মাটির তলায় পরপর ঘর, গঙ্গার বুক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে চন্দননগরের পাতালবাড়ি
পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক শহর, আলোর শহর ফরাসডাঙা। আজকের চন্দননগর। এই চন্দননগর স্টেশন থেকে সোজা রানিঘাট। তারপর রানিঘাট থেকে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে ডানদিকে কিছুটা এগোলেই চোখে পড়বে শ্বেত পাথরের একটি ফলক, যেখানে লেখা রয়েছে ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্মৃতি বিজড়িত, সান্নিধ্যধন্য পাতালবাড়ি’। হ্যাঁ, এই ফলকের গা ঘেঁষেই রয়েছে সবুজ ফটকের বিখ্যাত সেই বাড়িটি, বিগত কয়েক দশক ধরে যা আগলে রেখেছেন অসীম খান। পাতাল বাড়িতে আমাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানালেন যিনি।
ছাতিম, টগর কিংবা পুরোনো বট, অশ্বত্থ এসব নিয়েই গঙ্গার গা ঘেঁষে অবস্থান হলুদ বাড়িটির। সামনে তাকালেই চোখ জুড়ানো শান্ত, স্রোতস্বিনী গঙ্গার অপরূপ শোভা সঙ্গে পুরোনো স্থাপত্যের সোঁদা গন্ধ যেন এক চিলতে স্মৃতির অ্যালবাম। বাগানের পিছনের দিকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলেই একটা অন্য দুনিয়া। তালা খুলতেই চোখের সামনে ধরা দিল সেই আকাঙ্ক্ষিত পাতালবাড়ি। বাড়ির অদ্ভুত স্থাপত্য শৈলীর জন্যই এমন নাম। একটা পুরো তলা মাটির নিচে, গঙ্গার বুক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাটির তলায় পরপর ঘর, রান্নাঘর। এই রান্নাঘরটির বিশেষত্ব হল, এখানে আছে পুরোনো দিনের উনুন, অসীমবাবু বলছিলেন একে ‘সরকার-চুলা’ বলে। এই উনুনে এমন ব্যবস্থাপনা ছিল, যে আলাদা করে এখনকার মতো চিমনি বসানোর প্রয়োজন পড়তো না। আবার, খুব গরম পড়লে ছোটোবেলায় তাঁরা মাটির নিচের এই ঘরগুলিতে সময় কাটাতেন। ঠিক এরকম ভাবেই প্রত্যেকটি ঘরের সঙ্গে জুড়ে আছে নানান গল্পগাথা, কেমন যেন রহস্য মাখা। কেউ কেউ বলেন এই চন্দননগর পাতালবাড়ি নাকি একসময় আত্মগোপনের নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছিল বিপ্লবীদের।
একটা সময় ফ্রেঞ্চ নেভি রেস্ট হাউস ছিল এই বাড়িটি, পরে যোগেন্দ্রনাথ খান মালিকানা পান। ঠাকুর পরিবার তাঁর কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নেন। সেই সূত্রেই ঠাকুরবাড়ির লোকজনদের এ বাড়িতে যাওয়া-আসা। একাধিকবার এসেছিলেন রবি ঠাকুরও।
একটা সময় ফ্রেঞ্চ নেভি রেস্ট হাউস ছিল এই বাড়িটি, পরে যোগেন্দ্রনাথ খান মালিকানা পান। ঠাকুর পরিবার তাঁর কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নেন। সেই সূত্রেই ঠাকুরবাড়ির লোকজনদের এ বাড়িতে যাওয়া-আসা। একাধিকবার এসেছিলেন রবি ঠাকুরও। শুধু শিল্পী-লেখক বলে নয় প্রকৃতির ছায়ায় এমন একটি নির্জন বাড়ি যেকোনও মানুষের কাছেই তো স্বর্গ্যদ্যান! প্রজন্মের হাত ঘুরে এখন বাড়িটি অসীম খানের জিম্মায়। ষাটোর্ধ্ব এই মানুষটি একাই সামলান বাড়িটির দায়িত্ব। গঙ্গার ভাঙনে একটা দিক ধসে গেছে পুরো। তবু, হঠাৎ কোনও অতিথি এলে সাগ্রহে, সহাস্যে ঘুরিয়ে দেখান সময়ের গ্রাসে কোনও রকমে টিকে থাকা স্মৃতি-স্থাপত্য - পাতালবাড়ি।