No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায় : জাতীয় পুরস্কার জয়ের পর বার্লিন পাড়ি দিয়েছিল যাঁর সিনেমা

    নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায় : জাতীয় পুরস্কার জয়ের পর বার্লিন পাড়ি দিয়েছিল যাঁর সিনেমা

    Story image

    নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায়, সাধারণ মানুষ তো নয়ই এমনকী চলচ্চিত্র জগতের লোকরাও এই নামটির সঙ্গে বিশেষ পরিচিত নন। যাঁরা তাঁকে চিনতেন-জানতেন, তাঁদের কাছেন তিনি ছিলেন শুধুই ‘ন্যাপাদা’। ২৩ অক্টোবর রাত ৯টায় চলে গিয়েছেন বর্ষীয়ান এই চলচ্চিত্রকার। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। দীর্ঘদিন থেকেই ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত অসুখে। মাঝে ধরা পড়ে ক্যানসার। কয়েকদিন আগে আক্রান্ত হয়েছিলেন ম্যালেরিয়ায়। প্রাথমিক ভাবে সুস্থ হয়ে উঠলেও, বেঁচে থাকার লড়াই সাঙ্গ হয় এক সময়।

    ‘ভোম্বল সর্দার’ ছবির জন্য ছোটদের ছবির বিভাগে জাতীয় পুরস্কার পেলেও সেই অর্থে দর্শক মহলে তেমন জনপ্রিয়তা বা পরিচিতি পাননি তিনি। ‘ভম্বল সর্দার’-এ অভিনয় করেছিলেন নীলঞ্জন ভট্টাচার্য, হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়, কামু মুখার্জি, অশোক মিত্র, পূর্ণিমা দেবী, রাহুল রায় প্রমুখ।  ১৯৮৪-তে জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয় তাঁর ছবি। মৃণাল সেনের উপর একটি তথ্যচিত্র ছাড়াও বহু তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন। তবে লাইমলাইটে থাকতে পছন্দ করতেন না।

    আজীবন কলকাতায় ছিলেন নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায়। তবে, ১৯২৭ সালের ১৫ অগস্ট তাঁর জন্ম পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে চলে আসেন এপার বাংলায়। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা। ১৯৪৭ সালে ভারতলক্ষ্মী স্টুডিও ল্যাবরেটরিতে কর্মী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৬ সাল থেকে সহযোগী পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু। কলকাতায় এসে নৃপেনের প্রথম দেখা ছবিটি ছিল জন ফোর্ডের ‘How Green Was My Valley’. ১৯৫৬ সালে হীরেন বসু পরিচালিত ছবি ‘একতারা’-তে প্রথম সহকারী পরিচালক হিসাবে হাতেখড়ি নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায়ের। তারপর ‘রাজধানী থেকে পালিয়ে’ ‘পার্সোনাল এ্যাসিস্টেন্ট’ ‘অভিযান’-এর মতো ছবির দায়িত্বে ছিলেন তিনি। সিনেমার পাশাপাশি কাজ করেছেন ‘মনে রেখো মোর গান’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকেও। পরিচালনা করেছেন ‘নয়নছাতি’, ‘মেজদিদি’, ‘অন্তর্জলি’-র মতো টেলিফিল্ম।

    জড়িয়ে পড়েছিলেন বামপন্থী রাজনীতিতেও। বিখ্যাত কিছু উপন্যাস নিয়ে যেমন বড়পর্দায় কাজ করেছেন, তেমনই সমকালীন যুগের গল্প সিনেপর্দায় দেখাতেও ভালবাসতেন তিনি। প্রতিটি ছবিতেই সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। তাঁর কাজ দেখে শেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস তাঁর কাছে ঋণী হয়ে থাকবে। সিনেমার ভাষা এবং তথ্যচিত্রের ভাষার সমান্তরাল চলন ছিল তাঁর কাজের আঙ্গিক। শুধু শিল্পী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে তাঁর অমায়িক ব্যবহার মনে রাখবে বাংলা ছবির জগৎ।শিল্পী হিরণ মিত্রের কথায়, “ওঃ ন্যাপাদা। অনেক আড্ডা মেরেছি। আমি, দিলীপ, রানা সরকার ও ন্যাপাদা। দারুণ সময় কাটতো। বয়সে কত বড়ো। ১৮ বছর বড়ো। তবুও। আমার ‘মুখ মুখর’ বইতে আছে। ওকে এঁকেছিলাম।” 

    তাঁর মৃত্যুর পর অনেকেই বলছেন ‘বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ইন্দ্রপতন’। অথচ, আক্ষেপ করার মতো বিষয় এই যে, তিনি এতদিন কীভাবে জীবনের সঙ্গে যুঝে যাচ্ছিলেন, সে খবর কেউ রাখেনি। চলচ্চিত্র জগতের অনিরুদ্ধ ধর সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করে লেখেন, “ন্যাপাদার সঙ্গে আমার আগে আলাপ ছিলই। কিন্তু আলাপ গাঢ়তর হয়েছিল মৃণাল সেনের উপর কাজ করতে গিয়ে। ওঁর রাসবিহারী মোড়ের কাছের বাড়িতে। তখনই বয়েস প্রায় ৯০ ছুঁই ছুঁই। কিন্তু সেই বয়সেও কঠিন আড্ডাবাজ। হররোজ বিকেল চারটে বাজতেই সাদার্ন অ্যাভেনিউ-এর চায়ের ঠেকে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, যাও কীভাবে?  বিস্মিত হলেন আমার প্রশ্নে। বললেন, ‘আমি কি তুই নাকি? হেঁটেই চলে যাই। আবার হেঁটেই ফিরি।’ কী যে হয়ে যাচ্ছে এই শহরটা!! ন্যাপাদার মতো অলৌকিক মানুষেরা ক্রমশ অচেনা হতে হতে দ্রুত ভ্যানিশ করে যাচ্ছেন।”

    ছবি: সংগৃহীত

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @