স্বপ্নাদেশ, কিংবদন্তি জড়ানো এই ৫০০ বছরের পুজোয়

কলকাতার দুর্গাপুজোর বাহারি আলো-জাঁকজমক-ভিড়ের থেকে অনেকটা দূরে একটা ছোট্টো গ্রাম। বাঁকুড়া জেলার পাত্রসায়র ব্লকের শালি নদীর তীরে—শ্যামদাসপুর। এখানে এখনও উজাড় করে ফোটে কাশফুল। শিউলি, ছাতিম আর ভোরের মিহি শিশিরে নিজের সমস্ত গন্ধ নিয়েই শরৎ আসে। আর আসে পুজো। ‘মণ্ডলবাড়ির’ দুর্গাপুজো। বহরে-বাহারে-খরচায় কলকাতার যে কোনো পুজোই হয়তো এই পুজোর থেকে ঢের এগিয়ে। কিন্তু, একটা ব্যাপারে ‘মণ্ডলবাড়ির’ পুজোকে ছুঁতেই পারবে না তারা। তা হল, এই পুজোর ইতিহাস। আনুমানিক ৫০০ বছর বয়স হল এই দুর্গাপুজোর। শহর কলকাতার জন্মই হয়নি তখনও। ইতিহাসের কত রং, গল্প, সাবেক ঐতিহ্য, রীতি এই পুজোকে ঘিরে। যার টানে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বহু মানুষ। নামে বাড়ির পুজো হলেও চরিত্রে এই পুজো তখন সর্বজনীন।
দুর্গামন্দির
এই পুজোর আসল চরিত্র বুঝতে গেলে কিংবদন্তির কাছে, গ্রামের মৌখিক ইতিহাস-গল্পগুলোর কাছে নতজানু না হয়ে উপায় নেই। কথিত আছে, প্রায় পাঁচশো বছর আগে এই পুজো প্রবর্তন করেন মণ্ডল পরিবারের এক সদস্য শ্যামদাস মণ্ডল। দুর্গার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন বলে তাঁকে গ্রামের মানুষ ‘দুগো’ বলে ডাকত। সেই শ্যামদাস মণ্ডল একবার দুর্গা পুজোর সময় শালি নদী থেকে ঘট এনে দুর্গাপুজো শুরু করেন। তারপর স্বপ্নাদেশ পেয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক পুজো। তৈরি হয় মন্দির। কালক্রমে তৈরি হয় বিষ্ণুমন্দিরও। এই শ্যামদাসের নামেই এরপর গ্রামের নাম হল শ্যামদাসপুর। সময়ের সঙ্গে একান্নবর্তী মণ্ডল পরিবার ভেঙে গেল বেশ কয়েকটুকরোয়। সবাই আলাদা আলাদা। কিন্তু, পুজো হয় সবাই মিলেই। একসঙ্গে।
প্রত্যেক বছর ষষ্ঠী থেকে একাদশী, এই ছদিন ঘটা করে চলে দেবীবন্দনা। ইতিহাস-ঐতিহ্য লেপ্টে সেই পুজোর গোটা শরীরে, প্রথায়। প্রতিমাটি একচালা। তৈরি হয় মণ্ডলবাড়ির ঠাকুরদালানেই। প্রথা মেনে পঞ্চমীর দিনই সোনালি রঙের ডাকে প্রতিমাকে সাজানো হয়। সঙ্গে থাকে নানা ধাতুর গয়না। ষষ্ঠীর দিন বোধনের পর পুজো শুরু। বোধন হয় বাড়ির বেল-দালানে। এই বেল-দালানটা নাকি আগে কাছারিবাড়ি ছিল। বোধনের পুজোর পর শুরু হয় পালকি সাজানো। তৈরি করা হয় নবপত্রিকা।
পালকি নিয়েই সপ্তমীর ভোরে বের হয় শোভাযাত্রা। সে এক দেখার মতো জিনিস। পালকির ভিতর নবপত্রিকা সাজিয়ে বাহকেরা দুলকি চালে এগিয়ে চলে শালি নদীর উদ্দেশ্যে, ঘট আনতে। তার পাশে প্রতীকি তলোয়ার নিয়ে চলে শোভাযাত্রা। নদীতে দশমৃত্তিকা দিয়ে পুজো করার পর পালকিসহ ঘট আসে বাড়িতে। শুরু হয় অষ্টকলস পুজো। এরপর শুরু হয় সপ্তমীর পুজো। পুজোর শেষে ছাঁচিকুমড়ো বলি। সপ্তমী দুপুর থেকেই শুরু হয় একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া। এরপর, সপ্তমী থেকে একাদশী পর্যন্ত দিনে-রাতে রোজ প্রায় ৪০০ মানুষ পাত পেড়ে খায় দালানে। এই রেওয়াজ প্রায় পুজোর শুরু থেকেই।
সপ্তমীর সন্ধেবেলায় হয় সন্ধ্যারতি। পরদিন সকালে অষ্টমীর পুজোর পরই শুরু হয়ে যায় সন্ধিপুজোর আয়োজন। এই সন্ধিপুজোয় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন পুজো দিতে। সারাদিন ধরে চলে পুজো নেওয়ার পালা। তারপর বাড়ির সকলে মিলে মণ্ডলপুকুরে স্নান করে শুরু করে নৈবেদ্য সাজানো। সে এক বিপুল আয়োজন। ১৬০ কেজি চালের নৈবেদ্য। সঙ্গে প্রচুর ফল, দই, ঘি। প্রায় ৫ কেজির কদ্মা। সন্ধিপুজোর পর ঠিক সময়ে হয় ছাগল বলি। ছাগলটি হতে হবে কালো। বলির পর শ’য়ে শ’য়ে মানুষ প্রণাম খাটে। পুষ্পাঞ্জলি হয়। তারপর একসঙ্গে পেটপুরে লুচি খাওয়া।
পরদিন সকাল থেকে শুরু হয় নবমীর পুজো। পুজোর শেষে এক আশ্চর্য মজার প্রথা-- নারকেল-কাড়াকাড়ি। বাড়ির ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সবাই মিলে একটা নারকেল নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। যে পাবে সেই জয়ী। আর রাতে, বলি হওয়া ছাগলের মাংস দিয়ে তৈরি মহাভোগ প্রায় ৬০০ মানুষ বসে খায় একসঙ্গে।
আরও পড়ুন
পোস্টারেই এখন আবাহন কলকাতার পুজোর
দশমীর দিন সকাল থেকে মনখারাপ নিয়েই চলে পুজোর তোড়জোড়। দশমীর পুজো শেষ হওয়ার পর হয় অপরাজিতা পুজো। অপরাজিতা গাছের ডাল দিয়ে এই পুজো হয় সারাবছর সব কাজে অপরাজেয় থাকার জন্য। তারপর, ফের পালকিতে করেই নবপত্রিকা নিয়ে যাওয়া হয় ঘট বিসর্জনের জন্য।
দশমীর শেষেও ভুরিভোজ। বিসর্জনের পর মণ্ডলপুকুরের মাছ দিয়েই হয় পেটপুজো। আর, সন্ধেবেলায় বাড়ি আর গ্রামের সদস্যদের নিয়ে হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একাদশীর দিন সন্ধেয় বিসর্জনের আগে প্রতিমা ঘোরানো হয় গোটা গ্রামে। তারপর, মণ্ডলপুকুরে হয় বিসর্জন করা হয়। গ্রামের মানুষ, দূর-দূরান্ত থেকে আসা সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া হয় খিচুড়ি। এইভাবেই শেষ হয় মণ্ডলবাড়ির পুজো।
বিষ্ণুমন্দির
নামেই ‘বাড়ির পুজো’, আসলে বারোয়ারিই। এই পুজো নিয়ে শুধু শ্যামদাসপুরেরই নয়, বাঁকুড়া জেলার বহু মানুষেরই বড়ো উৎসাহ। এই উৎসাহের প্রধান কারণ অবশ্যই এই পুজোর ইতিহাস। অর্ধ সহস্রাব্দ—নেহাত কম বয়স নয়। সুধীর চক্রবর্তী লিখেছিলেন, বাঁকুড়াতে নীলদুর্গা পূজিত হওয়ার কথা। থিমের দায়ে নয়, সেখানে প্রতিমার গাত্রবর্ণ নীল কারণ দুর্গাঠাকুরের রং তো ‘অতসীবর্ণাভ্যাং’। অতসীফুলের মতো। বাঁকুড়ার ঐ অঞ্চলে অতসীফুলের রং নীল, তাই দুর্গাঠাকুরও নীল। এমন আশ্চর্য গল্প যে জেলার পুজো ঘিরে, সেখানেই যে এমন ইতিহাসলীন পুজো থাকবে, সে তো স্বাভাবিকই। বাংলার সাবেকি দুর্গাপুজোদের মধ্যে অন্যতম পুরোনো এই পুজো। নিছক ধর্মীয় উপচারের নয়, এর ঠাঁই আসলে জাতির চর্যায়, ইতিহাসে, ঐতিহ্যে