মেরিকামায়া সাতকাহন : জীবনের অনেকটা পথ চলে এসেছি – দুজনে, তিনজনে

জন হেন্স যাকে বলে একেবারে প্রকৃত ভদ্রলোক।
সেই যে আমাকে ডেকে নিয়ে এসে নিজের ল্যাবে পোস্টডক ফেলোশিপে জুড়ে দিলেন, এবং কী কী কাজ করতে হবে সব বুঝিয়ে দিলেন, তারপর আর তাঁর দেখা নেই। তাঁর বাড়ি ছেড়ে দিয়ে নিজেদের অ্যাপার্টমেন্টে চলে যাওয়ার পর থেকে আমি কখন কাজে আসি, কখন যাই, কী কাজ করি সারাদিন, তার কোনো খোঁজ তিনি রাখেন না।
মাঝে মাঝে লাঞ্চের সময়ে দেখা হয়। দু একটা কথাবার্তা হয়। আমি আমার ভেতরের ঘরে কাজ করি। সেখানে কোনো জানালা নেই। আমার একটা কম্পিউটার আছে। বায়োলজিক্যাল সার্ভের মেন্ দরজার চাবি আর তিনতলার ডিপার্টমেন্টের চাবি আমাকে দেওয়া আছে, সেই যেমন আইএসইউ আর এসআইইউ’তেও দেওয়া ছিল। আমি কাজ করি আমার সময়মতো। আমি চলে যাই আমার সময়মতো। এখানে কোনো অ্যাটেন্ডেন্সের খাতা নেই যে নাম সই করতে হবে।
নিউ ইয়র্ক স্টেট মিউজিয়াম, অলব্যানি। এই বাড়ির তিনতলায় ছিল বায়োলজিক্যাল সার্ভে
এই হলো আমেরিকার সঙ্গে আমাদের দেশের ব্যবস্থার একটা বিরাট পার্থক্য। এখানে কেউ পিছনে টিকটিক করে না। তোমাকে অনেক খুঁজেপেতে নেওয়া হয়েছে – তোমার শিক্ষাগত যোগ্যতা আর মানুষ হিসেবে তুমি কেমন, সে সম্পর্কে তোমার সঙ্গে কথাবার্তা বলে আর অনেকটাই তোমার দেওয়া তিনজন রেফারেন্সের সঙ্গে কথাবার্তা বলে। ওরা জানে তুমি কেমন ওয়ার্কার। ওরা জানে তুমি কেমন মানুষ, এবং তোমার নীতিবোধ কেমন। এর পরে তোমাকে প্রতিদিন মনিটর করার কোনো দরকার ওদের নেই। মাঝে মাঝে মিটিং হয়। আমি কী কী কাজ এখনো পর্যন্ত করেছি, তার একটা রিপোর্ট দিয়ে দিই।
ব্যাস, ফুরিয়ে গেলো।
জন অবশ্য মাঝে মাঝেই আমাকে জিজ্ঞেস করে ওর সঙ্গে লাঞ্চ খেতে যাবো কিনা। দু একবার গিয়েছিও ওর সঙ্গে। কিন্তু আর যেতে লজ্জা করে। কারণ, গেলে খাওয়ার টাকাটা ও দিয়ে দেবেই। কিছুতেই আমাকে দিতে দেবে না। আর আমারও খুব সংকোচ হয় প্রতিবার এরকম হলে। মৃদু প্রতিবাদ করেছি দু একবার, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আর ও লাঞ্চ খেতে যায় স্টেট ক্যাপিটল প্রাসাদের ভেতরে দামী কোনো রেস্টুরেন্টে। সেখানে ওকে নিয়ে গিয়ে খাওয়ানোর ক্ষমতা আমার মতো অস্থায়ী পোস্টডক কর্মীর নেই।
তার ওপর জন নিজেই মাঝে মাঝে বলে, ও যখন আমার এই গ্র্যান্টটার জন্যে ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের কাছে অ্যাপ্লাই করেছিল, তখন অভিজ্ঞতার অভাবে এই পোস্টডকটির জন্যে যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ করেনি বাজেটে। ফলে, যেখানে একটা পিএইচডি আমেরিকার কোনো ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যে কোনো একটা কলেজে লেকচারারের চাকরি পেলে পঞ্চাশ কি ষাট হাজার ডলার হেসেখেলে রোজগার করতো সে সময়ে, আমি সেখানে পাই মাত্র একুশ হাজার ডলার। তার থেকে ফ্যামিলি। তার থেকে ল্যাথাম ভিলেজ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের ছশো টাকা মাসে মাসে ভাড়া। এ তো আর সেই কার্বনডেল নয় যে ঝাঁ চকচকে এভারগ্রীন টেরেসেও আড়াইশো টাকা ভাড়া দিয়ে থাকবে।
ল্যাথাম ভিলেজ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। তখন এই বারান্দাগুলো ছিলো না
টাকা মানে অবশ্য আমার লেখায় সবসময়েই ডলার। আগেই বলে রাখছি কিন্তু। কারণ এই টাকা মানে যে ডলার, সেটা এর পরেও অনেকবার মনে করিয়ে দিতে হবে, কিন্তু আমি দেবো না।
তো, জন এদিকে এমন ভদ্রলোক, এবং ওর বাড়িতে এক মাস থেকেই আমি বুঝে গেছি যে একেবারে লিবারাল উদারনৈতিক মানুষ। রাজনীতির বিশ্বাসের দিক থেকে অবশ্যই ডেমোক্র্যাট, এবং বাড়িতে পাবলিক টেলিভশন নেটওয়ার্ক ছাড়া আর কিছু চলে না। সে হলো ইন্টারনেট আসার ঠিক আগের কয়েকটা বছর। তখনও আমেরিকার মানুষ খবরের জন্যে খবরের কাগজ আর রেডিও, আর বিনোদনের জন্যে প্রধানতঃ টিভির ওপরেই নির্ভরশীল।
ততদিনে আমি জেনে গেছি আমেরিকার প্রধান টিভি চ্যানেলগুলোর কথা। এবিসি, এনবিসি, সিএনএন, সিবিএস। এগুলো সব কর্পোরেট চ্যানেল, যারা হাজার বিজ্ঞাপনের ওপরে নির্ভরশীল। আর পিবিএস হলো সরকারি অনুদানে চালিত নেটওয়ার্ক, যার কিছু কিছু চ্যারিটি আসে নানা ফাউন্ডেশন থেকে। পিবিএস তখনও মোটামুটি নিরপেক্ষই আছে।
এই পিবিএসে জন আমাকে দেখালো আন্তর্জাতিক এক টীমের তৈরি করা মহাভারত। যার অনেকগুলো অধ্যায় বা এপিসোড। সেখানে কর্ণ হয়তো ব্রিটিশ, ভীষ্ম তালগাছের মতো লম্বা আর কালো আফ্রিকার সেনেগাল না কেনিয়ার, দ্রৌপদী আমাদের দেশের মল্লিকা সারাভাই, আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে দুর্দান্ত একটা উপনিষদের শ্লোক পাঠ শান্তিনিকেতনের ছাত্রী শর্মিলা রায় পোমোর। শুনলাম, তিনি এখন ফ্রান্সের বাসিন্দা। এই মহাভারতের উপস্থাপনা আমাকে অদ্ভুতভাবে ভেতর থেকে নাড়া দিয়ে গেলো।
এই জনই কিন্তু আমেরিকার যুদ্ধনীতি সম্পর্কে অদ্ভুত এক অচেনা মানুষ। আইরা সলকিন জনের বিশেষ বন্ধু, এবং তিনিও ছত্রাক বিশারদ। তিনি অলব্যানির নিউ ইয়র্ক স্টেট হেলথ ডিপার্টমেন্টে বিজ্ঞানীর কাজ করেন। জনের সঙ্গে একদিন লাঞ্চে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলো, এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই বুঝে গেলাম, আর যাই করো, এদেশে যদি স্থায়ী বাসিন্দা হতে চাও, এদেশের যুদ্ধব্যবসার সমালোচনা কোরো না, এবং বিশেষ করে আইরা’র মতো একজন ইহুদীর সামনে ইজরায়েলের সমালোচনা কোরো না। সমস্ত সুযোগ, সহানুভূতি সবকিছুই হারাবে।
ডঃ আইরা সলকিন
আইরা সলকিন প্রভাবশালী মানুষ। তিনি চাইলে, এবং আমি একটু তৈলমর্দন করলে অনায়াসেই সেই স্টেট গভর্নমেন্টে স্বাস্থ্য বিভাগে আমার কাজ তিনি করে দিতে পারতেন। আমার যথেষ্ট মজবুত রেজুমে ছিল। কিন্তু তৈলমর্দন করতে আমি শিখিনি।
এর বেশ কিছুদিন পরে স্টেট গভর্নমেন্টে স্থায়ী সায়েন্টিস্টের চাকরি পাবার সুযোগ আমার হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলে সে সুযোগ আমার নাকের এক সেন্টিমিটার পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো। সে গল্প বলবো নিশ্চয়ই।
জনকে কথায় কথায় আমি বলেছিলাম হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর মার্কিন পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের কথা, এবং আমার মনের মধ্যে তার চিরকালীন ছাপ ফেলে যাবার কথা। বলেছিলাম, আমেরিকা ছাড়া কিন্তু কোনো দেশ নিরীহ মানুষের ওপর অ্যাটম বোমা ফেলেনি। কিন্তু পিবিএস টিভি দেখা লিবারাল জন একেবারেই খুশি হলেন না। তিনি নানাভাবে আমাকে বোঝাতে শুরু করলেন কেন তার দরকার ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং কেন আমি এতকাল পরে এই ঘটনার কথা মনে করছি। সদানন্দ জন হেন্সকে সেই একবারই খুব আপসেট হতে দেখেছিলাম। আর কখনো তাঁর সঙ্গে রাজনীতির আলোচনা আমি করিনি।
বরং ডিপার্টমেন্টে আমার কলিগ এবং বান্ধবী হয়ে ওঠা লোরিকে বলেছিলাম এই অভিজ্ঞতার কথা। লোরি বেশি কিছু না বলে তার সংক্ষিপ্ত অথচ বাঙময় উত্তর দিয়েছিলো, “ইউ ডিড?” অর্থাৎ, তুমি জনের সঙ্গে এসব কথা বলতে গেছো? তারপর মৃদু হেসে বলেছিলো, “হোলি কাউ!” এর সঙ্গে যে আমাদের দেশের পবিত্র গোমাতার কোনো সম্পর্ক নেই, তা আমি ততদিনে বুঝে গেছি। হোলি কাউ না বলে লোরি বলতে পারতো, ওহ বয়! অথবা, জীজ! অথবা, গশ!
অলব্যানি ডাউনটাউন, অর্থাৎ অফিসপাড়া
একদিন দুপুরবেলা ডিপার্টমেন্টের সেক্রেটারি ভদ্রমহিলা, যিনি আমাকে কোন স্কুল ডিস্ট্রিক্ট আমাদের শিশুকন্যার জন্যে ভালো হবে, সে ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছিলেন, তিনি বললেন, পার্থ তোমার নামে ইন্ডিয়া থেকে একটা বড়ো এনভেলপ এসেছে। তুমি এসে নিয়ে যেও অফিসে।
গেলাম। দেশের অনেকগুলো স্ট্যাম্প দেওয়া বড় সাইজের একটা বাদামি খাম। খুললাম। আমাকে আবার দেশ থেকে কে কী পাঠালো রে বাবা!
সেই কার্বনডেলে আমাদের সান্ডবার্গের ল্যাবে সেই যে কালিকট ইউনিভার্সিটি থেকে প্রফেসর লীলাবতী এসেছিলেন কয়েক দিনের জন্যে, এবং আমার সঙ্গে আর মুক্তির সঙ্গে আমাদের বাড়ি এসে গল্প করেছিলেন, তাঁর বিশেষ রেকোমেন্ডেশনে থিরুভানানথাপুরাম এলাকার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ থেকে আমাকে ও মুক্তিকে দুটো সিনিয়র সায়েন্টিস্ট পদে মহার্ঘ চাকরি দিয়ে নিয়োগ করা হয়েছে।
এস আই ইউ'তে শেষের দিকে আমাদের ল্যাবে এলেন কেরালার কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা লীলাবতী
আমাকে বোধহয় গ্রেড এ, এবং মুক্তিকে গ্রেড বি, বা ঐরকম কিছু। কার কত স্যালারি, কত ইনক্রিমেন্ট, চাকরির শর্ত ইত্যাদি সবকিছুই সেখানে বলে দেওয়া যাচ্ছে বিশদভাবে। কতগুলো ফর্ম আছে, সেগুলো যত শীঘ্র সম্ভব পূরণ করে সই করে ওভারসীজ ডাকে ফেরৎ পাঠিয়ে দেওয়ার অনুরোধ এসেছে।
কত তারিখের মধ্যে আমরা চাকরিতে জয়েন করতে পারবো, তার একটা আনুমানিক দিনক্ষণ আমাদের জানিয়ে দেওয়ার জন্যেও বলা হয়েছে।
চিঠি পড়ে স্তব্ধ হয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। সেক্রেটারি মিশেল বললেন, “কোনো খারাপ খবর?”
লোরি এসে আমাকে দেখে বললো, “কী হয়েছে পার্থ? তোমার কি শরীর খারাপ?”
জন এসে আমাকে দেখে বললো, “এভরিথিং অলরাইট মাই ম্যান?”
তারপর সন্ধ্যেবেলা বাড়ি এসে মুক্তিকে সবকিছু দেখালাম।
তারপর আমরা দুজন রাতে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলাম মেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার পরে।
ঊনিশশো তিরানব্বই। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে আমার বাবা শ্রী জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের কাছে এসে পৌঁছোলেন। আমরা তিনজন অলব্যানি এয়ারপোর্টে গিয়ে তাঁকে নিয়ে এলাম। তিনি কলকাতা থেকে লণ্ডন, লণ্ডন থেকে নিউ ইয়র্ক, এবং তারপর নিউ ইয়র্ক থেকে অলব্যানি প্লেনে করে নির্বিঘ্নে এসে পৌঁছেছেন।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।