আমেরিকার মাটিতে ভারতীয় রান্নার জয়জয়কার, নেপথ্যে ‘মুক্তির কিচেন’

নিউ ইয়র্কের (New York) ব্রুকলিন শহরে থাকেন মুক্তি ব্যানার্জি (Mukti Banerjee)। পেশায় একাধারে সমাজকর্মী, শিক্ষক এবং একজন আণবিক জেনেটিস্ট। কিন্তু নেশায় একজন দক্ষ রাঁধুনি। বিদেশে বসেও দেশিয় খাবারের স্বাদ ভুলতে পারেননি তিনি। নিজের উদ্যোগ শুরু করেছেন অভিনব রান্নার ব্লগ। তবে এ ব্লগের বিশেষত্ব হল, বিদেশের মাটিতে ভারতীয় রান্নার প্রচার। muktiskitchen.com, ভারতীয় রান্না শেখার অন্যতম ঠিকানা। আপনারা যারা, অনলাইনে স্বাস্থ্যকর রেসিপির খোঁজ করেন, তাদের জন্য স্বল্পমূল্যে ভারতীয় রান্নার ক্লাস করাচ্ছেন ব্রুকলিন (Brooklyn) শহরের মুক্তি ব্যানার্জি। পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক, সকলের জন্য মুক্তির রান্নাঘর হয়ে উঠেছে একটি স্বাস্থ্যকর ভারতীয় খাবারের ঠিকানা।
‘মুক্তির কিচেন’-এর প্রতিষ্ঠাতা মুক্তি ব্যানার্জি নিজেই। মুক্তিদেবী তাঁর এই ক্লাসে হাতে-কলমে স্বাস্থ্যকর অথচ সুস্বাদু ভারতীয় রেসিপি শেখান। এই উদ্যোগের শুরুটা অবশ্য আজ থেকে প্রায় ১২ বছর আগে। ২০১০ সালে পথ চলা শুরু করে মুক্তির রান্নাঘর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের মাটিতে জনপ্রিয়তা বেড়েছে ভারতীয় রান্নাঘরের। তাঁর রান্নার ক্লাসে ভারতীয় (Indian cooking class) রান্না শিখতে নিয়মিত ভিড় জমে আমেরিকান ছাত্রছাত্রীদের। একটি ছোটো ব্যাচে নিয়মিত রান্না শেখান মুক্তি, এবং এই ক্লাসের জন্য টাটকা সবজি আসে সরাসরি বাজার থেকে, যেখানে তিনি অনেক সময় ‘ডেমো ক্লাস’ করিয়ে থাকেন। শুধু রান্না শেখানোই নয় এই ক্লাসের মধ্যে দিয়ে মুক্তিদেবী আড্ডার ছলে তুলে ধরেন ভারতের নানা সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের গল্পও। ক্লাসের সকলের চাহিদা এবং সুবিধার কথা মাথায় রেখেই রান্নার সময় এবং বিষয় ঠিক করেন তিনি।
মুক্তির রান্নাঘরের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই আমেরিকান। তাঁরা সকলেই মুক্তিদেবীর দক্ষতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ স্বভাবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। “অসাধারণ ক্লাস এবং সুস্বাদু খাবার!”, “মুক্তি একজন দারুণ শেফ এবং শিক্ষক, এবং কীভাবে মশলা নাড়াচাড়া করতে হয় তা জানেন!!!”, “মুক্তির রান্নাঘরে আমি এবং আমার ২৫ বছর বয়সী ছেলে দুর্দান্ত সময় কাটিয়েছি। তিনি এককথায় অসাধারণ মানুষ, তাঁর তৈরি খাবারের স্বাদও দারুণ! রান্নাঘরে ছিল একাধিক সুস্বাদু সব খাবার, আমরা প্রত্যেকে রান্নায় অংশগ্রহণ করতে পেরেছিলাম যা সত্যিই অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল” অথবা “মুক্তির ক্লাস আমার প্রত্যাশার অধিক ছিল।”, উপচে পড়া শুভেচ্ছা বার্তায় ভরপুর মুক্তিদেবীর অনলাইন পেজটি, অজস্র প্রতিক্রিয়ায় ভরিয়ে দিয়েছেন শুভাকাঙ্ক্ষীরা। তাঁর রান্নাঘর কেবল একটি রান্না শেখার জায়গা হয়েই থেমে থাকেনি, উপরন্তু হয়ে উঠেছে একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার আসর, সেকথাও উঠে এসেছে অনেকের প্রতিক্রিয়ায়। শুধু তাই নয়, মুক্তির রান্নাঘরের জাদুকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানা রকম অভিনব ভাবনার কথাও জানিয়েছেন অনেকেই।
মুক্তি ব্যানার্জি হাসতে হাসতে বলেন, “একজন শিক্ষক, সবসময় একজন শিক্ষকই থাকেন”। উত্তর কলকাতার একটি সচ্ছল যৌথ পরিবারে জন্ম মুক্তিদেবীর। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান, প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়, ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে। বড়ো হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ (Presidency College) থেকে বোটানিতে বিএসসি করেন। এরপর বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ (Ballygunge Science College) থেকে এমএসসি এবং পিএইচডি। পিএইচডি শেষ করে তিনি ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজে (Thakurpukur Vivekananda College) লেকচারার পদে যোগ দেন এবং সেখানেই তিন বছর শিক্ষকতা করেন। ইতিমধ্যেই তাঁর বিয়ে হয়ে যায় এবং তাঁর স্বামী পার্থ ব্যানার্জী তখন সুন্দরবনের গোসাবা পাঠানখালির হাজি দেশরাত কলেজে শিক্ষকতা করেন, ফলে মুক্তিদেবীর জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। শুরু হয় কলকাতা থেকে গোসাবা প্রতিদিনের যাতায়াত পর্ব।
একপ্রকার একঘেয়েমির মধ্যেই তিনি গ্র্যাজুয়েট রেকর্ড পরীক্ষা (GRE) এবং বিদেশী ভাষা হিসাবে ইংরেজির পরীক্ষা (TOEFL) -এর জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। পরীক্ষাগুলিতে তিনি যে শুধু পাশ করলেন এমন নয়, দুর্দান্ত নম্বরের নজিরও রাখলেন। তাঁর এই সাফল্যের জন্য ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি স্কলারশিপের প্রস্তাব দেয়। এরপর ১৯৮৫ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পথে পাড়ি দেন এবং ১৯৮৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপে যোগদানের জন্য কর্মক্ষেত্র থেকে চার বছরের ছুটি নেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলবেনিতে বসবাস শুরু করেন এই দম্পতি। ১৯৮৭ সালে সেখানেই জন্ম হয় তাঁদের মেয়ের। ১৯৯৩ সালে মুক্তি নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ অ্যান্ড রিসার্চে যোগদান করেন এবং ২০০০ সাল পর্যন্ত সেখানেই কাজ করেন। ২০০০ সালের পর তাঁরা সেখান থেকে সপরিবারে চলে যান নিউইয়র্ক সিটিতে।
মুক্তি ব্যানার্জি বলেন, “শুরুতে এই সফরটা খুব কঠিন ছিল। আমি তখন ৯ টা – ৫ টার সরকারি কর্মচারী। পাশাপাশি আমায় মেয়ে তখন স্কুলে পড়ে, তার দেখাশোনা, বাড়ির সব কিছু নিজেই দেখভাল করতাম। অথচ সব কিছুই একসঙ্গে আমায় চালিয়ে যেতে হয়েছিল কারণ আমার নামে তখন একটি রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য বীমা চলছিল। আমার স্বামী এবং মেয়ে দুজনের নাম ছিল ওই বীমার আওতায়। আমার তখন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মানে হল যে আমরা সমস্ত স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা হারাবো, এবং আপনি তো জানেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবকিছু কত ব্যয়বহুল”। এরপর তাঁর স্বামী একটি উচ্চ বেতনের চাকরি পেলে, তিনি মুক্তিদেবীকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে উত্সাহিত করেন। কিন্তু বাস্তববাদী মুক্তি বলেন, “যদি আমি তখন স্বামীর জোর শুনে চাকরি ছেড়ে দিতাম, পেনশন পেতাম না, যা শুধুমাত্র চাকরির নির্দিষ্ট সময়ের পরেই দেওয়া হয়।” অগত্যা ২০০৬ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে অপেক্ষা। অবশেষে শুরু হয় তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প ‘মুক্তির কিচেন’-এর (Mukti’s Kitchen) পথচলা।
ছোটোবেলা থেকে যৌথ পরিবারে মা, কাকিমা, ঠাকুমাদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠেন মুক্তি। পরিবারের দৌলতেই অসাধারণ সব রান্নার হাতেখড়ি। পরবর্তীকালে পারিবারিক রান্নার পাশাপাশি নিজের অন্তর্দৃষ্টি এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ মুক্তিকে আজকের জনপ্রিয় ‘শেফ’-এর রূপ দিয়েছে। মুক্তি ব্যানার্জির কথায়, “আমি আমার মা, ঠাকুমা সহ বাড়ির অন্যান্য মহিলাদের কাছ থেকে রান্না শিখেছি। আমি আদপে একজন ভোজনরসিক এবং আমার কাকিমা বা মা বিশেষ কিছু রান্না করলেই, রান্নাঘরে ডাক পড়তো আমার। আমার কাজ ছিল চেখে দেখে খাবারের স্বাদ নিয়ে ‘বিশেষজ্ঞ’দের মতো রায় দেওয়া। এভাবেই আমার হাতের তালু প্রশিক্ষিত হয়ে উঠেছিল। আমি প্রতিটি মশলার নিজস্ব স্বাদ চিনতে শিখেছি এবং কীভাবে ও কোথায় সেগুলি ব্যবহার করা হয়, কীভাবে মশলার নাড়াচাড়া করলে স্বাদের মাত্রা বাড়ানো যায় সবকিছুই শিখেছি। এছাড়াও সাধারণ কোনো রান্নাতে অন্যরকম স্বাদ দিতে নানারকম কৌশলও শিখেছিলাম।”
প্রাথমিক পর্যায়ে মুক্তির রান্নাঘর তৈরি নিয়ে কোনও ধারণা ছিল না তাঁর। meetup.com নামে একটি ওয়েবসাইট, যেটি নতুন উদ্যোক্তাদের নানাভাবে সাহায্য করে, সেখানেই তাঁর এই ভাবনা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেন। শুরুতে একটি রান্নার ব্লগ দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু করেন। প্রথম ব্লগটিই ভারতীয় রান্না সম্পর্কে উত্সাহী আমেরিকানদের খুবই আকর্ষণ করেছিল। শুরুতে অল্প সংখ্যায় শিক্ষার্থীরা আসলেও ধীরে ধীরে এই সংখ্যাটা বাড়তে থাকে। তাঁর ব্লগ সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন, “ব্লগে আপনি আমার ক্লাসের সর্বশেষ খবর এবং ব্রুকলিনে একজন ভারতীয় শেফ হিসাবে আমার জীবন সম্পর্কে আকর্ষণীয় সব তথ্য পাবেন৷ আমি আমার ক্লাসে শেখানো অনেক খাবারের রেসিপিও এখানে ‘পোস্ট’ করি। আপনারাও চাইলে বাড়িতে এগুলি সহজেই চেষ্টা করতে পারেন। ভালো লাগলে আপনার মন্তব্য এবং অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে শেয়ার করুন।”
“করোনা পরিস্থিতির আগে, আমি অংশগ্রহণকারীদের আমার বাড়িতেই আমন্ত্রণ জানাতাম এবং তাদের প্রত্যেককেই নিজের পরিবারের একজন মনে করতাম। ঠিক হয়, তারা আমার রান্নাঘরে এসে একাধিক খাঁটি ভারতীয় রেসিপি শিখবে। আমি তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে থাকব কিন্তু রান্নাটা তারা নিজের হাতেই করবে। তখন ‘মুক্তির কিচেন’-এ সবটাই হাতে-কলমে শেখার ছিল...” করোনাকালীন সময়ে, অফলাইন ক্লাস বন্ধ হয়ে গেলেও থেমে থাকেনি মুক্তির রান্নাঘর। এই সময় তিনি তিনটি ক্যামেরার সাহায্যে ‘জুম’ অ্যাপের মাধ্যমে রান্নার ক্লাস চালিয়ে যান। অনলাইনেও রান্না শুরুর প্রস্তুতি থেকে রান্নার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সুন্দরভাবে তুলে ধরেন।
‘এডিবল ব্রুকলিন’, ‘ইউ.এস ম্যাগাজিন’, ‘মমস রাইজিং টুগেদার ব্লগ’ এবং ইউটিউবে ‘রেড অন ব্ল্যাক প্রোডাকশন’-এর মতো প্ল্যাটফর্মে মুক্তির রান্নাঘর দেখানো হয়েছে। তিনি নিজের ব্লগে লিখেছেন, “অন্তর থেকে আমি একজন সামাজিক কর্মী এবং সকলের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রায় বিশ্বাস করি। আমার মা এবং ঠাকুমার মতো ভারতীয় মহিলারা হাজার হাজার বছর ধরে রান্না শিল্পকে উন্নত ও পরিমার্জিত করেছেন, এবং অনুভব করি যে আমি ধারক ও বাহক হিসেবে তাঁদের সম্পদের উত্তরাধিকারীও। আমি যখন ভারতীয় এবং বাংলার খাবার রান্না করি, এবং আমার ছাত্রদের শেখাই, তখন মনে হয় আমি নিজের দেশের রন্ধন শিল্প এবং আধ্যাত্মিকতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। তাঁদের সেসব মূল্যবান নৈপুণ্য আয়ত্ত করতে এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি।”
উত্তর কলকাতার এই মেয়েটি যেন হয়ে উঠেছে ভারতীয় রান্নার একজন দূত, বিদেশিদের মধ্যে ভারতীয় খাবারকে নিত্যদিন ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। ঘরে তৈরি স্বাস্থ্যকর ভারতীয় রান্নাকে জনপ্রিয় করে তুলছেন আমেরিকানদের মধ্যে। জানা যায়, তিনি বর্তমানে রান্না করার পাশাপাশি একটি ভারতীয় রান্নার বই লেখারও পরিকল্পনা করছেন। মুক্তিদেবী জানান, “আমি এখনও বইটি নিয়ে কাজ করছি এবং আমি বইটি সম্পূর্ণ করলেই আমার প্রাথমিক লক্ষ্য হবে এটি ছাপাতে ইচ্ছুক, এমন একজন প্রকাশকের সন্ধান করা।”
তিনি কি ভারতে ফেরার পরিকল্পনা করছেন? মুক্তি হেসে বলেন, “ভারত, বিশেষ করে কলকাতা আমার হৃদয়ে আছে। ওখানেই আমার শিকড়। আমি অবশ্যই বারবার ফিরে যেতে চাই নিজের দেশে। কিন্তু এখন আমার মেয়ে বিবাহিত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছে। জন্মসূত্রে না হলেও কর্মসূত্রে এদেশের সঙ্গেও আমি একটি মানসিক সংযুক্তি অনুভব করি, কোনো এক অদৃশ্য পিছুটান বারবার এদেশে আটকে রাখতে চায় আমায়। আমি রান্না করতে ভালোবাসি এবং আমার নাতি আমার রান্না খেতে খুব পছন্দ করে। এদেশে প্রতিনিয়ত রান্না চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা আমার নাতিই।”
মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।