No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    নতুন ভাবে বই পড়ার অভ্যাস ফেরাচ্ছে নিউটাউন কমিউনিটি লাইব্রেরি

    নতুন ভাবে বই পড়ার অভ্যাস ফেরাচ্ছে নিউটাউন কমিউনিটি লাইব্রেরি

    Story image

    ই মানে বন্ধু, বই মানে অজানাকে জানার হাতিয়ার। প্রখ্যাত দার্শনিক রেনে দেকার্ত বলেছিলেন, ভালো বই পড়ার অর্থ বিগত শতকের সেরা মানুষটির সঙ্গে কথা বলা। কিন্তু আধুনিকতার দৌড়ে আরও অনেককিছুর মতো হারিয়ে যাচ্ছে বই পড়ার অভ্যেসও। ডিজিটাল যুগে পিডিএফ দখল করে নিচ্ছে হাতে বাঁধানো বই বা মেশিনে বাঁধানো বইয়ের স্থান। তার সঙ্গে আছে অন্যান্য আকর্ষণ। সময়ের অভাবও বড়ো কারণ। সামাজিক মাধ্যমে বই এবং বইপড়া নিয়ে অনেক গ্রুপ, সেখানে প্রতিনিয়ত বই নিয়ে আলোচনা হয়। বইমেলা বা বইয়ের দোকানেও ভিড় চোখে পড়ে। তবু সেসব বই আদতে কতখানি পড়া হয়ে ওঠে, তা নিয়ে সন্দিহান থাকেন বইপ্রেমীরাই। এই সময়ে দাঁড়িয়ে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করাই যেখানে কঠিন কাজ, সেখানে সেরকম কোনও উদ্যোগ আলাদা প্রশংসার দাবি রাখে। সেই লক্ষ্যেই চালু হয়েছে নিউটাউনের ওপেন এয়ার কমিউনিটি লাইব্রেরি। নিউটাউনের এএ-২সি ব্লকের রেচকজোয়ানিতে ফুটসল গ্রাউন্ডের পাশে শুরু হয়েছে এই লাইব্রেরিটি। নিউটাউনের আকাঙ্ক্ষা মোড় থেকে হাঁটাপথের দূরত্বে।

    দূর থেকে হঠাৎ একপলক দেখলে বুকস্টল বলে ভুল হতেই পারে, বিশেষত যাঁরা প্রথমবার দেখছেন। কিন্তু এটি আদতে বিনিপয়সার লাইব্রেরি। যেখানে মানুষ বই দান করেন। সেইসব বই সেখানে বসে পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নিজের নাম আর বইয়ের নাম এন্ট্রি করে বই পড়া যেতে পারে ততক্ষণ, যতক্ষণ স্টলটি খোলা থাকে। অর্থাৎ বিকাল ৩.৩০ থেকে ৭.৩০ পর্যন্ত। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গল থেকে রবিবার। কিন্তু বই কেনা যায় না এখান থেকে। 

    এই উদ্যোগটি নিউটাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি-র (NKDA) সিনিয়ার আধিকারিকের মস্তিষ্কপ্রসূত। এই বছর ১৪ অগাস্ট এই লাইব্রেরিটি চালু করা হয়। এটি দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছে বনানী সেলফ হেল্প গ্রুপ। বনানী সেলফ হেল্প গ্রুপের অন্যতম মেন্টর সৌরভ মুখার্জি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ (KSCH) বলে একটি এনজিও রয়েছে, সেই এনজিও-র অধীনেই এই সেলফ হেল্প গ্রুপ।” তিনি জানান, “মানুষের পড়ার অভ্যাস তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। এখন ডিজিটাল মাধ্যমের দৌলতে কনটেন্টের অভাব নেই। কিন্তু ধৈর্য ধরে পড়ার অভ্যাস চলে গেছে। আমরা সেটাকেই ফিরিয়ে আনতে চাই।” তাঁর দাবি, নিউটাউন তথা কলকাতায় এমন উদ্যোগ প্রথম, যেখানে প্রতিদিন এসে বই পড়ার সুযোগ রয়েছে, সম্পূর্ণ নিখরচায়। নিউটাউনের মতো স্মার্ট সিটি, যেখানে প্রচুর মানুষ বসবাস করেন, সেখানে যদি সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বইপড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, তবে তাতে সমাজেরই লাভ, যুক্তি দিলেন সৌরভ।

    এখানে যেসব বই রয়েছে, সব বই-ই ডোনেট করেছেন কেউ না কেউ। কোনও বই কেনা হয় না কেন? জবাবে সৌরভ বলেন, “এটা করা হয়েছে মানুষের সংযোগ বাড়ানোর জন্য। যিনি বই দিচ্ছেন, তিনি হয়তো অন্য কাউকে বলবেন, একজনকে দেখে অন্যদেরও বই দেওয়া আর পড়ার ইচ্ছা তৈরি হলো। কারণ শেয়ারিং ইজ কেয়ারিং। আমরা চেয়েছি বইয়ের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়াতে।” তিনি আরও জানান, এখনও পর্যন্ত বাড়িতে বই নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে তা শুরু করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ১০০ টাকার বিনিময়ে একটি বই বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে। ১৫ দিন পর বইটি ফেরত দিলে ফেরত পাওয়া যাবে পুরো টাকাই। তারপর থেকে প্রতি ১৫ দিনে দশ টাকা কেটে নেওয়া হবে (অর্থাৎ, ১৬তম দিনে বই ফেরালে ফেরত পাওয়া যাবে ৯০ টাকা, ৩০ দিন পর বই ফেরত দিলে ফেরত পাওয়া যাবে ৮০ টাকা- এই হিসাবে)। কলকাতায় ইতিমধ্যেই অসংখ্য লাইব্রেরি রয়েছে। যেমন, নিউটাউনের নজরুল তীর্থে রয়েছে নিউটাউন লাইব্রেরি। তবে সেসব লাইব্রেরিতে অনেকক্ষেত্রে মেম্বারশিপ নিতে হয়। এখানে সেই ব্যাপার নেই। আর এখানে রয়েছে খোলা আকাশের নিচে, প্রকৃতির সাহচর্যে বই পড়ার সুযোগ। “কোনও বাচ্চা মাঠে খেলাধূলা করার পর হয়তো কিছুক্ষণ বই পড়ল। কোনও পথচারীও কিছুটা সময় বই পড়ে যেতে পারেন এখানে”, বলেন সৌরভ। 

    এই লাইব্রেরির গায়ে লেখা রয়েছে- ‘Restore-Donate-Recycle’। এখানে পুরোনো যেসব বই জমা পড়ে, সেগুলি যদি ভালো অবস্থায় না থাকে, তাহলে সেগুলিকে সংরক্ষণ করে নতুন চেহারায় ফিরিয়ে আনা হয়। জানা গেল, এখন সেরকম দুটি বই সংরক্ষণের কাজ চলছে। একটি ১৮৯৭ সালে, আর একটি ১৯১০ সালে ছাপানো হয়েছিল। 

    এটিকে বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশেই রয়েছে আর একটি কিয়স্ক। চেষ্টা করা হচ্ছে, সেই কিয়স্কটিতে চা-স্ন্যাক্স রাখার, যাতে পাঠকরা বই পড়ার সময়টুকুকে পুরোপুরি উপভোগ করতে পারেন। এটি দেখাশোনা করেন সৌভিক হালদার। তিনি বলেন, “রোজই বেশ কিছু পাঠক এসে বই পড়েন এখানে। আবহাওয়া ভালো থাকলে দিনে গড়ে ২০ জন পাঠক আসেন।” এখানে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে ছোটোদের বই-বিভিন্ন কমিক্স, ছোটোদের রামায়ণ, মহাভারত যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে অমিতাভ ঘোষের দ্য গ্লাস প্যালেস, বাণী বসুর মোহনা, ডঃ এস এম রেজা আলির মুর্শিদাবাদ ও বাংলার নিজাম ইত্যাদি। তালিকায় রয়েছেন লীলা মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রাস্কিন বন্ড, সুকুমার রায়, অমর্ত্য সেন, মারিও পিউজো প্রমুখ।

    বিকেলবেলা, আবার কিছুক্ষণ আগেই একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। চারপাশ ফাঁকা। সৌভিক বইগুলি গুছিয়ে রাখছিলেন। তবে কিছুক্ষণ পর থেকেই শুরু হলো পাঠকদের আনাগোনা। রাজারহাট থেকে আসা সায়ন রায় জানালেন, তিনি গত ১৫-১৬ দিন ধরে নিয়মিত আসছেন এখানে। তিনি বলেন, “আমার অভিজ্ঞতা খুব ভালো। এখানে এসে শান্তিতে বই পড়া যায়। আমি আমার এক পরিচিতর কাছ থেকে প্রথম শুনি এই জায়গাটার কথা। একদিন এসে এত ভালো লেগে গেছে যে, এখন প্রায় রোজই আসি।” একটু পরেই কিছু কচিকাঁচার দল এসে কমিক্স বই নিয়ে বসে গেল। আরেকজন এসে বই ডোনেট করার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তিনি জানান, “আমি চাই এখানে বই দিতে। চাই এই উদ্যোগ আরও বড়ো হোক। আমি প্রথম এলাম আজকে। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম এখানকার কথা। এবার থেকে নিয়মিত আসব, অন্যদেরও বলব।” বোঝাই গেল, এলাকার মানুষের নজর কেড়েছে এই লাইব্রেরিটি।

    সৌরভ মুখার্জিও সহমত পোষণ করলেন। তাঁর কথায়, “এই উদ্যোগ সফলতার দিকে এগোচ্ছে। এই উদ্যোগকে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নিউটাউনের অন্যত্রও। এমনকি, মেট্রো স্টেশনগুলিতেও বুক কিয়স্ক খোলার কথা পরিকল্পনা রয়েছে।”

    প্রখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, “‘Classic’- a book which people praise but don’t read”। বর্তমানে শুধু ক্লাসিক তকমা প্রাপ্ত বই নয়, সব বইয়ের ক্ষেত্রেই বোধহয় এ কথা বলা যায়। এখন রাস্তাঘাটে সবার হাতেই মোবাইল আর তাতে ঘোরাফেরা করা সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট। তার মধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় জায়গা করে নিচ্ছে এইধরনের কমিউনিটি লাইব্রেরি, বুক কিয়স্ক। নিউটাউনে খুলে গেছে সাইলেন্ট রিডিং পার্ক, যেখানে নিরিবিলিতে বসে বই পড়া যায়। এইসব উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ছে মফস্সলেও। আশা করা যায়, এসব উদ্যোগের হাত ধরে ফিরবে বইয়ের সুদিন, মানুষের হাতে ফোনের বদলে আবার উঠে আসবে বই।

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @