বর্ষা এলেই গ্রাম-বাংলার জমিতে পালিত হয় চাষিদের অনুষ্ঠান ‘মইছড়া’

কৃষকের ধর্ম, বিশ্বাস এবং আঁকড়ে থাকার একমাত্র জায়গা ফসলের মধ্যে। চাষ করেই তাঁদের আনন্দ। তাই ফসল ফলানোর মধ্যে আরও উদ্দীপনা জোগাতে গ্রাম-বাংলার অন্দরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত কত উৎসব। তার খবর আমরা কজনই বা রাখি! বর্ষার মরশুমে প্রকৃতির প্রাণ জেগে ওঠে। প্রকৃতির সবুজ নির্মল হাসির রেখা পৌঁছে যায় চাষিভাইদের মধ্যেও। বর্ষা এলেই বাংলার চাষিরা বিভিন্ন অঞ্চলে মেতে ওঠেন মইছাড়া প্রতিযোগিতায়। আজ তারই খোঁজ দিচ্ছেন আলোকচিত্রী প্রদ্যুৎ চৌধুরী।
“লেজের ডগায় হাতের মোচড়টাই আসল, বুঝলেন? ওই মোচড়েই বলদ ছোটে, তবে ছোটো কাঠের টুকরোর ওপর জলভরা কাদা জমিতে পাগলের মতো ছুটতে থাকা বলদের ভেজা লেজ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকাটাই কঠিন। একবার লেজ হাত থেকে ছুটে গেলে আপনিও পড়বেন আর বলদও ছোটা বন্ধ করে দেবে। এই খেলায় জিততে হলে ওই লেজটি ছাড়া চলবে না।” — বলে উঠলেন একজন চাষি।
গ্রাম-বাংলার এরকম অজস্র স্থানীয় খেলা হারিয়ে যেতে বসেছে চর্চার অভাবে। এই মইছাড়া উৎসবের জন্ম আষাঢ় মাসে ধান রোয়ার আগে, চাষের ক্ষেতে বলদের কাঁধে ফেলা জোয়ালের সঙ্গে মই জুড়ে, সেই মইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে, বলদকে ছুটিয়ে জলভরা চাষের জমিকে সুজলা-সুফলা করে তোলার রেওয়াজ থেকেই।
এখনও দক্ষিণবঙ্গের বেশ কিছু জায়গায় এই খেলার জনপ্রিয়তা রয়েছে। বছরজুড়ে গবাদি পশুরা প্রস্তুত হয় এই দিনগুলোর জন্য। বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় দৌড়ের প্রস্তুতি। প্রাচীনকালে বিজয়ীদের গরু পুরস্কৃত করার রীতি ছিল। পরবর্তীতে তা বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসে গিয়ে ঠেকেছে। এই যেমন সাইকেল কিংবা আলমারি।
বর্ষার কটা দিন চাষিরা মেতে থাকেন নিজের আনন্দে। লাঙল আর গরু হয়ে ওঠে ওঁদের বন্ধু। আসলে কৃষকদের তো কোনও ধর্ম হয় না। দিগন্তব্যাপী সুবিস্তৃত সবুজ মাঠ, আর রাশি রাশি শস্য— এই তাঁদের ধর্ম, বিশ্বাস আর ভালোবাসা।
চিত্রগ্রাহকঃ প্রদ্যুৎ চৌধুরী