No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    চার্জ দেওয়ার ঝামেলা ছাড়াই দিব্যি এগোচ্ছে চন্দনবাবুর অভিনব সোলার সাইকেল

    চার্জ দেওয়ার ঝামেলা ছাড়াই দিব্যি এগোচ্ছে চন্দনবাবুর অভিনব সোলার সাইকেল

    Story image

    ইংরেজিতে একটি কথা আছে, “Necessity is the mother of invention”। অর্থাৎ প্রয়োজন অথবা তাগিদই নতুন কিছু সৃষ্টিতে সহায়তা করে। জীবনের এই সার কথাটিকেই সত্য প্রমাণ করেছেন নদিয়ার কেচুয়াডাঙ্গা ব্লকের অন্তর্গত করিমপুরের (Karimpur) বাসিন্দা চন্দন বিশ্বাস (Chandan Biswas)। যাতায়াতের খরচ এবং সময় বাঁচাতে অভিনব সোলার সাইকেল তৈরির কথা ভাবেন তিনি।

    নদিয়া জেলার (Nadia) করিমপুরের বাড়ি থেকে তাঁর অফিসের দুরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। প্রতিদিন এতোটা পথ সাইকেলে প্যাডেল করে যাতায়াত করা যে শুধুই ক্লান্তিকর ছিল তা নয়, সময়সাপেক্ষও ছিল। তাই, সাধ্যের মধ্যেই তিনি পরিবহণের বিকল্প উপায়গুলি খুঁজতে শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যে তৈরি করে ফেলেন একটি অভিনব সৌরশক্তি চালিত সোলার সাইকেল (Solar Cycle)। কোনোরকম চার্জ দেওয়ার ঝামেলা ছাড়া এই সাইকেলে চেপে বিনা খাটনিতে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় গন্তব্যে। এই অভাবনীয় আবিষ্কারে খুশি হয়ে তাঁর পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী সহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা সকলেই ভূয়সী প্রশংসা করেছেন চন্দনবাবুকে।

    বর্তমানে আধুনিক জীবনযাপন সম্পূর্ণরূপে শক্তির ওপর নির্ভরশীল। যাতায়াত ব্যাবস্থা থেকে শুরু করে বাড়ি-ঘর গরম অথবা ঠাণ্ডা করা, বিদ্যুত্যের সরবরাহ, রান্নাবান্না কিংবা বিল্ডিং তৈরির যাবতীয় কাজ সবকিছুতেই প্রয়োজন কোনো না কোনো শক্তির উৎস। খনিজ তেল, কয়লা এবং গ্যাসের মতো জীবাশ্ম শক্তির উৎসগুলির প্রাথমিকভাবে ব্যবহার করা হয় এসব কাজে। কিন্তু আমাদের পরিবেশের ওপর এই সমস্ত জীবাশ্ম শক্তির বহুল ব্যবহার, দ্বিগুণ পরিমাণ নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। একদিকে, জীবাশ্ম সম্পদ পোড়ানোর ফলে আমাদের পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) -এর মতো প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। অন্যদিকে এগুলি পুনর্নবীকরণযোগ্য না হওয়ায় মাটি এবং বায়ু দূষণও সৃষ্টি করে। তাই পরিবেশ রক্ষার্থে এই মুহূর্তে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পুনর্নবীকরণযোগ্য এবং টেকসই শক্তির উত্সগুলিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেই দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিজ্ঞানীরা পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য প্রতিনয়ত কাজ করছেন। এই প্রসঙ্গে জেনে রাখা দরকার, সৌরশক্তি (Sun Energy) হল একটি প্রধান বিকল্প উৎস যা পৃথিবীকে ডিকার্বনাইজ করার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

    বর্তমানে গবেষক এবং বিজ্ঞানীরা দেশে পরিবহন মাধ্যম থেকে সৃষ্ট বায়ু দূষণ কমাতে পেট্রোল অথবা ডিজেল চালিত গাড়ির বদলে বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে জোর দিচ্ছেন। বিদ্যুৎ চালিত বাস এবং চারচাকা গাড়ির পাশাপাশি তৈরি হয়েছে দু-চাকার ইলেকট্রিক সাইকেল। এ সাইকেলটি পরিবেশ-বান্ধব হয়েছে ঠিকই তবে পকেট-বান্ধব হয়ে উঠতে পারেনি। সাধারণ মধ্যবিত্তদের সামর্থ্যের বাইরে এ সাইকেল। তাই এই সমস্যার সমাধানে বাণিজ্যিকভাবে সৌর-সহায়ক সাইকেল তৈরির পরীক্ষাও চলছে। কিন্তু চন্দনবাবুর যেন তেন প্রকরেণ শীঘ্রই একটি বিকল্প মাধ্যমের প্রয়োজন ছিল। যখন থেকে শক্তির বিকল্প উত্স হিসাবে সৌরশক্তি ব্যবহারের কথা জানতে পারেন, তখন থেকেই অবসর সময়ে পুরোনো সাইকেলটি মেরামতির কাজে হাত লাগান। পরিকল্পনা করেন এটিকে আমূল পরিবর্তন করার। তাঁর এই সংকল্পই তাঁকে প্রকল্পে এগিয়ে যাওয়ার পথে আত্মবিশ্বাস জোগায়। পুরোনো সাইকেলটিকে পরিবর্তন করে তাক লাগিয়ে দেন চন্দনবাবু। মোটর এবং প্যাডেল দুইয়ের সাহায্যেই অনায়াসে চালানো সম্ভব চন্দনবাবুর সৌরশক্তি চালিত অভিনব সোলার সাইকেলটি।

    পুরোনো সাইকেলটিকে পরিবর্তন করে তাক লাগিয়ে দেন চন্দনবাবু। মোটর এবং প্যাডেল দুইয়ের সাহায্যেই অনায়াসে চালানো সম্ভব চন্দনবাবুর সৌরশক্তি চালিত অভিনব সোলার সাইকেলটি।

    পেশায় চন্দন বিশ্বাস একজন সরকারি লাইসেন্স প্রাপ্ত দলিল-লেখক। সম্পত্তির দলিল এবং অন্যান্য নথি প্রস্তুত করেন। দলিলের খসড়া-ডিড তৈরি এবং স্ট্যাম্প পেপারে শিলমোহর পড়া সংক্রান্ত কাজের জন্য প্রতিদিন সরকারি রেজিস্ট্রার অফিসে যেতে হয় তাঁকে। এতদিন পুরোনো সাইকেলটিতে প্যাডেল করেই যাতায়াত করতেন। যদিও এখন আর কষ্ট করতে হয় না চন্দনবাবুকে। নয়া পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে তাঁর যাতায়াত হয়েছে সহজতর। এখানেই শেষ নয়, তিনি নিজের সাফল্যকে ছড়িয়ে দিতে চান মানুষের  উপকারে। নদিয়ার চন্দন বিশ্বাস এখন বাণিজ্যিকভাবে সোলার সাইকেল তৈরি করতে উত্সাহী। অভিনব সোলার সাইকেলটি নতুন করে তৈরি করতে খরচ পড়েছিল প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। যদিও তিনি নিশ্চিত যদি কোনো ব্যক্তি বানিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক অর্থ ব্যয় করতে ইচ্ছুক হন তবে উৎপাদন ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। প্রতি সাইকেল পিছু খরচ ৩০,০০০ টাকায় নেমে আসবে বলে জানান চন্দনবাবু।

    চন্দনবাবু যখনই রাস্তা দিয়ে এই সোলার সাইকেলটি চালিয়ে যান, তখন নিমেষেই নজর কাড়ে সকলের। ভিড় জমে যায় রাস্তায়। এমনকি দোকানদারেরা নিজেদের দোকান ফেলে ‘জাদুকরী’ সাইকেলটি কাছ থেকে দেখার জন্য এগিয়ে আসেন। বিশ্বাসবাবু প্রথমে সাইকেলে সোলার ব্যাটারি বসিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলো নিয়মিত চার্জ দিতে হতো। সেই বাড়তি ঝামেলা এড়াতেই তিনি সাইকেলের ওপরে একটি সোলার প্যানেল বসান। যাতায়াতের সময় সৌর শক্তির সাহায্যে নিজে থেকেই সোলার প্যানেল ব্যাটারিগুলিকে চার্জ করে, তাই আলাদাভাবে আর চার্জ করার প্রয়োজন পড়ে না৷ সাইকেলের গড় গতি প্রতি ঘন্টায় ৩৫ কিলোমিটার। ব্যাটারিগুলিতে সম্পূর্ণ চার্জ থাকলে, ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ চলতে পারে এ সাইকেল। চন্দনবাবুর স্ত্রী প্রণতি বিশ্বাস (Pranati Biswas) তাঁর স্বামীর তৈরি অনন্য সাইকেল নিয়ে গর্বিত। পাশাপাশি তাঁর সহকর্মীরাও সকলেই খুব খুশি।

    মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @