বিদেশি চায়ের ‘নির্যাস’ পাচ্ছে কলকাতা

চা। আপামর বাঙালির অন্যতম প্রিয় পানীয়। সুমন চাটুজ্যের গান থেকে সিনেমা, গল্প-উপন্যাসে তার অবাধ যাতায়াত। শুধু বাঙালি কেন, চায়ের সাম্রাজ্য ছড়িয়ে রয়েছে সারা বিশ্ব জুড়ে। অতিথি আপ্যায়ন থেকে ঘরোয়া আড্ডা, কোনও কিছুই চা ছাড়া সম্পূর্ণ নয়। পর্যটক বাঙালি পাহাড়ে গিয়ে দূরের তুষারশৃঙ্গ আর পাইনবনের দিকে অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে, মেঘ আর কুয়াশা এসে প্রায় ছুঁয়ে দিচ্ছে তার মাথা, আর হাতে ধরা রয়েছে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা, এ দৃশ্য মনের বড্ড কাছের। শহর ও শহরতলি জোড়া টি-স্টল, টি-শপ, ক্যাফেটেরিয়ার দৌলতে মুখে মুখে ঘোরে দার্জিলিং-টি (1st and 2nd Flush), আইস-টি, মিন্ট-টি, ফ্লেভারড-টির নাম। বাংলার চায়ের তো অনেকদিন ধরেই বিশ্বজোড়া নাম। এবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চায়ের ভাণ্ডার বাঙালির জন্য খুলে দিয়েছেন পার্থপ্রতিম গাঙ্গুলি (Partha Pratim Ganguly), তাঁর টি-স্টলে। দক্ষিণ কলকাতার বাইপাস-লাগোয়া মেডিকা হাসপাতালের উল্টোদিকে তাঁর রোডসাইড টি-স্টল নির্যাস (Roadside Tea Stall Nirjas)। সেখানে পাওয়া যায় আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের চা।
একান্ত আলাপচারিতায় নির্যাস টি-স্টলের (Nirjas Tea Stall) মালিক পার্থবাবু বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন তাঁর এই উদ্যোগের ব্যাপারে। তাঁর কথায়, “আমার অনেকদিন ধরেই ইচ্ছা স্বাধীনভাবে কিছু করার। আগে চাকরি করতাম। ২০১৩ সালে পুজোর আগে থেকে এই ব্যাপারটা নিয়ে গুরুত্ব সহকারে ভাবনাচিন্তা শুরু করি। চাকরি ছেড়ে দিই। ২০১৪ সালের ৬ জানুয়ারি এই দোকানের গোড়াপত্তন হয়।” যেখানে গোটা শহর জুড়েই এত চায়ের দোকানের রমরমা, সেখানে আবার চা? মানুষ কেন এই দোকানে আসবেন, সে ভাবনা হয়নি? উত্তরে তিনি জানান, “চা, হার্ব ইত্যাদি নিয়ে আমার অনেকদিনের উৎসাহ। এইসবের ভেষজ গুণ আমাকে বহুদিন ধরেই আকর্ষণ করে। এসব নিয়ে পড়াশোনাও করতাম অনেক আগে থেকেই, এখনও করি। আমার একটা স্বপ্ন ছিল যে সাধারণ মানুষকে এ সম্পর্কে জানানোর, তাদের কাছে এই ভেষজগুলিকে পৌঁছে দেওয়ার। তাই শেষপর্যন্ত চা-কেই বেছে নেওয়া। এই কাজে পরিবারের সমর্থনও ছিল আগাগোড়া।”
তাঁর দোকানে পাওয়া যায় পর্তুগালের মাস্কাটেল, গ্রিসের চামোমিল প্রভৃতি দেশ-বিদেশের চা। পার্থবাবুর মতে, এগুলির সবকটি সাধারণ অর্থে চা নয়, অনেকগুলিই বিবিধ ভেষজ গুণসম্পন্ন হার্ব। তিনি জানান, হার্বগুলি বানানোর পদ্ধতি অনেকটা চায়ের মতো হলেও এগুলি সবকটি চা পাতার মতো পাতা হয়। এর মধ্যে আছে ফুলের পাপড়ি, গাছের কাণ্ড ও মূলের বিভিন্ন অংশ। প্রতিটির মধ্যে রয়েছে এমন কিছু পদার্থ, যা সাহায্য করে রোগ প্রতিরোধে। তাঁর দাবি, এমন এমন