No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    নজরুলগীতি ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    নজরুলগীতি ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

    Story image

    বর্তমানে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মের পর কোন একক সংগীতস্রষ্টার জনপ্রিয়তা এবং সর্বব্যাপীতার কথা উঠলে আসবে কাজী নজরুলের গান। পৃথিবীর সর্ব সংখ্যক গানের রচয়িতা কবি নজরুল। ৫ হাজার এর অধিক। এর মধ্যে ১৫০০-২০০০ এর মতো গান পাওয়া যায় না, নজরুল বেঁচে থাকতেই হারিয়ে গিয়েছে। যে ৩ হাজারের মতো গান পাওয়া যায় সেটা নিয়েই বলা যায় পৃথিবীর সর্বাধিক সংখ্যক গানের রচয়িতা কবি নজরুল। দ্বিতীয় স্থানে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আনুমানিক ২২২৭ টি। আর নজরুলগীতির জনপ্রিয়তার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান হল শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়-এর।

    কবির শিষ্য, গুণগ্রাহী ও বন্ধুরা ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তাঁর সৃষ্টির ব্যবহার সচল রেখেছিলেন। এর পর থেকেই ষড়যন্ত্রের শুরু। কবির ‘কথার কুসুমে গাঁথা’গানটি - ‘কথা প্রণব রায় ও সুর কমল দাশগুপ্ত’ এভাবে প্রকাশিত হয়ে গেছে। নজরুলের ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’ গানটির সুরকার হিসেবে চিত্ত রায়ের নাম ছাপা হয়েছে। ধীরেন দাস থেকে শিল্পী সতীনাথ হয়ে নতুন যুগের শিল্পীরাও চিত্ত রায়ের সুর হিসেবেই এই গান গেয়েছেন। এমনি করে কবির গান অন্যের নামে হারিয়ে যেতে থাকে। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত নজরুলগীতির অন্ধকার যুগ। ১৯৬৪ সালে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে নজরুলগীতি গাওয়ানো হল। কিন্তু শান্তিনিকেতনের আশ্রমবাসীরা তাঁর রাশ টেনে ধরলেন। আশ্রমকন্যাকে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তিনি ঘরে ফিরলেন। ‘কথা প্রণব রায়’ এবং ‘সুর কমল দাশগুপ্ত’ এভাবে এই গান (‘বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে’) রেকর্ড কোম্পানিতে চুক্তিবদ্ধ হল। ফিরোজা বেগম রবীন্দ্রনাথের গান ছেড়ে কমলগীতি গাইতে শুরু করলেন। বাংলা গানের দ্বিতীয় পর্যায়। গীতিকার ও সুরকার ততদিনে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে।

    মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শ্যামল মিত্র, উৎপলা সেন, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সনৎ সিংহ, রবীন চট্টোপাধ্যায়, রবীন মজুমদার – একঝাঁক নতুন শিল্পী গণমাধ্যমে হাজির। বাংলা গানের নব ধারায় ঢেকে গেল নজরুলী আবহ।

    ‘আমি এত যে তোমায় ভালবেসেছি’, ‘ময়ূরকণ্ঠী রাতের নীলে’, ‘বনে নয় মনে মোর’ ইত্যাদি গানের মাধ্যমে মানবেন্দ্র তখন বাংলা গানের শ্রোতাদের মনে তাঁর জায়গা করে নিয়েছেন। চলচ্চিত্রের কণ্ঠশিল্পীর সাথে সাথে সুরকারের খাতায়ও নাম লেখালেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বাংলা আধুনিক গানের এই ধারায় মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় যখন তুঙ্গে তখন তাঁর কণ্ঠে একক একটি নজরুলগীতির ডিস্ক (১৯৬৫) প্রকাশিত হল। বরিশালের উজিরপুর মুখার্জী পরিবারের উত্তরসূরী মানবেন্দ্র আর একই জেলার তবল-এ-নেওয়াজ রাধাকান্ত নন্দীর যুগলবন্দি। রাধাকান্তের আঙুলে যেন খই ফোটে। ছন্দের আড়ি, কুয়াড়ি হয়ে সমে এসে ধা বাজে পরম লগ্নে। হিন্দুস্তানী সঙ্গীতের তালিমের চরম নির্যাস উভয়ে ঢেলে দিতে পেরেছেন কবির লঘুসঙ্গীতে। যেটা আধুনিক গানে সম্ভব নয়। প্রেমে পড়লেন মানবেন্দ্র। পঁয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধের পর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অনুরোধের আসরের ফাঁকে শ্রোতারা শুনতে থাকে বাণী-বীণার এই নতুন স্বাদ। সঙ্গীতমোদী মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ল নজরুলের গানে। মানব ও নজরুল হয়ে গেলেন একই বৃন্তের ফুল। নজরুলগীতি হয়ে গেল ‘মানবেন্দ্রর গান’। অনুরোধ, মানবেন্দ্র-র গান শুনতে চাই। কোথাও আবার উল্টো ঘটনা – আধুনিক গান শুনব, এসব শুনব না। মানবেন্দ্র সেখানে গোঁয়াড়—শুনতেই হবে। নিজের গাওয়া বিখ্যাত আধুনিক গানের প্রলোভন দেখিয়ে নজরুলের এক ডজন গান শোনানো হয়ে গেছে। কোথাও বা তিনি বাকযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন, কখনো শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন; কিন্তু নজরুলগীতি দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। থামেননি একটুও।

    মানবেন্দ্র নজরুলগীতি নব আন্দোলন শুরু করলেন। তবলায় রাধাকান্ত নন্দী। ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’, ‘এত জল ও কাজল চোখে’, ‘কেন আনো ফুলডোর’, ‘মুসাফির মোছ রে আঁখিজল ফিরে চল’, ‘ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান’ বাংলা গানকে সুরের বন্যায় ভাসিয়ে দিল। অনেকে অভিযোগ তুললেন, ‘মানব তো সুর বিকৃত করছে।’ কিন্তু, তাঁর গায়কীর চাল ধরতে গেলে যে তালিম প্রয়োজন, সেটা তো তাঁদের নেই। না ক্লাসিক্যালে, না নজরুলগীতিতে। পল্লীগীতি ও আধুনিক গানের অক্ষম গায়করা এহেন মন্তব্যে জীবনপাত করেছেন। বাঙালি সঙ্গীত সমাজে ছড়িয়ে গেল মানবেন্দ্র-র গান। এমনকি মানবেন্দ্র নিজের সুরে গাইলেন নজরুলের- ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন’ গানটি। জনপ্রিয় হবার পর তিনি স্বীকার করলেন এ গানের সুর তাঁর।

    নব প্রজন্মের হাতে বাংলা গানের এই শ্রেষ্ঠ ধারার আলোকবর্তিকা যে শিল্পী নিজের জীবন নিঃশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের কাছে দিয়ে গেলেন তার জন্য তিনি অমর, অক্ষয় হয়ে থাকবেন। তারপরও মূল শক্তি হল কাজী নজরুল ইসলামের বাণী ও সুরের অপূর্ব সমন্বয়—ভারতীয় সুর ও ছন্দের সার্থক প্রয়োগ। এ জন্যই সফল হয়েছেন যোগ্য নাবিক মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।

    (ঋণ – ইসিটিশন ব্লগ)

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @