নাম বদলের চু-কিতকিত খেলা
এক সময় মিছিলে খুব শোনা যেত— ‘আমার নাম, তোমার নাম- ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম’। কিন্তু, সবার নাম ভিয়েতনাম হয়ে গেলে অবশ্য ইশকুল-কলেজে, অফিস-কাছারিতে ভারি অসুবিধে হত। যদিও, চাই বা না চাই নাম তো পালটে যায়। কীরকম বলি। বাংলা ব্যুৎপত্তি অভিধানে সুকুমার সেনকে উদ্ধৃত করে অভ্র বসু ‘শক্তিগড়’ শব্দের উৎস সন্ধানে গিয়ে লিখেছেন-- বর্ধমান অঞ্চলের শক্তিগড়-এ কোনও দিন কোনও গড় ছিল না। ফলে শক্তিগড়ের সঙ্গে গড়ের কোনও সম্পর্ক নেই। টিকুর, টিকুরি বা টিকর ইত্যাদি শব্দ বর্ধমান অঞ্চলে উঁচু জায়গা বোঝাতে ব্যবহার হয়। সুকুমার সেনের মতে, এখনকার শক্তিগড়ের কাছে একটি গ্রাম আছে যার নাম সাঁকো। সুকুমার সেন অনুমান করেছেন, জায়গাটির আদি নাম ছিল সাঁকোটিকুর। যার থেকে হল সাঁকটিকর বা সাঁকটিগড়। এই সাঁকটিগড় সাহেবরা আসবার পর ইংরেজি বানানে হল ‘Saktigar’। তা থেকে অনিবার্যভাবে সাঁকটিগড় বাংলায় ফিরে এল শক্তিগড় হয়ে। এই হয়ে ওঠায় প্রচুর সময় লেগেছে। সময়ের পলিতে জাড়িত হয়ে এই পরিবর্তন, যা আমাদের নানা গল্প বলে। এই পরিবর্তনে কোনও হিংস্রতা নেই। কিন্তু যখন আস্ফালন করে বলা হয়, আগ্রার নাম বদলে অগ্রবন করে দাও-- তার মধ্যে থাকে ইতিহাসকে খুন করার প্রবণতা। এবং ইতিহাসবোধ-হীনতাও। কারণ, আগ্রা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটেই বলা হয়েছে মহাভারতের সময়েও আগ্রা নামে একটি শহর ছিল। আবার এটাও বলা হয়েছে, ১৫০৪ সালে আগ্রা শহরের পত্তন হয়। তার মানে তো এই যে, কোনও পুরোনো শহর ধ্বংস করে আগ্রা জন্ম নেয়নি। তাহলে এই ইতিহাস মুছে দেওয়ার রাজনীতি কেন? ইলাহাবাদকে করা হয়েছে প্রয়াগরাজ। মুঘলসরাই হয়ে গিয়েছে দীনদয়াল। ফৈজাবাদ হয়ে গিয়েছে অযোধ্যা। অযোধ্যা থেকে আট কিলোমাটার দূরে ফৈজাবাদ শহর। অযোধ্যার সঙ্গে যেমন আজকের সিপাহি বিদ্রোহের ইতিহাস যেমন জড়িয়ে আছে, তামনি রামায়ণের প্রধান মঞ্চই তো অযোধ্যা। অথর্ব বেদেও আছে অযোধ্যার উল্লেখ, ‘অষ্টচক্রা নবদ্বারা দেবনাং পূরযোধ্যা’(পুরাণকোষ, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী)। এই ইতিহাসের মণি-মুক্তোর উপর উঠে যখন দেখা যায় চু-কিতকিত খেলতে লেগেছে রাজনীতির বালখিল্যেরা তখন ভয় হয়, আফগানিস্তানের ৬ শতকের বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ভেঙে যারা উল্লাস করেছিল, তারা ক্রমশ দলে ভারি হচ্ছে।
খবরের কাগজে দেখলাম পশ্চিমবঙ্গে, আগ্রাকে যারা অগ্রবন করতে চায়, তাদেরই ছানাপোনারা, ইসলামপুরের নাম ঈশ্বরপুর লিখতে শুরু করেছে। ইসলাম মানেই ঈশ্বর, ইতিহাসের প্রতি প্রবল অসহিষ্ণুতাজনিত এই অপচেষ্টার প্রতিবাদ হওয়া উচিত। ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্র এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ইসলামপুর নামের মধ্যে চমৎকার একটি সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রয়েছে। ইসলাম যেমন আরবি শব্দ, তেমনি পুর একটি বৈদিক শব্দ (যেমন, হস্তিনাপুর)। গৌতম ভদ্রের মতে, ‘এটাই হল ভারতীয় সংস্কৃতি’। এর মূলে আঘাত আসতে শুরু করেছে। সতর্ক না হলে সর্বনাশ।
আসলে নামকরণ অনেকের বাতিক থাকে। তার পরিণতি কী হয়, তা বহুকাল আগে আমাদের বলে গিয়েছেন সুকুমার রায়। সুকুমারের সেই লেখা (হযবরল) হুবহু তুলে দেওয়া হল। ‘একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম ছিল অবিমৃষ্যকারিতা, তার ছাতার নাম ছিল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, তার গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষু-- কিন্তু যেই তার বাড়ির নাম দিয়েছে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অমনি ভূমিকম্প হয়ে বাড়িটাড়ি সব পড়ে গিয়েছে। হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ হোঃ..’