বৈচিত্রের মধ্যেই মহামিলনের উদযাপন শুরু ‘মিলন উৎসবে’

“বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান...”
শুধু ভারতের না, বাংলার মূল সুরটাও এমনই। এখানে মুসলমান কবি অনায়াসে বাঁধেন বৈষ্ণব পদ। অন্নদামঙ্গলের কবি ভারতচন্দ্র লেখেন পির-বন্দনা। বাউল-ফকির-সহজিয়া বৈষ্ণবদের গানে মিলে মিশে যায় আল্লা-রসুল-কৃষ্ণ-সাঁই। বাংলার শিকড়ে গাঁথা সৌভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক প্রেমের এই ঐতিহ্যটিকে উদযাপন করতেই পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় ও পরিকল্পনায় আয়োজিত হতে চলেছে ‘মিলন উৎসব ২০১৯’। বাংলার মাটিতে দীর্ঘদিন ধরেই শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-জৈন-পার্সিরা। শুধু সহাবস্থানই নয়, এই সম্প্রদায়গুলির ভেতরে পারস্পরিক আদানপ্রদানও জারি আছে সেই কবে থেকে। তারই ফসল হিসেবে গড়ে উঠেছে বাংলার অত্যন্ত সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, খাবার, পোশাক, শিল্পকলার ঐতিহ্য। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির সেই বৈচিত্রই ধরা পড়বে ‘মিলন উৎসবে’। যে বৈচিত্রের মূলে আছে আবহমান ঐক্যের সুর।
‘মিলন উৎসব ২০১৯’-এর আসর বসছে পার্ক সার্কাস ময়দানে। আয়োজনের দায়িত্বে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম (ডব্লুবিএমডিএফসি)। উৎসবের উদ্বোধন আজই। চলবে ৪ ফেব্রুয়ারি অবধি। এটি কিন্তু কেবলমাত্র হস্তশিল্পের মেলা বা সাংস্কৃতিক মিলনোৎসব নয়। চাকরির খোঁজে থাকা যুবক-যুবতীদের দিশা দেখাতে এই উৎসব প্রাঙ্গণেই বসছে ‘মেগা জব মেলা’র আসর। পাশাপাশি থাকছে বিনামূল্যে কেরিয়ার কাউন্সেলিং-এর সুযোগও।
বাংলার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির মেলবন্ধনের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রকমারি খাবারের পসরাও থাকছে ‘মিলন উৎসব ২০১৯’-এর প্রাঙ্গণে। বাখরখানি, নিহারি, পায়া,নানখাতাই, কাঞ্জি, বিরিয়ানি, কাবাবের মতো শাহি ইসলামি খাবারের স্বাদে-গন্ধে জিভে-জল আসবেই। চাইলে চেখে দেখতে পারেন কেক, চিকেন ও মাটন রোস্ট, রোজ কুকি, ভিন্দালু, ব্রেড পুডিং কিংবা ক্যারামেল কাস্টার্ডও। জৈন সংস্কৃতির ধোকলা, খান্ডবি, থেপলার আকর্ষণ এড়িয়ে যাওয়াও মুস্কিল। পাঞ্জাব থেকে বাংলায় পা রাখা শিখ সম্প্রদায়ের প্রিয় খাদ্য মকাই কা রোটি, সরসোঁ কা সাগ, আলুর পরোটা, মুলি পরোটা, ফুলকপির পরোটা তো থাকছেই। ইচ্ছে হলে গলা ভেজাতে পারেন লস্যিতে। চাখতে পারেন হালুয়া। পার্সিরা অনেক নতুন খাবারের স্বাদই চিনিয়েছে কলকাতাবাসীকে। এই উৎসব প্রাঙ্গণে থাকছে একঝাঁক লোভনীয় পার্সি পদও। ধঁসাক, ফিস পাটিয়া, পাপেটা-পার-এদু, দার-নি-পারি, মালিদো, লগন-নু-কাস্টার্ড—তালিকা চাইলে বাড়ানোই যায়। এছাড়া, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাসের স্বাদ-গন্ধ মাখানো বিশেষ মিষ্টি এবং তিব্বতি মোমো তো মিলবেই।
এবারের মিলন উৎসবে থাকছে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যপরীক্ষার সুযোগও। অতএব, কেরিয়ার নিয়ে চিন্তিত হোন কিংবা খাদ্যরসিক— ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যে কোনো সন্ধ্যায় আপনার ঠিকানা হতেই পারে পার্ক সার্কাস ময়দান। হস্তশিল্প, খাবার, নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ঐক্যের সুরটিতে আরো একবার বুঁদ হবেন আপনি। অসংখ্য সম্প্রদায় যে ভেদ নয়, বরং বহুরঙের বৈচিত্রও বুনে দিতে পারে—তারই সাক্ষী হতে চলেছে ‘মিলন উৎসব ২০১৯’।