ডিমের ডেভিলের সম্রাট ‘নিরঞ্জন আগার’, দোকানের বয়স ৯০ ছুঁইছুঁই

উত্তর কলকাতার সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, অর্থাৎ গিরিশ পার্ক মেট্রো স্টেশনের পাশে প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দোকান নিরঞ্জন আগার। এখানকার ডিমের ডেভিল, ফিশ ফ্রাই, ব্রেস কাটলেট এসবের খ্যাতি এখনও তুঙ্গে। যাঁরা উত্তর কলকাতায় থাকেন, তাঁরা প্রায় সবাই জানে নিরঞ্জন আগারের মহিমা কী। তাছাড়া কলকাতার খাদ্য রসিক মহলে এমন নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা এই দোকানের নাম শোনেননি। এই দোকানের সুপ্রসিদ্ধ ডিমের ডেভিল মাপে এবং স্বাদে সবার থেকে আলাদা। এছাড়াও মাংসের কোপ্তা, কষা মাংস, ফিশ ফ্রাই তো রয়েইছে। প্রতি সকালবেলা নিরঞ্জন আগার ভরে ওঠে প্রাতরাশের জন্য। অফিস যাওয়ার আগে কিংবা কলেজ যাওয়ার আগে সকালের প্রাতরাশটা অনেকে এখান থেকেই সেরে নেন। এখানে বাটার টোস্টের সঙ্গে অমলেট বা পোচ, তার সঙ্গে সুস্বাদু চা বিখ্যাত। বিকেল চারটের পর থেকে পাওয়া যায় অন্যান্য খাবার। ভিড় এতটাই বেড়ে যায়, সন্ধে ৭টার মধ্যে দোকানের প্রায় সমস্ত খাবার শেষ হয়ে যায়। দোকানে কিন্তু কোনো রেফ্রিজারেটর নেই। কারণ কর্তৃপক্ষ জানেন, তাঁরা সারাদিন যা বানাবেন, দিনের শেষে কিছুই পড়ে থাকবে না। দোকানে এখনও পুরোনো প্রথা মেনে সমস্ত রান্না হয় উনুনে।
সন্ধেবেলার ভিড়ে পাওয়া গিয়েছিল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রবীণ ব্যক্তিকে। যিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে এখানে আসছেন। তিনি জানালেন তাঁর প্রিয় খাবারের তালিকা। মাংসের কোর্মা, ফিশ ফ্রাই, ডেভিল আর ভেজিটেবল চপ- এসবের স্বাদ লেগে আছে দীর্ঘ ৩৫টা বছর। এখন তাঁর নাতি-নাতনিরাও আসছেন। নিরঞ্জন আগারের বর্তমান কর্ণধার বিবেকানন্দ পাল। তিনি জানান, এই দোকান শুরু করেছিলেন তাঁরই এক ঠাকুমা এবং বাবা দু’জন মিলে। তখন ছিল ছোট্ট একটা চায়ের দোকান। কিছু বছর পর শুরু করেন চপ-কাটলেট বিক্রি। বিবেকানন্দ বাবুর বাবার নাম ছিল নিরঞ্জন হাজরা। সেখান থেকেই এই দোকানের নাম। আর আগার মানে খাবারের জায়গা। ব্যবসাটি চলে গিয়েছিল তাঁদের পরিবারেরই কিছু সদস্যের হাতে। বর্তমানে দোকানটি চালাচ্ছেন বিবেকানন্দ পাল এবং বিপ্লব পাল। এই দোকানে ভেজিটেবল চপকে খাদ্যরসিকরা বোমা বলে ডাকেন। যেমন স্বাদ, তেমনই বোমার মতো বড়ো।
নিরঞ্জন আগারের নাম সবাই এককথায় চেনেন ডিমের ডেভিলের জন্য। এমন স্বাদ কলকাতায় সচরাচর মিলবে না। ডেভিলে থাকে হাঁসের ডিমের সম্পূর্ণ অংশ। খাবারের দামগুলো জেনে নেওয়া যাক।
ডিমের ডেভিল- ২৯ টাকা
ফিশ ফ্রাই- ৩৬ টাকা
মটন ব্রেস্ট কাটলেট- ৩২ টাকা
ভেজিতেবোল চপ- ১৪ টাকা
মটন চপ- ১৪ টাকা
মটন কাটলেট- ২৬ টাকা
মটন কষা- ৭১ টাকা
কোর্মা- ৭২ টাকা
মেটে- ৭০ টাকা
মেটে থাকবে লিভারের সাত পিস আর কোর্মা বড়ো সাইজের দুই পিস।
নিরঞ্জন আগারের খাবার খেয়েছেন বহু বিখ্যাত মানুষ। অভিনেতা বিকাশ রায়, অভিনেতা উৎপল দত্ত, অভিনেতা তরুণকুমার, অভিনেত্রী-পরিচালক অপর্ণা সেন, সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে প্রমুখ ব্যক্তিত্বরা দোকানে আসতেন প্রায়ই। উৎপল দত্ত এবং অপর্ণা সেন ভালোবাসতেন ডিমের ডেভিল। তরুণকুমার খেতেন কোপ্তা, বিকাশ রায় খেতেন মটন ব্রেস্ট কাটলেট। মিনার্ভা থিয়েটারে রিহার্সাল চলাকালীন সমস্ত খাবার যেত এই দোকান থেকেই।
আজও রোজ সন্ধেবেলা প্রবীণ-নবীনদের আড্ডা বসে নিরঞ্জন আগারে। উপচে পড়ে ভিড়। দোকানের দেওয়াল কখনও কথা বলে ওঠে। সেকথা নব্বই বছরের ইতিহাসের। আপনারা যাঁরা এখনও যাননি, টুক করে চলে যান একটিবার। ইচ্ছে হবে বারবার যেতে। কারণ কলকাতার কিছু ইতিহাস আমাদের তাড়া করে বেড়ায় সর্বক্ষণ।