শহর নয়, গ্রামবাংলার জীবনরূপ হয়েই বেঁচে আছে নবান্ন উৎসব

ছবিঃ উইকিপিডিয়া
একটা সময় ছিল যখন স্বল্প ফলনের, দেশি জাতের, এক ফসলি ধান ছিল ‘সোনার দানা’। আর এখন ধানের কত বৈচিত্র্য, তা নিয়ে গবেষকরা অহরহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলার মানুষের জীবনে অবিচ্ছেদ্য আনন্দের বার্তা নিয়ে আসত অঘ্রান ও ‘নবান্ন’। বাংলার প্রাচীনতম উত্সবগুলোর একটি। সারা বছর ফসল ফলিয়ে যাঁরা শহরকে নিরন্ন থাকতে দেয় না, বর্তমানে নবান্ন উৎসব টিকিয়ে রেখেছেন তাঁরাই। শহর নয়, গ্রামবাংলার জীবনরূপ হয়েই বেঁচে আছে এই উৎসব – বাঙালির ঐতিহ্যবাহী শস্যোত্সব।
মুড়ি-মুড়কি খই চিড়ে নানা রকমের পিঠে-পায়েশ-নাড়ু, চালভাজা কত কী! ধান চাল থেকেই তো সব তৈরি হয়। ধুপ্ ধুপ্ অনবরত, ক্লান্তিবিহীন ঢেঁকিতে পা পড়ে গৃহস্থ বাড়ির মেয়েদের। কত রকমের ধান- ঋতু অনুযায়ী, আউশ, আমন, বোরো। পোলাও-কোর্মা রোস্ট-কাবাব নয়, ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে পুকুরের খাল-বিলের মাছ ঘরের হাঁস-মুরগি, ডাল, দুধ, দই, গুড় এগুলোই হল নবান্নের গ্রামীণ খাবার।
ডিএল রায় তাঁর অমর গানে ধন-ধান্যের কথা বলেছেন। ‘এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায়, বাতাস কাহার দেশে।’ সোনালী ঢেউ তুলে ধান্য-শীর্ষ যে আবেগ ও শোভা সৃষ্টি করে তা ভাবের কবিদের সম্পদ এটি চিত্ত নয় গতিময় চিত্রকল্প। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’ গানটির অনুষঙ্গ পাকা ধান ও প্রকৃতি, রাশি রাশি রোদ। রাশি রাশি ধান দিয়েই তো রবীন্দ্রনাথ কবিতার ‘অনুপ্রাস’ দিয়েছেন- রাশি রাশি ভারা ভারা/ধান কাটা হল সারা। এখানে কবিতার নাম কাব্যের নাম সবই সোনা- ‘সোনার তরী’।
রূপান্তরিত বিশ্বে কৃষি এখন যন্ত্রাধীন বটে, কিন্তু কিষান-কিষানির জীবনরূপই হল গ্রামবাংলা। এদের জীবনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেটা হবে না, যদ্দিন না ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়। তারা প্রতি ঋতুতে ধান ফলাচ্ছে। ধান চালের অভাব অর্থাৎ খাদ্যের অভাব তারা ঘটতে দেয় না। আজ আর দুর্ভিক্ষ নেই দেশে। তবে, শাসনচক্র কৃষকের পরিশ্রমের কথা না বলে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করে, ধানের ন্যায্য দাম না দেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। কৃষকরা সব সময় নির্যাতিত সেই সামন্ত যুগ থেকে আরম্ভ করে বর্তমান সময়েও। তবু তারা বহমান কাল ধরে ধানের চাষ করে, পাকা ধান কাটে।
নবান্ন আসলে বেঁচে থাকার কথা বলে। নবান্ন ক্ষিদে জয় করার উৎসব। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের বাস্তবতা। দুর্ভিক্ষ, আকাল, যুদ্ধ, মন্বন্তর, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে এক হয়ে লড়াই করার কথা বলে। বিজন ভট্টাচর্যের নবান্ন নাটকে আকাল পীড়িত ক্ষুধার্ত গ্রাম্যচাষীরা নগরের পথে পথে ফ্যান চায়। অনেক লড়াই আর স্বজন হারিয়ে গ্রামে ফিরে এসে নতুন জীবনের অঙ্গীকার করে নবান্ন উৎসবে মেতে ওঠে। ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যের প্রান্তিক মানুষ ঈশ্বরী পাটনি। দেবীর দয়া লাভ করেও ঘড়া ঘড়া মোহর চায়নি। চেয়েছিল একমুঠো অন্ন, প্রিয় সন্তানের জন্য - আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। বিভূতিভূষণের আরণ্যক উপন্যাসের হত-দরিদ্র গনোরি তেওয়ারির দল। দীর্ঘ নয় মাইল পথ হেঁটে এসেছিল স্রেফ এক মুঠো গরম ভাত খাওয়ার আশায়। এমনকি আমাদের মহাকরণ বাড়ির নামও নবান্ন।
ব্যাকুল মাতৃমূর্তির অন্নপূর্ণা হয়ে ওঠার লৌকিক কাহিনি - এই নবান্ন উৎসব।