No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    পুরুলিয়ার আদিম বন-পাহাড়ির দেশে গাছবাড়ি

    পুরুলিয়ার আদিম বন-পাহাড়ির দেশে গাছবাড়ি

    Story image

    পাশেই ঘন বন আর ঢেউ খেলানো পাহাড়। বনের পথ ধরে হাঁটার সময় দেখা হয়ে যেতেই পারে বুনো হাতির পালের সঙ্গে। কখনো আশ-পাশ থেকে ছাগল ছানা তুলে নিয়ে পালায় লেপার্ড। পূর্ণিমায় এই গোটা এলাকাটাকেই মনে হয় জিনপরির দেশ। লাল মাটি, শাল-পলাশের সারি। উঁচু-নিচু ঢালের রাস্তা। এই আদিম বন্যতার মধ্যেই যদি রাত কাটান গাছবাড়িতে! এখন পুরুলিয়ার বন-পাহাড়ের মধ্যেই মিলবে গাছবাড়িতে রাত কাটানোর সুযোগ।

    ২০১৬ সালে কলকাতার বরুণ ভট্টাচার্য আর গোবিন্দপুরের সুজিত কুমার মিলে পুরুলিয়ার সোনকুপিতে শুরু করেছিলেন বানজারা ক্যাম্প। ৬ বিঘের বিশাল চত্বর জুড়ে ছড়ানো অসংখ্য তাঁবু। সামনেই কোকুবুরু পাহাড়। তার একপাশে মাঠাবুরু। অযোধ্যা পাহাড়-সারির ভাঁজ শুরু হয়ে গেছে এখান থেকেই। ক্যাম্পের ঠিক বাইরেটা থেকেই বন। যাঁরা প্রায়ই রুকস্যাক, তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ কাঁধে পাহাড়ে ছোটেন, তাঁরা অ্যালপাইন ৩৬০ ডিগ্রির প্রতিষ্ঠাতা বরুণ ভট্টাচার্যকে একডাকে চেনেন। বানজারা ক্যাম্প শুরু হওয়ার সময় সোনকুপি বনগ্রামের ৩২টি পরিবারই সম্পূর্ণ নির্ভর করত বনের ওপর। এই ক্যাম্প তাঁদের কাছে জীবিকা-নির্বাহের আরো একটি নতুন জানলা খুলে দিয়েছিল। বরুণবাবু বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলেন, পুরুলিয়ার এই অকৃত্রিম বন্যতাকে আরো কীভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় পর্যটকদের সামনে। অবশ্যই প্রকৃতি ধ্বংস করে নয়। বরং যারা আসবেন, তারা যেন এই বন্যতা, গা ছমছমে পরিবেশে অ্যাডভেঞ্চারের আঁচ নিতেই আসেন। সেই থেকেই মাথায় আসে ‘টংবাড়ির’ পরিকল্পনা।

    টংবাড়ি নামটা শুনে খানিক অবাক লাগতে পারে। বরুণ ভট্টাচার্য বলছিলেন, স্থানীয় আদিবাসীরা গাছের মাথায় মাচা বেঁধে, সেখানে বসে ফসল পাহারা দেন। বুনো হাতির পাল ক্ষেতে ঢুকে পড়ে প্রায়ই। ক্যানেস্তারা বাজিয়ে তখন তাড়াতে হয় তাদের। এই গাছের ওপরের মাচাকে তাঁরা বলেন টংবাড়ি। “সব মিলিয়ে এই নামটা ভারী পছন্দ হয়ে গিয়েছিল” বলছিলেন বরুণবাবু। তা হঠাৎ গাছবাড়ির পরিকল্পনা কেন? বরুণবাবু বলছিলেন- দুর্গম, বন্য এলাকায় রোমাঞ্চের স্বাদ পেতেই তো গাছবাড়িতে থাকে মানুষ। পুরুলিয়া সে-দিক থেকে আদর্শ। সামনেই বন, পাহাড়, হাতির পালের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে যখন তখন। এমন পরিবেশে একটু উঁচু থেকে পুরুলিয়ার এমন মাতাল করা ল্যান্ডস্কেপকে দেখা আর একইসঙ্গে আদিমতার মধ্যেই রাত কাটানো— এমন যুগলবন্দী সহজে মেলে না।

    মায়ানমারের গাছবাড়ির মডেলকে আদর্শ করে বানজারা ক্যাম্পের কাছেই তৈরি হচ্ছে এই টংবাড়ি। গাছের প্রায় কোনো অঙ্গের ক্ষতি না করেই তার ওপরে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে ঘরের ফ্রেম। প্রতিটা ঘরই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। পুরুলিয়ার গা ছমছমে পরিবেশ, দূর থেকে ভেসে আসা ময়ূরের ডাক, অতর্কিতে ডানা ঝাপটে উড়ে যাওয়া কোনো অচেনা পাখি আপনাকে নিয়ে এসে ফেলবেই এক রূপকথার জগতে। সেই ঘোরকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে এই গাছবাড়ি।

    তবে, গাছবাড়ি ছাড়াও চাইলে কেউ থাকতে পারেন রাজশাহি অকটাগন তাঁবুতে। এখানেও মিলবে এয়ারকুলারের ব্যবস্থা। কোলম্যানের আধুনিকতম ক্যাম্পিং সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে তাঁবু। থাকছে ফোল্ডিং ক্যাম্প চেয়ার, রেফ্রিজারেটরের বদলি কুলার বক্স। তাঁবুতে থাকা প্রত্যেককেই দেওয়া হবে হেডল্যাম্প। সমস্ত ক্যাম্পিং গেজেটসের সুবিধে ভারতের কোনো ক্যাম্পে এই প্রথম।

    উজাড় করা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই ক্যাম্পে মিলবে ঢালাও অ্যাডভেঞ্চারের ব্যবস্থাও। থাকছে বার্মা ব্রিজ, নেট ক্লাইম্বিং-এর সুযোগ। রক ক্লাইম্বিং বা র্যা্পেলিং-এর হাতেখড়িও হতে পারে এখানে। বন্য, পাহাড়ি রাস্তায় সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ার ব্যবস্থাও থাকছে। আর ইতি-উতি, কোকুবুরুর চুড়োয় বা মাঠাপাহাড়ের মাথায় চড়ে বসার সুযোগ তো আছেই। চাইলে নিজেই খুঁজে বের করে নিতে পারেন নতুন নতুন ট্রেকিং রুট।

    সারাদিনের অ্যাডভেঞ্চারের পর বানজারা ক্যাম্পের মতোই সন্ধেটা বড়ো মায়াবি হয়ে আসবে এই ক্যাম্পেও। বসবে ছৌ-নাচ বা সাঁওতালি পাতা-নাচের আসর। কিংবা হয়তো ঝুমুর। তারপর একসময় ফুরোবে গান-নাচের আয়োজন। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার পালাও মিটবে। হঠাৎ নির্জনতা আরো ঝুপ করে নেমে আসবে চারপাশে। অন্ধাকারের মধ্যেই দিব্বি ঠাহর করা যাবে পাহাড়ের আদল। হাতছানি দেবে বন থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ ডাক। এইসব নেশা এড়িয়ে থাকাই মুশকিল।

    তাহলে আর কী? অ্যাডভেঞ্চার আর প্রকৃতির স্বাদ একবারে চেটেপুটে নিতে চাইলে এবারে ঠিকানা হোক টংবাড়ি। ক’দিন পরেই দুর্গাপুজো। তখনই উদ্বোধন এই নতুন গাছবাড়ির। সে প্রায় সেজে উঠেছে অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য।

     

    কীভাবে যাবেন?
    বরাভূম স্টেশন থেকে দূরত্ব ২২ কিমি, পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ৫৪ কিমি। আগে থেকে বুকিং থাকলে গাড়ি পাঠানো হবে ক্যাম্প থেকেই। সড়কপথেও আসা যায়। কলকাতা থেকে দূরত্ব ৩৪৬ কিমি। নিকটতম বাসস্ট্যান্ড দুয়ারসিনি মোড়, মাঠা। সেখান থেকে অবশ্য পায়ে হেঁটেই আসতে হবে বন্য পথ ধরে।
    কোথায় কোথায় যাবেন?
    পাহাড়ি পথে ট্রেক ছাড়াও গাড়িতে ঘুরে আসতে পারেন অযোধ্যা ড্যাম, বামনি নদীর ঝরনা, ঠুরগা নদীর ঝরনা, তারপানিয়া লেক, খয়রাবেরা ড্যাম, পাপরাকোচা ড্যাম, মাঠা পাহাড়, পাখি পাহাড়, মুরুগুমা ড্যাম, চান্ডিল ড্যাম এবং ছৌ মুখোশের গ্রাম চড়িদায়।
    কখন যাবেন?
    গ্রীষ্মের ৩ মাস বাদে যে-কোনো সময়ে।
    কী কী করবেন/ করবেন না?
    সঙ্গে রাখবেন প্রয়োজনীয় ওষুধ। ক্যাম্পের পরিবেশ নষ্ট করার মতো কাজ করবেন না। বনের মধ্যে গেলে গাইড সঙ্গে নেওয়া উচিত।
    যোগাযোগ:
    বরুণ ভট্টাচার্য (৬২৮৯৩৮২২৭৭)


    প্রচ্ছদের ছবিতে: বাঁদিকে মায়ানমারের গাছবাড়ি, ডানদিকে পুরুলিয়ার নির্মীয়মান গাছবাড়ি। তাঁবুর ছবি কোলম্যানের ওয়েবসাইট থেকে। এই তাঁবুটাই বসানো হবে এই ক্যাম্পে।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @