রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে চলার প্রেরণা বাবার থেকেও পেয়েছিলেন মধুসূদন

বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক মহাকাব্য লিখেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। পরবর্তীকালে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীনচন্দ্র সেন, হামিদ আলির মতো কবিরা অলংকার শাস্ত্রের নিয়ম মেনে মহাকাব্য লিখেছেন বটে, কিন্তু ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর মতো বিপুল জনপ্রিয়তা এবং রসিকজনের প্রশংসা এগুলোর কোনোটাই পায়নি। বাংলা ভাষায় প্রথম মৌলিক আধুনিক নাটকের স্রষ্টাও মাইকেল। সফলভাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রয়োগ তিনিই করেছিলেন এই ভাষায়। তিনি সৃজনের যে ধারাতেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই নতুন কিছু করে দেখিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যকে ‘আধুনিক’ করে তোলায় মধুসূদনের অবদান ভোলার নয়। তাঁর কর্ষিত জমিতেই সোনার ফসল ফলিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং তার পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধের বিদ্রোহের মূর্ত প্রতীক ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। হিন্দু কলেজের প্রগতিশীল আবহাওয়া তাঁর এই শিকল ভাঙার মানসিকতা জাগিয়ে তোলায় যথেষ্ট ভূমিকা নিয়েছিল। ১৮৩৩ সালে তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হন, মাত্র কয়েক বছর আগে, ১৮৩১ সালে প্রয়াত হয়েছেন সেই কলেজেরই প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। নব্যবঙ্গ আন্দোলন তখনও বেশ সক্রিয়। তার প্রভাব মধুসূদনের ওপর পড়েছিল। কলেজে মধুসূদনের বড়ো পাওনা ছিল ডেভিড লেস্টার রিচার্ডসনের ইংরেজি রোমান্টিক কবিতার ক্লাস। মধুসূদনের খামখেয়ালি যাপনের পেছনে অনেকাংশেই দায়ী ছিল পাশ্চাত্য রোমান্টিক ভাবধারার প্রতি তাঁর অমোঘ আকর্ষণ।
তবে সমাজের রক্ষণশীল প্রথাগুলির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং খোলামেলা চিন্তা এবং যাপনে মধুসূদনের আরেকজন সহায় ছিলেন তাঁর বাবা – রাজনারায়ণ দত্ত। বন্ধুর মতো ছেলের সঙ্গে মিশতেন তিনি। একবার খিদিরপুরে মধুসূদনের বাড়িতে গেলেন তাঁর দুই বন্ধু ভোলানাথ চন্দ্র ও গৌরদাস বসাক। সেখানে তাঁরা দেখেন, রাজনারায়ণ আলবোলায় নল মুখে দিয়ে ধূমপান করছেন। সেই নল তিনি ছেলে মধুসূদনের হাতে তুলে দিলেন। মধুও আনন্দের সঙ্গে তামাক টানতে লাগলেন। এই দৃশ্য দেখে তো দু’জনের চোখ ছানাবড়া। মধু গৌরদাসকে বোঝালেন, তাঁর বাবা সমাজের পুরোনো বাতিল নিয়মকানুনের ধার ধারেন না। কখনও কখনও ছেলের সঙ্গে মদ্যপানও করেছেন রাজনারায়ণ। কিন্তু সেই বাবাই পরে বেঁকে বসেন ছেলে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা নেওয়ায়।
হিন্দু কলেজে পড়ার সময় থেকেই মধুসূদন ইংল্যান্ডে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। ভাবতেন, ইংরেজি ভাষায় স্বনামধন্য কবি হতে গেলে ওই দেশে যাওয়া অবশ্যই দরকার। ইংরেজিতে কাব্যচর্চা শুরু করেছিলেন তখন থেকেই। পরে তাঁর ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হল, তিনি ইংল্যান্ডেও গিয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজি কবিতা লিখে প্রত্যাশিত খ্যাতি তিনি পেলেন না। বাংলা সাহিত্যে বিপ্লব ঘটিয়ে ইতিহাসের বুকে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিলেন। ব্রিটেনে যাওয়ার আগেই তিনি বাংলায় সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। ফ্রান্সেও গিয়েছিলেন মধুসূদন। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, ইটালিয়ান, গ্রিক, ল্যাটিন-সহ বহু ভাষায় তিনি দক্ষ ছিলেন। জ্ঞানের এই বৈচিত্র্য এবং গভীরতার জন্যই বাংলা সাহিত্যকে গতানুগতিকতার বদ্ধ জলা থেকে মুক্ত করে বিশ্বসাহিত্যের সমুদ্রে উন্মুক্ত করতে পেরেছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত।
তথ্যঋণ – ক্ষেত্র গুপ্ত, শিশির রায়, শুভাশিস চক্রবর্তী।