তিনটি বই, তিনটি পাঠ- বাংলা কবিতার নতুন দিগন্ত

একটা সাইকেলের বেল চিরকাল বেজে যাচ্ছে পত্রছিন্ন সন্ধ্যায়...
বাংলাদেশের কবি হাসান রোবায়েত। কী অবলীলায় লিখে চলেন নিজেকে, প্রতিবেশীকে কিংবা আম্মাকে। যেন পাঠ করছেন কোনো এক গোধূলিতে, স্পর্শ ভরিয়ে দিচ্ছে তাঁর হাত, চোখ। তাঁর কবিতায় অনায়াসে চলে আসে গ্রামবাংলার মেঠো ফুল কিংবা হরিৎক্ষেত্রের অনুষঙ্গ। আসে রোদ চলে যাওয়া ছায়া, উঠোন, কবুতর, ডাহুক, শিরিষ। হাসান রোবায়েতের নতুন কবিতা পুস্তিকা ‘আনোখা নদী’। এটি তাঁর তৃতীয় কবিতার বই। এবং বইটি অবশ্যই সেই মেঠো ফুল ছুঁতে চাওয়ার ভাষা শেখায়, আলোর মন্ত্রে পাঠককে বেঁধে রাখে। কবি লেখেন,
“আম্মাকে দেখতাম, একটা লাল ফড়িঙের সঙ্গে বাড়ি ফিরতে-/ সিনেমা শেষে কুলায় গান ঝাড়তে ঝাড়তে আম্মা বলতো-/ ‘যেকোনো বাড়ির সবচে বড় অপচয় তার সদর দরজা-’/ বহুদূর, আনোখা নদীর তীরে লাল ওই ফড়িঙের দেশ-/ বাতাসে গাঙের লতা: তিরতির কাঁপছে একা বিবাহ-কপাট”
রোজ তাঁর নিজের ইগোর সঙ্গে দেখা হয়। খেলা করেন। বাংলা কবিতায় এইরকম নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব খুব একটা অচেনা নয়। কিন্তু হাসান রোবায়েত যখন লেখেন, “তোমার ইগোর ভেতরে ঢুকে/ একটা পাপোস ধুলা ঝাড়ছে সারাদিন”- তখন বোঝা যায় কবি-জীবনের ঋতু বৈচিত্র্য, তাঁর অমোঘ দৃষ্টি। ‘আনোখা নদী’ সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ একটি বই। এই বইয়ের নিবিড় পাঠ আপনাকে কোলাহল পার করে ভাসিয়ে দেবে আবহমান জলের স্রোতে। আবার কবিই আপনার হাত ধরে আপনাকে পারে নিয়ে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করবেন।
গান জাগে, গান যায়, শেষ বর্ষার সবুজে ঘুরে ঘুরে গান যায়...
সে দুই হাত তুলে উড়ে যাওয়া মেঘ। জমানো সম্পর্কের মধ্যে ভিড় করে আসে মাতৃ আলপনা, হালকা সিঁথি, আলতা-পা। বন্দনায় মুখরিত হয় শৈশবের ঘাট। কবি দীপান্বিতা সরকারের নতুন কবিতার বই ‘কুশের আংটি’ এমনই সব বন্দনার গান গায়। যেখানে রোজ সকালে ধুলো ঝরে পুরোনো শাড়ির আলনা থেকে। কবি লিখছেন,
“সেলাই করেছি রাত তার এঁটো নাভিমূল থেকে/ সেখানে ডুবিয়ে মুখ বহু জন্ম ঘুরছ এঁকেবেঁকে/ স্মৃতি কি পাথর তার বুক ভেসে শুধু ঘুম ঝরে/ বিপরীত হাওয়াগুলো ছিটকে গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছে অদেখা বন্দরে”
এই সেলাই যেন ছেলেবেলার কাঁথা। একবার জোড়া লাগলে আর ছিঁড়তে চায় না। এমনই একটা সেলাই, যেখান থেকে কবি কল্পনা করেন তার নীল শরীর, “লিঙ্গ নীল, নীল বিষাদ/ সে যে আদপেই একটা ঘুমিয়ে পড়া জ্যোৎস্নার খিদে”। শ্বাস আটকে যায় কবির অথবা মাতৃগর্ভের শ্বাস আটকে দিতে চান কবি। সেখান থেকেই জন্ম নেবে আতসকাচ কিংবা ছেলেবেলা। বইয়ের একদম শেষে কবি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে স্মরণ করে বলেন,
“এবার খুব বেশি হিম পড়ল, তোমার আজও কোনো আংটি নেই, রেখে যাওনি। আমি গড়িয়ে দিলাম, এই সোনারং কুশের আংটি। ওরা বলেছিল অধিকার নেই। ওরা বলেছিল দুব্বোঘাস।”
কবি কলমের এই শক্তি পাঠককে ভাবায়। ভাবনার রসদ দেয়। বইটি পড়া শেষ হলে একা একটা স্পেস খুঁজে নিতে হয়। এই একা থাকার স্পেসেই বইটির পাঠ সম্পূর্ণ হবে।
আমি ও আমার ছাত্র দরজা খুলে ঝড়কে আমন্ত্রণ জানাব...
