বাঙালির ‘হার্টথ্রব’ গোয়েন্দা কিরীটি

বাঙালি মাত্রই রহস্য পিপাসু। সামান্য রহস্যের গন্ধ পেলেই পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ করে লেগে পড়তে পারলেই হল! সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের একঘেয়েমির মধ্যে আলোড়ন নিয়ে আসে রহস্য-রোমাঞ্চ। আর সেই রহস্য ভেদ করতে পারার অপার্থিব আনন্দের জুড়ি মেলা ভার।
গোয়েন্দা গল্পের প্রতি কম-বেশি আমাদের সবারই আকর্ষণ আছে। থাকারই কথা। একটা অজানা জিনিস, যেটা জানার জন্য সবাই দিনরাত এক করে ফেলছে, একজন এসে ভীষণ নাটকীয়ভাবে সেটার সমাধান করে দিয়ে যাবে - আর আমরা তাঁর বুদ্ধিমত্তায় অবাক হয়ে বাহবা এবং হাততালি দেবো- এর চেয়ে ভালো ব্যাপার আর কীই বা হতে পারে? কাহিনির শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা থাকবে, দরকার পড়লে বেশ মারপিটের একটা ব্যাপার থাকবে, ধাঁধা থাকবে, দাবা খেলার মত চাল থাকবে– তবেই না রহস্য ‘পড়ে’ মজা।
বাংলা সাহিত্যের পরতে পরতে এমন গোয়েন্দাদের খোঁজ মিলবে। সেকালের ফেলুদা, ব্যোমকেশ, কাকাবাবু থেকে একালের ‘গোয়েন্দা গিন্নি’, সবেতেই বাঙালির উৎসাহের পারদ চড়া। গোয়েন্দা মানেই, তার কাছে থাকবে এক বিশেষ অস্ত্র। মগজাস্ত্র। আর তার জোরেই রহস্যের জাল কেটে সত্য সন্ধান করে ফেলবে সে অনায়াসেই। মস্তিষ্কের সেই উচ্চপর্যায়ে চিন্তাভাবনা করার শক্তি সকলের থাকে না। যাঁদের থাকে তারা তাঁরাই ব্যতিক্রম। তারাই আমাদের হিরো। আমাদের গোয়েন্দা।
সাধারণ ঘরের বাঙালিদের মধ্যেও গোয়েন্দা হয়ে ওঠার এক অমোঘ টান চিরাচরিত। তাই সে আর কিছু পারুক অথবা না পারুক গোয়েন্দা সাহিত্যের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সাদা-কালো অক্ষরে নিজেকে মিশিয়ে দিতে দিব্যি সিদ্ধহস্ত। সাধের গোয়েন্দাদের সঙ্গে কল্পনার রাজ্যে রহস্যের সমাধান করে বেড়াতে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। গল্পের শেষে সমাধানের হদিশ, অথচ গোটা কাহিনি জুড়ে আততায়ী খোঁজার কাজটা অবিরাম করে চলে পাঠক।
বাঙালির গোয়েন্দা প্রেম নিয়ে ফেলুদা আর ব্যোমকেশের মধ্যে লড়াই চিরকেলে। অথচ এই দুই গোয়েন্দার প্রচণ্ড জনপ্রিয়তার আড়ালে আরও একজন গোয়েন্দার কথা মনে পড়ে যায়। সত্তর-আশির দশকের কিশোরী থেকে প্রায় সব যুবতীর ‘হার্টথ্রব’ ছিলেন তিনিই। আর কিশোর-যুবকদের কাছে তিনি যেন লৌহমানব! যে গোয়েন্দা চরিত্র একেবারে সাধারণের ভিড়ে মিশে থাকে অথচ উজ্জ্বলতায় ম্লান হয় না তাঁর বুদ্ধিমত্তা।
যে গোয়েন্দাকে নিয়ে আমাদের এতো উত্তেজনা, এতো প্রেম, এতো উন্মাদনা তার পথা চলা শুরু হয়েছিল ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তের কলমে। ডাক্তারি পেশার পাশাপাশি লেখক হবার স্বপ্নে মশগুল ছিলেন নীহাররঞ্জন গুপ্ত। একসময় তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ গ্রহণসহ তার স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। মাত্র আঠারো বছর বয়সে নীহাররঞ্জন তার প্রথম উপন্যাস ‘রাজকুমার’ রচনা করেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন আলাপ হয় আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে, তাঁর গোয়েন্দা সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন কিরীটী চরিত্রটি। কিরীটী রায়ের আবির্ভাব “কালো ভ্রমর” উপন্যাসে। ১৯৩০ সালে প্রথম আবির্ভাবে এই গোয়েন্দা চরিত্রের। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। পরবর্তীতে কিরীটী তীব্র জনপ্রিয়তা পায় বাঙালি পাঠকমহলে। তিনিও বাংলা সাহিত্যে রহস্য কাহিনি রচনার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক হয়ে ওঠেন। গল্প, উপন্যাস মিলিয়ে মোট ৮০টি সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে কিরীটী রায়-কে ঘিরে। এ পর্যন্ত প্রায় পঁয়তাল্লিশটি উপন্যাসকে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় চলচ্চিত্রায়ণ করা হয়েছে যথাক্রমে টলিউড ও বলিউডের চলচ্চিত্রাঙ্গনে।
