ব খাঁটি মধু
হরেকরকম সুস্বাদু খাবার তো রয়েছেই, এছাড়াও নলেন গুড়ের কিন্তু প্রচুর উপকারিতাও রয়েছে। নলেন গুড় হজমে ভালো। শীতে সবারই মিষ্টির প্রতি ঝোঁক বাড়ে। কিন্তু যাঁরা ডায়াবেটিক, তাঁদের চিনি খাওয়া বারণ। সেক্ষেত্রে নলেন গুড় খেতে পারলে কোনও অসুবিধে হয় না। সেই সঙ্গে মিষ্টির স্বাদপূরণও হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যখন কোনও খাবারের জন্য খুব বেশি ‘ক্রেভিং’ হয়, তাহলে জোর করে তা চেপে না রেখে খেয়ে ফেলা উচিত। আর বছরে মাত্র দু’মাস ঠান্ডার আমেজ থাকে। এই কদিন কি আর মিষ্টি না খেয়ে থাকা যায়! তাই মুশকিল আসান হিসেবে খাওয়া যেতেই পারে ‘নলেন গুড়’। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ গ্রাম খেজুর গুড় খাওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্পূর্ণভাবে রাসায়নিক এবং সংরক্ষণাগার মুক্ত ‘নলেন গুড়’ বাংলার সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই ভেজালের যুগে ভাবতেই পারেন, ‘সে গুড়ে বালি’। তবে এখনও খুঁজলে এর সন্ধান মেলে।
স্বাদে-গন্ধে নির্ভরযোগ্য-খাঁটি গুড়ের সন্ধান দিচ্ছে 'the bengal store'। সংগ্রহ করতে পারেন www.thebengalstore.com থেকে।