No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মেরিকামায়া সাতকাহন : এস আই ইউ পর্ব শেষ, নিউইয়র্ক রাজ্যে শুরু হল নতুন অধ্যায়

    মেরিকামায়া সাতকাহন : এস আই ইউ পর্ব শেষ, নিউইয়র্ক রাজ্যে শুরু হল নতুন অধ্যায়

    Story image

    কনফারেন্স রুমে ডেসার্টেশন সেমিনার দেওয়ার পর। সান্ডবার্গ, স্টটলার এদের সঙ্গে আমি, মুক্তি, এবং কয়েকজন কলিগ

    একচত্বারিংশ পর্বের পর

    এস আই ইউ থেকে সবকিছু গুটিয়ে চলে যাবার দিন ঘনিয়ে আসছে। ঊনিশশো বিরানব্বই সালের শুরু হয়েছিল নানা আশঙ্কা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে।

    দেশে যেতেই পারলাম না। বোনের বিয়ে হয়ে গেলো, আমরা শেষ পর্যন্ত যেতেই পারলাম না। টাকাপয়সা যদিও বা কোনোভাবে ম্যানেজ করে যেতে পারতাম, ভিসা নিয়ে এতো গণ্ডগোল হতে পারে, এই ভয়ে আমরা গেলাম না। এতো যুদ্ধ করে আমাদের জীবনটা যে জায়গায় এসে পৌঁছেছে, এখন এমন কোনো ঝুঁকি নেওয়া যায়না যে ফিরেই আসতে পারবো না। আমি একা যেতে পারতাম, ফিরে আসার ব্যাপারেও আমার কোনো সমস্যা ছিলো না হয়তো। কিন্তু এতো বছর পরে একা একা কি যাওয়া যায়? তাও আবার বোনের বিয়েতে আনন্দ করতে? খুবই স্বার্থপরের মতো কাজ হবে সেটা।

    তার ওপর আছে তিনজনে মিলে দেশে যাওয়ার বিশাল খরচ। ক্যানাডায় মার্কিন কনস্যুলেট ফেরার ভিসা যদি আমাদের দিতো, তাহলে কী হতো বলা যায় না। হয়তো যেতাম, এবং কপর্দকশূন্য হয়ে ফিরে আসতাম। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে কোনো সাহায্য করতে পারতাম না।

    টরোন্টো থেকে ফিরে আসার পর মনে হলো, ভিসা হয়নি, একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। জমানো টাকাটা বাবাকে পাঠিয়ে দিতে পারবো। আমরা নাই বা গেলাম। আঙুরফল টক – কথামালার চিরায়ত প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে পিএইচডি’র রিসার্চ ও পড়াশোনায় মন দিলাম।

    পকেট খালি নিয়ে দেশে গেলেও কথা শুনতে হতো – আমেরিকায় থাকে, কিন্তু বোনের বিয়েতে ট্যাঁকখালির জমিদার হয়ে এসেছেন। আর যেতে পারলাম না, তাও অনেক কথা নিশ্চয়ই শুনতে হয়েছে। দেশের লোকের কথা তো ছেড়েই দিলাম, নিজের আত্মীয়স্বজনের কাছেই চিরকাল কত কথাই যে শুনতে হয়েছে আমাদের এই “স্বার্থপরতা” নিয়ে। কেমন করে আমার মতো “লো-ক্লাস” ছেলে স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় পড়তে এলাম, সে গুজবের গাছের কথা তো এই স্মৃতিকথার একেবারে শুরুতেই লিখেছি। আর একবার পড়ে নেবেন।

    বিরানব্বই সালে আমাকে পিএইচডি শেষ করতেই হবে, এবং অন্য কোনো ইউনিভার্সিটিতে চাকরি বা পোস্ট-ডক্টোরাল কাজ নিয়ে চলে যেতেই হবে। জুলাই কিংবা আগস্ট মাস পর্যন্ত আমার মেয়াদ। তারপর এস আই ইউ আমাকে কোনো আর্থিক সহায়তা দেবে না। আমার ডিসার্টেশন রিসার্চ অ্যাওয়ার্ড আর থাকবে না।