চা রয়েছে, যা নিয়মিত গ্রহণ করলে বিভিন্ন রোগকে ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত আটকানো সম্ভব। তিনি উদাহরণ দিয়ে বললেন, “আমার কাছে একধরনের চা রয়েছে, যার নাম ব্লু টি (Blue Tea)। এতে আছে সাইক্লোটাইড, ক্যাটেচিন, ফ্ল্যাভোনয়েড ইত্যাদি পদার্থ যা কোলেস্টেরল কমায়, ধমনী পরিস্কার রাখে, রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং হৃদযন্ত্র সচল রাখতে সাহায্য করে।” তাঁর কাছে থাকা চামোমিল টি-তে থাকা চামাজুলেন, অ্যাপিজেনিন, বিসাবোলাল ইত্যাদি পদার্থগুলি সর্দি-কাশিতে খুবই কার্যকরী। এছাড়াও এই চা নিয়মিত পান করলে ঘুম ভালো হয়।
নির্যাস-এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চা হল:
চা | দাম/কেজি | দেশ |
মাস্কাটেল | ১৭,৪০০ | পর্তুগাল |
ব্লু টি | ১০,০০০ | দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া |
চামোমিল | ৭,৬০০ | গ্রিস |
ল্যাভেন্ডার | ৮,৩০০ | ওয়েস্টার্ন ইউরোপ |
পোচা | ৬,৭৫০ | টিবেট |
মেট টি | ১৩,৪০০ | দক্ষিণ আফ্রিকা |
এছাড়াও দোকানটিতে পাওয়া যাচ্ছে মকাইবাড়ি, ডার্ক টি, হোয়াইট টি, গিদ্দাপাহাড় ইত্যাদি বিভিন্ন প্রজাতির চা ও হার্ব। এই সমস্ত চা পার্থপ্রতিম গাঙ্গুলি সংগ্রহ করেন এমন সব জায়গা থেকে, যেখানে চাষাবাদ হয় কোনো রাসায়নিক ছাড়া, যাতে হার্বগুলির ভেষজ গুণ নষ্ট না হয়।
কিন্তু এত দামি সব চা, খদ্দেরদের সাড়া কেমন? তাঁর জবাব, “আমি জানি, এই চাগুলোর দাম অনেক বেশি। কিন্তু এই চা পাতাগুলি অনেকদিন ধরে বহুবার ব্যবহার করা যায়।” তিনি যুক্তি দিলেন, “এখন তো সব বাড়িতেই অনেক টাকার ওষুধ কিনতে হয়। তার বদলে এই চা খানিকটা কিনে ব্যবহার করে যদি নিয়মিত ওষুধ খাওয়ার থেকে খানিকটা রেহাই পাওয়া যায়, আমার মতে সেটা একটা বড়ো লাভ।” কিন্তু এই যুক্তিতে কতটা প্রভাবিত হচ্ছেন মানুষ? তিনি বললেন, এই দোকানে আসেন অনেক ডাক্তার, যাঁরা এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন, নিজেরাও এসব চা ব্যবহার করেন। এমনকি দোকান বন্ধ রাখলেও বারবার ফোন আসতে থাকে। এই দোকানে গিয়ে যেমন চা পাতা কেনা যায়, তেমন চা কিনে খাওয়াও যায়। পার্থবাবু নিজে শিখিয়ে দেন সেসব চা বানানোর প্রণালী। এক কাপ চায়ের দাম ১৫ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত। তিনি চান একটা টি-শপ কাম ক্যাফে খুলতে, যেখানে গেলে শুধু চা খাওয়া বা চা-পাতা কেনাই নয়, মানুষ জানতে পারবে এইসব চায়ের নাম, তার ইতিহাস, তাদের ভেষজ গুণ, ব্যবহারের পদ্ধতি সম্পর্কে। তার জন্য দক্ষিণ কলকাতায় শুরু হয়ে গেছে জায়গা খোঁজা। পার্থবাবু জানান, “আমার মূল উদ্দেশ্য সবাইকে এই চা-পাতাগুলির গুণ সম্পর্কে সবাইকে জানানো, সবার সঙ্গে এগুলির পরিচয় করিয়ে দেওয়া।” তাঁর স্বপ্ন, আরও বড়ো হয়ে উঠবে কলকাতার বিদেশি চায়ের দোকান- নির্যাস।