নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়াম : শিশুদের সঙ্গে নিয়ে অর্ধ শতাব্দী পার

“ভবিষ্যতের লক্ষ আশা মোদের মাঝে সন্তরে/ ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে”
‘কিশোর’ কবিতায় ছন্দে ছন্দে কথাগুলো বলেছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা। আর আগামীর প্রতি কবির মতো এই একই অনুভূতি সঞ্চারিত হয়েছিল শিল্পী তথা সমাজ সেবক শ্রী যুগল শ্রীমলের মনে। শিশুরা আগামীর দূত তাই ভবিষ্যৎকে সুন্দর করে তুলতে হলে ফুলের কুঁড়ির মতো শিশুদের ফুটতে দিতে হবে আপন ছন্দে, বড়োদের তৈরি করে দিতে হবে ফুল ফোটার উপযুক্ত পরিবেশ, মনে প্রাণে এই কথা বিশ্বাস করতেন যুগল শ্রীমল। তাঁর সেই চিন্তার ফসল মধ্য কলকাতার নেহরু চিলড্রেন’স মিউজিয়াম (Nehru Children’s Museum)। প্রায় ৫২ বছর ধরে শহুরে নাগপাশে বন্দি শৈশব এখানে খুঁজে পাচ্ছে মুক্তির ঠিকানা। শিশুমনের সঙ্গী পুতুল দিয়ে সাজানো এই সংগ্রহশালায় রয়েছে দেশ বিদেশের হরেক পুতুল, খেলনা গাড়ি। এমনকি রামায়ণ, মহাভারত এই দুই মহাকাব্যিক আখ্যানও এখানে তুলে ধরা হয়েছে পুতুল দিয়ে সাজিয়ে, শিশুদের মনের মতো করে।
রামায়ণ মিউজিয়াম
১৯৭২ সালে ১৪ নভেম্বর রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, ৬২টি দেশের পুতুল, বিজ্ঞান গ্যালারি ও খেলার জগৎ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়াম। উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়।
শুধু পুতুলের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করানোই নয়, অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে শিশুমনের বুকে ঘুমন্ত সৃজনশীল সত্ত্বাকে জাগিয়ে তাকে কথায়, গানে, নাচের মুদ্রায় কখনও বা রং-তুলিতে ফুটিয়ে তোলার দায়িত্বও নিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই মিউজিয়ামের পথচলা? সেই ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যেতে হবে স্বাধীনতার প্রাক্ মুহূর্তে। সেইসময় শ্রী যুগল শ্রীমলের নেতৃত্বে কিছু উদ্যোগী যুবকের উৎসাহে তৈরি হয় জাতীয় সংস্কৃতি পরিষদ। এরপর স্বাধীনতার পরে ১৯৫৪ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৫৯তম প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হল Man and His World প্রদর্শনী। সেই প্রদর্শনীর সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে জাতীয় সংস্কৃতি পরিষদ ১৯৫৫-১৯৫৮ সালে সারা ভারতে মিনিয়েচার মডেলের মাধ্যমে রামায়ণ ও মহাভারতের আখ্যান উপস্থাপিত করে। দেশ জুড়ে প্রশংসিত হয় তাঁদের এই উদ্যোগ। এ ছাড়াও সামাজিক ক্ষেত্রে শ্রমের মর্যাদা, পণপ্রথার বিরোধিতা, খাদ্য অপচয়ের বিরুদ্ধে প্রচার করেন তারা।
আরও পড়ুন: শনিবারের কড়চা : ‘বাংলার পুতুল’ সংখ্যা
এরপর ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন এবং প্রচার অধিকর্তা পি.এস মাথুরের উদ্যোগে কলকাতার চৌরঙ্গীতে জাতীয় পরিষদককে কিছুটা জমি দেওয়া হয়। সেখানেই গড়ে উঠেছে আজকের নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়াম। ১৯৭২ সালে ১৪ নভেম্বর রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, ৬২টি দেশের পুতুল, বিজ্ঞান গ্যালারি ও খেলার জগৎ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়াম। উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়।
গণেশ মিউজিয়াম
অর্ধশতকের পথ পেরিয়ে আজও কীভাবে চলছে এই প্রতিষ্ঠান? নেহরু চিলড্রেন’স মিউজিয়ামের প্রশাসনিক সচিব শিখা মুখার্জি বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আজও আমরা প্রতিষ্ঠাতা যুগল শ্রীমলের পথ ধরেই পথ চলছি। বর্তমানে আমাদের পুতুলের গ্যালারি অনেক বেড়েছে, বিদেশ থেকেও অনেক পুতুল আসছে। পাশাপাশি আমরা গণেশ গ্যালারি তৈরি করেছি, কারণ ভারতীয় সংস্কৃতিতে, শিল্পে গণেশের ভূমিকা আছে। গণেশের নানান মূর্তি আছে আমাদের গণেশ গ্যালারিতে।” শুধু মিউজিয়াম নয়, পারফর্মিং আর্টের দিকেও শিশুদের আগ্রহী করে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে এই প্রতিষ্ঠান। এই ব্যাপারে শিখা জানান, “নম্বর ভিত্তিক পড়াশোনার চাপে শিশুরা এখন জর্জরিত। বইয়ের ব্যাগের ওজনে ছোটো ছোটো কুঁড়িদের মনের কথা চাপা পড়ে যায়। তাই এখানে চাপমুক্ত পরিবেশে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে শিশুদের যুক্ত করে তাদের মানসিক বিকাশের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রথিতযশা শিল্পীরা শিশুদের প্রশিক্ষণ দেন। ২০০৩ সালে রমাপ্রসাদ বণিকের হাত ধরে শুরু হয় নেহরু মিউজিয়াম নাট্যদলের। ২০০৬ সালে এইদল গ্রুপ থিয়েটারের স্বীকৃতি পায়। আসলে ব্যস্ত শৈশবের যুগে, যখন শিশুরাও হিসেবি হয়ে পড়ছে সেখানে ওদের কিছুটা বাধাহীন আনন্দ দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য। কারণ, তাহলে তারা সৃষ্টির আনন্দ পাবে। এই আনন্দই ওদের সারাজীবনের সম্বল হতে পারে।”
আরও পড়ুন: বাংলার পুতুল সাম্রাজ্য
শুধু ছোটোদের জন্য নয়, বড়োদের জন্যেও বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মশালার আয়োজন করে নেহরু চিলড্রেনস মিউজিয়াম। এমনকি কোভিডকালেও সাময়িক কিছুদিন বন্ধ থেকে কার্যপদ্ধতি বদলে অনলাইনে বিভিন্ন ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে আবার ছন্দে ফিরেছে এই প্রতিষ্ঠান।
পুতুল মিউজিয়ামে বাংলার পুতুল
“Every child is special” – ২০০৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘তারে জমিন পর’ ছবির পোস্টারে ছিল এই কথাটি। আর অর্ধশতকের বেশি সময় ধরে মনেপ্রাণে এই কথা বিশ্বাস করে এই সংস্থা গড়ে তুলতে চাইছে সুস্থ-সুন্দর আগামীকে। যেখানে প্রতিযোগিতা নয়, একে অপরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বিশ্বব্যাপী গড়ে তুলবে এক মানববন্ধন, যে বন্ধন ভালোবাসার-প্রেমের। গোলাগুলির বদলে গলাগলির বিশ্ব হয়তো একদিন গড়ে উঠবে, আর সেটা গড়ে তুলবে আজকের ছোটোরা। দু-চোখে এই স্বপ্ন নিয়ে, পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে তাই আরও এগিয়ে চলেছেন নেহেরু চিলড্রেনস মিউজিয়ামের কর্মীরা, শুভানুধ্যায়ীরা।