No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    চন্দ্রাবতীর মতো নারী-সাহিত্যিকরা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন রামায়ণকে, দেখিয়েছিলেন নবনীতা

    চন্দ্রাবতীর মতো নারী-সাহিত্যিকরা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন রামায়ণকে, দেখিয়েছিলেন নবনীতা

    Story image

    ২০০৯ সাল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে ছাত্রদের জন্যে আয়োজিত এক আলোচনাচক্র। বিষয় রামায়ণ। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র হিসেবে আমি তাতে যোগ দিই, চন্দ্রাবতীর রামায়ণের ওপর আলোচনা করার জন্যে। একে একে সংগ্রহ করলাম দীনেশচন্দ্র সেন-সম্পাদিত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’, ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক-সংকলিত ‘প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা’। পড়া হল প্রসাদকুমার মাইতির ‘রামকথার বিকাশের ধারা’, ভি. রাঘবন-সম্পাদিত ‘The Ramayana Tradition in Asia’। চন্দ্রাবতীর লেখা রামায়ণের সঙ্গে পরিচয় ঘটল। আর রামায়ণের পরিচিত আখ্যানবিন্যাসের সঙ্গে এই রামায়ণের পার্থক্য বিস্মিত করল।

    পাশাপাশি বাংলা বিদ্যাচর্চার বৌদ্ধিক পরিমণ্ডলে, বাংলার বিদ্যায়তনিক পরিবেশে ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের বাঙালি কবি চন্দ্রাবতীর এই রামায়ণকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যিনি, তাঁর প্রবন্ধগুলিও নজরে এল। তিনি নবনীতা দেবসেন। ১৯৯০-১৯৯১ সালে, অর্থাৎ আমাদের সেই পাঠের প্রায় দু’ দশক আগে দিল্লি ও কানাডাতে এই প্রায়-বিস্মৃত রামায়ণকে নতুন করে উপস্থাপিত করেছিলেন তিনি। সেই ইংরেজি গবেষণা-প্রবন্ধের বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয় তাপস ভৌমিকের সম্পাদনায় ‘কোরক’ পত্রিকার ‘রামায়ণ’ সংখ্যায় (শারদ ১৯৯৮)। চন্দ্রাবতীর রামায়ণের বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি আর বিদ্যায়তনিক মহলে তাকে অস্বীকরণের রাজনীতি তীক্ষ্ণভাবে চিহ্নিত করেছিলেন নবনীতা। বাংলার সাহিত্য-ইতিহাসের বইগুলি কীভাবে উপেক্ষা করেছে এই রামায়ণকে, অথবা আলোচিত হলেও আদতে সচেতনভাবে ঘটানো হয়েছে অবমাননা, নবনীতার প্রবন্ধ আমাদের সে সম্বন্ধে অবগত করে।

    নবনীতা এও জানিয়েছিলেন, গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে মেয়েদের মৌখিক ও লিখিত সাহিত্যধারায় রামায়ণ-আখ্যান কীভাবে বারবার পুনর্ব্যাখ্যাত হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শুধু বাংলা নয়, দক্ষিণ ভারত বা বহির্ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলে নারীকথকদের মুখে রামায়ণের গল্পের অজস্র রূপান্তর খুঁজে পাওয়া যায়, যা ভারতবর্ষের রামকথার তথাকথিত ‘মূলস্রোত’ সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দিগ্ধ করে তুলতে পারে পাঠককে। অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নবনীতা রামকথা-বিষয়ক দীর্ঘদিনের প্রতর্কে এই স্বতন্ত্র সংযোজনটি করেন। চন্দ্রাবতীর জীবনের ব্যর্থ প্রেমের করুণ কাহিনিটুকু চিত্তাকর্ষক হলেও তা যে কবিজীবনের শেষ সারকথা নয়, এই বিষয়ে সওয়াল করেছিলেন তিনি। চন্দ্রাবতীর রামায়ণের যে নিজস্ব বিশেষত্বগুলি তিনি চিহ্নিত করেন, তা ছিল তার পাঁচালি-গুণ, ভাষাগত সজীবতা, গ্রামীণ সারল্য ও অন্তরঙ্গতা, সমূহ বা সমষ্টির মধ্যে থেকে তার স্বতঃস্ফূর্ত উদ্ভাস, গাল্পিক বয়নের স্বতন্ত্র ম্যাজিক। আর এসবের মাধ্যমেই মহাকাব্যের প্রচলিত ছক থেকে বেরিয়ে তা একটি সমান্তরাল সম্ভাবনা তৈরি করে ফেলে, রাম-রাবণের চিরাচরিত ভাল-মন্দ ন্যায়-অন্যায় শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বকে পেরিয়ে গিয়ে সে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ তৈরি করতে পারে, যা একইসূত্রে সীতা-সরমা-মন্দোদরীদের যন্ত্রণাকে, তাদের প্রতি উপেক্ষা, প্রবঞ্চনাকে ধারণ করে। মহাকাব্য-আখ্যানের লিঙ্গবৈষম্যের বিপ্রতীপে তাই এই আখ্যানগুলিও স্পষ্টভাবেই লিঙ্গায়িত। সেই কারণে নবনীতা চন্দ্রাবতীর রচনাটিকে বিশেষিত করেন ‘নারীর মহাকাব্য’ বলে।

    আমার প্রশ্ন এখানেই জন্মেছিল। মহাকাব্য রচনার সমস্ত দায়কে সচেতনভাবে অস্বীকার করে, মহাকাব্যের ব্যাকরণকে ইচ্ছে করেই প্রত্যাখ্যান করে যে কাহিনি লেখা হল বা কথিত হল লোকাশ্রয়ী কাব্যছন্দে, ওজস্বিতার ধার না ধেরে পুববাংলার নদীস্রোতের মত ঝিরঝিরে ভাষায় যাকে ধারণ করলেন লেখক, যে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর নেই, যে যুদ্ধ তাঁদের মোটেও বিনোদিত করে না, সেই বিশাল-বিশাল লড়াইয়ের হিংস্র বিবরণকে প্রায় উড়িয়ে দিয়ে নিঃশব্দে মহাকাব্যের বিরুদ্ধে আশ্চর্য প্রতিরোধ তৈরি করলেন, সেই লেখকের রচনাকে ফের 'মহাকাব্য' বলেই অভিহিত করা কি উচিত হল? বরং তাতে কি শিল্পভাবনা ও সাহিত্যভাবনার পুরুষতান্ত্রিক প্রবণতাটিকেই স্বীকার করে ফেলা হল না? একজন হিন্দু বাঙালি মেয়ে যে স্বতঃস্ফূর্ত দক্ষতায় ধর্মসাহিত্যের ভিতর থেকে গল্পটিকে নিজেদের মত করে আয়ত্ত করলেন, ‘মহাকাব্য’-এর কি আদৌ ক্ষমতা আছে তাকে গ্রহণ করার?

    বিশ্ববিদ্যালয়ের সেদিনের আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন না নবনীতা দেবসেন। তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের ওই উদ্যোগের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত অধ্যাপক ঈপ্সিতা চন্দ সেমিনারের শেষে আমাদের বলেছিলেন, নবনীতা দেবসেন ওই প্রবন্ধটি পড়তে চেয়েছেন, কোথায় কোথায় তাঁর বক্তব্যের বিরোধী ধারণা উঠে আসছে ছাত্রমহল থেকে, এটা জানা তাঁর একান্তই দরকার। দুর্ভাগ্যক্রমে এক দশকের মধ্যেও তাঁকে সেই প্রবন্ধ পড়ানো হয়নি আমার। কিন্তু আজ যখন তাঁর ঘনিষ্ঠ ছাত্র-অধ্যাপক-লেখক-শিল্পী-পাঠক-শ্রোতা সকলেই তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও স্নেহময় ব্যক্তিত্বের দুর্লভ মেলবন্ধনটির স্মৃতিচারণ করছেন, তখন আমার এই অসম্পূর্ণ অতিসংক্ষিপ্ত স্মৃতির আবছা কুয়াশার ভিতরেও দেখতে পাচ্ছি একটি প্রশ্রয়ী লাল টিপ!...

    উদারতা ক্রমশ দুর্লভ হয়ে আসছে যে...

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @