হরির মায়ের হাঁস-মুরগি কিংবা সওকত চাচার গরু-ছাগল – ভালোবাসার পোষ্য ওরাও

যাদবপুর অঞ্চলে আমাদের পাড়ার বাজারে ঘুটিয়ারি শরিফ থেকে হাঁসের ডিম বিক্রি করতে আসেন এক বৃদ্ধা। তাঁর বিক্রিত হাঁসের ডিমের স্বাদের জন্য আমার মতো বাঁধাধরা কয়েকজন খরিদ্দারও জুটিয়েছিলেন। কিন্তু, গত দু’মাস বাজারে তাঁর দেখা পাচ্ছিলাম না। পরিচিত দোকানীরাও কিছু বলতে পারছিলেন না, অনেকে ভাবতে শুরু করেছিলেন তিনি বোধহয় ইহজগতের মায়া কাটিয়েছেন। একদিন ফের বাজারে দেখা গেল বৃদ্ধাকে। কিছু পোলট্রি ও কয়েকটা দেশি মুরগির ডিম নিয়ে এক কোনায় বসে আছেন।
জিজ্ঞেস করলাম- “কী গো দিদা, কোথায় ছিলে এতদিন?”
আরও পড়ুন: বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রাণীটি
আমার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন, তারপর দেখলাম চোখ বেয়ে নেমে আসছে স্বচ্ছ জলের ধারা। মলিন আঁচলে জল মুছতে মুছতে বললেন, “আমার রাণিটাকে বাঁচাতে পারলুমনি গো দিদিভাই। কী অসুক করলো কে জানে! পেট পচে মরলো। ওর জন্যিই তো খেতে পেতুম। এত ডিম দিত। কী স্বাদ! তোমরা তো খেয়েছো... কারোর সহ্য হলুনি। একা বুড়ি মানুষ কী করবো। গেরামে হাঁস-মুরগির ডাক্তার নেই।। মায়া পড়ে গেছলো। কী সন্দর দেখতে ছিল কী বলবো মা! আমি আর হাঁস পুষতে পারবুনি কক্ষনো।”
আগে যেভাবে গ্রামবাংলার পোষ্যপ্রেমের গল্প বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নিত, এখন আর নেই। শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে লীলা মজুমদার, একাধিক সাহিত্যিকরা পোষ্য-প্রেম বিষয়ক একাধিক সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন।
কুকুর, বিড়াল, রঙিন মাছ এসব পোষ্য তো আগাগোড়াই ছিল, এছাড়াও মানুষ নানা বিচিত্র প্রাণীকে পোষ্য হিসেবে নিজের মনিকোঠায় স্থান দিয়েছে। সেই তালিকায় টিকিটিকি, বাদুড়, সাপ, ইঁদুর, কচ্ছপ, শূকর, বাঁদর, মাকড়সা সবই আছে। বন্যতা বাগে এনে সেসব প্রাণীরাও কেমন যেন মানুষ হয়ে ওঠে, নিঃশব্দে একে অপরের ভাষা বোঝাবুঝি হয়। অনুচ্চারিত ভালোবাসা। তবে, শহুরে সমাজে কোনও প্রাণীকে পোষ মানানো, আদর, ভালোবাসা, দেখভাল এসবের ফাঁকে পড়ে হারিয়ে যায় গ্রামবাংলার সহজিয়া পোষ্য-প্রতিপালনের গল্পগুলো। কালুর মায়ের হাঁস-মুরগী কিংবা সওকত চাচার গরু-ছাগল... ওরাও কিন্তু কারও না কারও ভালোবাসার পোষ্য! এবং আগে যেভাবে গ্রামবাংলার পোষ্যপ্রেমের গল্প বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নিত, এখন আর নেই। শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে লীলা মজুমদার, একাধিক সাহিত্যিকরা পোষ্য-প্রেম বিষয়ক একাধিক সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন।
পাড়ার বাজারের ওই ডিম-দিদার কথা থেকেই বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল গফুর মিঞার কথা। প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও এই দুই ঘটনার একটা বিষয় ‘কমন’। অবলা প্রাণীর প্রতি মানবিক প্রেম। মনে পড়ছে সেই গল্পটা? কাশীপুর গ্রামে এক ছেলে, এক মেয়ে এবং মহেশকে নিয়ে গফুর মিঞার বাস। মহেশ একটা গরু কিন্তু গফুরের পুত্রসম। দুঃখ, বেদনা, হতদরিদ্র বাঙালি কৃষকের প্রতিনিধি ছিল গফুর মিঞা। শরৎচন্দ্রের এই গল্প পড়ে পাঠকদের হৃদয় ভিজে যেত যখন জমিদারের প্রবঞ্চনায় সর্বশান্ত, অভাবী কৃষক নিজের সন্তানদের জন্য দুবেলা অন্ন সংস্থান করতে পারে না, মারা যায় তাঁর প্রিয় পোষ্য ‘মহেশ’-ও। পথের পাশে বাবলা গাছের নীচে এসে গফুর কাঁদতে কাঁদতে অদৃষ্টের উদ্দেশে বলে, “আল্লা! আমাকে যত খুশি সাজা দিয়ো কিন্তু মহেশ আমার তেষ্টা নিয়ে মরেচে। তার চ’রে খাবার এতটুকু জমি কেউ রাখেনি। যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি। তার কসুর তুমি যেন কখনো মাপ করো না।”
গফুরের এই করুন আর্তি, হাহাকার শুধু ঈশ্বরের কাছে নয়, সমস্ত গ্রামবাংলার শোষণ ও শাসনের ভয়ঙ্কর নির্মমতার বিরুদ্ধে তীব্র জেহাদ ও হৃদয় বিদারক সুতীক্ষ্ণ হাহাকার যা শহর, সময় ও কাল থেকে কালে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের বাস্তবতা সাহিত্যের অঙ্গনে প্রতিস্থাপিত হয় সুচারুভাবে আজও। চিকিৎসা অথবা অর্থের অভাবে মারা যায় ডিম-দিদাদের ‘রাণি’রা। শহরে ডিমের দাম থাকলেও গ্রামে ওদের জীবনের কোনও মূল্য নেই। একসময় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহেশ’ পড়েননি এরকম বাঙালি খুঁজলেও পাওয়া যেত না। এখন যায়। তখন পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা পর্ষদ এমনকী হিন্দি, ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রমেও ছিল এই গল্প। দিনকাল, রুচি, শিক্ষা, সিলেবাস সবই পাল্টে গেছে। আজ ‘জাতীয় পোষ্য দিবস’। হঠাৎ ‘মহেশ’ বা ডিম-দিদার অবতারণা এই কারণেই। পোষ্য এবং মানুষের বন্ধুতা, আত্মীয়তার এর থেকে উকৃষ্ট উদাহরণ আর কীই বা হতে পারে!
আমরা সকলে জীব, আমাদের জীবজ আচরণগুলোও এক—তাহলে আমরা সভ্যতার মধ্যে আলাদা কী করে? আলাদা, আমাদের অনুভূতির ব্যাপকতায় আর শিল্প ও বোধ-বুদ্ধির প্রয়োগে। কিন্তু এই সভ্যতা যখন তথাকথিত অসভ্যের কাছে হেরে যায়, আমরাও হেরে যাই। ভোলগা, গঙ্গা, সিন্ধু ফেলে আজ আমরা বহুতলবাসী উন্নত জীব, সেই আত্মস্থ পশুপালন আমাদের আরো আরো উন্নত হয়েছে, কোথাও হিংস্রও হয়েছি আমরা, সেটাই আমাদের আড়ালের অবনমন।