কবি পঙ্কজ চক্রবর্তী বাংলা কবিতায় অনেকদিন আগেই এসেছেন, কিন্তু তাঁর বই হল অনেক বছর পর। তাই হয়তো, তাঁর অনেককিছু বলবার আছে, যা যা বাকি থেকে গেছে। চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে যে একপ্রকার দ্বন্দ্ব, তা পঙ্কজবাবুর কবিতায় বর্তমান। তিনি মনে প্রাণে একজন শিক্ষক। ছাত্রদের ঝড় ভাবেন, ঝড়ের ধুলো ভাবেন। তাদের জাপটে ধরে নিজের কাছে রেখে দিতে চান। সবটুকু তাদের দিয়ে, শুধু রেখে যেতে চান ‘স্বচ্ছ জল’। ‘চার ফর্মার সামান্য জীবন’ পঙ্কজ চক্রবর্তীর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। আশ্রমিক নামক কবিতায় তিনি লিখছেন,
“উঠে আয় আমাকে করুণা করে উঠে আয় আরুণি উদ্দালক/ স্বচ্ছ জল, আমি তার নীচে শুয়ে থাকি সারারাত/ লতাপাতার নীচে, শ্যাওলা প্রবালে ঢাকা পড়ে যাক সামান্য শিক্ষক।”
জীবন তাঁকে নদী চিনিয়ে দেয়। নদীর শান্ত ঢেউ চেনায়। নিজেকে অথবা প্রতিবেশীকে তাই যাচাইয়ের চওড়া পথ ধরে একপ্রকার শরীর-বিন্যাস তৈরি হয়। এভাবে মন-আত্মা হয়ে ওঠে ট্রান্সসেক্সুয়াল। কবির ভাষায়, “নারী ও পুরুষের ভূমিকা বদল স্বচ্ছ অন্ধকারের এক জটিল প্রক্রিয়া। একথা জেনেই আমি বাপ্পাকে ডেকে নিই আমার বিছানায়, বলি স্পর্শ করে দ্যাখ আমিও নারীর মতো বেজে উঠি কিনা!”
কবির মধ্যে বাস করে এক অন্তর্লীন রাজনীতি। শীতকালীন উৎসবে মেতে ওঠার আগে তাই বারবার নিজেকে প্রশ্ন করা হয়, উত্তর খোঁজার রাস্তা বাছা হয়। সেখানে “আমরা প্রজা সব অকিঞ্চিৎকর মেতেছি বনমহোৎসবে আর টের পাচ্ছি তোমারও ল্যাজ ক্রমশ গুটিয়ে যাচ্ছে ভিতরে ভিতরে।”
চার ফর্মার এই ‘সামান্য’ জীবনে কবি জিতে গেলেন। বাংলা নতুন কবিতার শরিক হলেন।
আলোচিত কাব্যগ্রন্থ-
১। আনোখা নদী, হাসান রোবায়েত, প্রথম প্রকাশ- ডিসেম্বর ২০১৮, প্রকাশক- তবুও প্রয়াস, দাম- ২৫ টাকা
২। কুশের আংটি, দীপান্বিতা সরকার, প্রথম প্রকাশ- জুন ২০১৮, প্রকাশক- ধানসিড়ি, দাম- ৯৫ টাকা
৩। চার ফর্মার সামান্য জীবন- পঙ্কজ চক্রবর্তী, প্রথম প্রকাশ- নভেম্বর ২০১৮, প্রকাশক- নাটমন্দির, দাম- ১২৫ টাকা