ইংল্যান্ডে থাকাকালীন আলাপ হয় আগাথা ক্রিস্টির সঙ্গে, তাঁর গোয়েন্দা সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন কিরীটী চরিত্রটি। কিরীটী রায়ের আবির্ভাব “কালো ভ্রমর” উপন্যাসে। ১৯৩০ সালে প্রথম আবির্ভাবে এই গোয়েন্দা চরিত্রের। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে।
বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দার এমন হাজিরা বোধহয় সেই প্রথম বার। কালো রঙের মলাটে হলদেটে আঁচড়ে পুরুষমুখের সাইড ফেসের চিত্র, মাথায় সাহেবি টুপি একটু বাঁকানো। টুপির হুডে কপালের অর্ধেকটা ঢাকা। ঠোঁটে জ্বলন্ত চুরুট, তার থেকে ধোঁয়া উঠছে। আমাদের ছোটোবেলার স্মৃতিতে কিরীটীর বই বলতেই মনে আসে এই অবয়ব। এ-ই কিরীটী রায়। সত্যসন্ধানী। নামটা বলা মাত্রই বইয়ের পাতা ফুঁড়ে উঠে আসে এক নায়ক। যে নামের সঙ্গে ওই চরিত্র এক অনিবার্য আকর্ষণে দুর্দান্ত শরীরী ভঙ্গি। অসম্ভব উজ্জ্বল তার পুরুষালি উপস্থিতি। কিরীটী রায়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক বলেছেন “প্রায় সাড়ে ছয় ফুট লম্বা, গৌরবর্ণ, বলিষ্ঠ চেহারা। মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল। ব্যাকব্রাশ করা। চোখে পুরু লেন্সের কাল সেলুলয়েডের ফ্রেমের চশমা। দাড়িগোঁফ নিখুঁতভাবে কামানো। মুখে হাসি যেন লেগেই আছে। সদানন্দ, আমুদে”। ঠিক যেন আমাদের খুব কাছের মানুষ একজন। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে মার্জারি ক্ষিপ্রতা। দৃঢ় পা ফেলে প্রবল আত্মবিশ্বাসে সে এগিয়ে যায় নিশানার দিকে। অটল লক্ষ্যভেদ। যাঁর হাতে নির্ভরতায় ছেড়ে দেওয়া যায় সমস্ত রহস্যের ভার।
আমাদের কিশোরবেলার নস্টালজিয়ার নাম কিরীটী। রহস্যের গন্ধ পেলেই তাতে ঢুঁ মারার অভ্যাস ছিল কিরীটীর। কলেজ পড়াকালীন নেহাতেই শখের বশে রহস্যভেদে নেমে পড়েন। কলেজজীবনের নেশাই পরবর্তীতে পেশায় পরিণত হয়। সুযোগ্য সহযোগী সুব্রত রায়কে সঙ্গে নিয়ে টানটান, উত্তেজনায় ভরা রহস্য সমাধানের সূত্র খুঁজে বেড়িয়েছেন গোয়েন্দা। কিছু গল্পে সুব্রত রায় কথক, কিছু কাহিনি আবার স্বয়ং গোয়েন্দার মুখেই বর্ণিত হয়েছে।
এই কাল্পনিক গোয়েন্দা চরিত্র যেন পক্ষীরাজ ঘোড়া যা পাঠককে উড়িয়ে নিয়ে যায় রহস্যে ভরা রঙিন জগতে। সেই জগতে অন্ধকার থাকলেও অন্ধকারের শেষে রামধনুর মতো আলো ঝিলমিল করে পাঠক মনকে আলোকিত করে রহস্য সমাধানের মাধ্যমে। ফলে সাময়িক মুক্তি মেলে জীবনচর্যার গ্লানি থেকে। কিরীটী চরিত্রকে লেখক এঁকেছেন মধ্যবিত্ত জীবনের মোড়কে। তাই সাহসী কিরীটীরও মাঝে মাঝে বুক ঢিব-ঢিব করে পাঠকের মতোই।
গোয়েন্দা গল্পের প্রাণ তার মধ্যে সৃষ্টি হওয়া সাসপেন্স বা কৌতুহল বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা যা ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্ত তাঁর সৃষ্টিতে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে রক্ষা করেছেন। বাঙালি খুঁজে পেয়েছে প্রখর বুদ্ধিধারী কিশোরবেলার নায়ককে। আর বাঙালি নিজেদের ভিড়েই এই গোয়েন্দা চরিত্রকে উপহার হিসেবে পেয়েছে। আজ কিরীটী জনকের তথা ডাক্তার নীহাররঞ্জন গুপ্তের ১১২ তম জন্মদিবসে ‘কিরীটী’ চরিত্র ঘিরে স্মৃতিচারণা রইলো শ্রদ্ধার্ঘ্য স্বরূপ।
তথ্যসূত্র –
১। উইকিপিডিয়া
২। নীহাররঞ্জন গুপ্ত, বিকাশপিডিয়া
৩। আনন্দবাজার পত্রিকা
৪। www.risingbd.com