    এর মধ্যে অনেক সাধ্যসাধনা করার পর শ্বশুরমশাই এবং শ্বাশুড়িমাতা এসেছেন চার মাসের জন্যে। মুক্তির বাবা হার্ডকোর কমিউনিস্ট। আমেরিকায় আসার ব্যাপারে তাঁর চিরকাল ছুৎমার্গ ছিল। কিছুতেই তিনি আসবেন না। শেষ পর্যন্ত একমাত্র অতিপ্রিয় সন্তানের কথা ঠেলতে না পেরে তিনি এসেছেন। এবং আসার পরে প্রথম দিন থেকেই মেয়েকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ফেরার দিনটা যেন আমরা ভুলে না যাই, এবং পাসপোর্টগুলো যেন আমরা যত্ন করে রেখে দিই। খাঁচায় বন্দী পাখির মতো তিনি ছটফট করেন, ভালো ইংরিজি না জানার কারণে কারুর সঙ্গে কথাও বলতে পারেন না তেমন। সাদার্ন ইলিনয়ের মৃদু আবহাওয়াতেও এই জুন মাসেই তাঁর বেশ শীত করে। দীর্ঘকাল একা একা কন্যাবিহীন অবস্থায় থেকে থেকে তাঁর ও তাঁর স্ত্রী দুজনেরই শরীর একেবারেই ভেঙে গেছে। তাঁর ভয়, সুস্থ থাকতে থাকতে যেন তিনি দেশে ফিরে যেতে পারেন। তাঁর দৃষ্টিশক্তি এবং শ্রবণশক্তি দুইই এখন ক্ষীণ।

    মুক্তির মা কিন্তু এখানে এসে খুবই আনন্দে আছেন। ভেঙে যাওয়া শরীর তাঁর অনেকটা সেরেছে। নাতনিকে নিয়ে তিনি সারা দিনটা কাটান। নানারকম রান্নাবান্না করেন। আমাদের চার পাঁচ বছরের মেয়ে দাদু ও দিদাকে জীবনে প্রথমবার পেয়ে অতি আনন্দিত। সম্পূর্ণ বিপরীত দুই পার্সোনালিটি দাদু ও দিদার। কিন্তু দুজনেই অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ, এবং আদরের নাতনিকে নিয়ে তাঁরা কয়েকটা মাস কাটিয়ে যাচ্ছেন। আর কখনো তাঁরা আসতে পারবেন না, এ কথা আমরা সবাই জানি।

    ফিরে যাওয়ার আগে মেয়ে ও নাতনির সঙ্গে আমাদের এভারগ্রীন টেরেসের বাড়িতে মুক্তির বাবা-মা

    চরম, ভয়ানক ব্যস্ততার দিনগুলোতেও আমরা চেষ্টা করেছি তাঁদের নিয়ে এখানে ওখানে বেড়িয়ে আসবার। সেই দুর্ঘটনার পর গাড়ি সারানো হয়েছে। সে গাড়ি নিয়ে আমরা একবার সবাই মিলে চলে গেলাম শিকাগোতে বিশ্বদার বাড়ি। দক্ষিণ ইলিনয় থেকে উত্তর ইলিনয় – প্রায় সাড়ে তিনশো মাইল। আবার সেই ধূধূ করে জনমানব নাই হাইওয়ে। সেইসব পুরোনো স্মৃতি। ওদের সঙ্গেও বহুকাল পরে আবার দেখা হলো। তারপর একটা উইকএন্ডে আমরা গেলাম এখন অতি-পরিচিত সেন্ট লুইসে। তারপর বাড়ির কাছেই পাডুকা গ্রামে আমাদের শুক্লা-বিভাসের বাড়ি।

    শুক্লা-বিভাসের বাড়িতে

    কেন্টাকী’তে বেড়াতে যাওয়া হয়েছিল

    এই করতে করতে তাঁদের ফেরার দিন এগিয়ে এলো।

    ঠিক এই সময়েই আবার একটা দুর্ঘটনা। অনেক চেষ্টাচরিত্র করে মুক্তি ব্যবস্থা করলো বাবার চোখে অপারেশন করে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার। কিন্তু অপারেশন সফল হলোনা। তাঁরা যখন ফিরে গেলেন অনেক চোখের জল ফেলে, তখন বোঝা গেলো বাবার দৃষ্টি আর কখনোই ফিরে আসবে না।

    আবার সেই সেন্ট লুইস এয়ারপোর্ট। অশ্রুসজল মা, অশ্রুভারাক্রান্ত মেয়ে ও নাতনি, এবং হাত নেড়ে বিদায় জানানো বাবা।

    মুক্তির বাবা-মা দেশে ফিরে যাচ্ছেন, সেন্ট লুইস এয়ারপোর্টে

    একটা অধ্যায় শেষ হলো।

    এবারে এস আই ইউ’তে আমাদের শেষ অধ্যায়।

    একটা জীবনকাহিনিতে কত কীই বা লেখা যায়? গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ শেষ কথা বলে গেছেন।

    “স্মৃতির পটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানিনা। কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ যাহাকিছু ঘটিতেছে, তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই। সে আপনার অভিরুচি-অনুসারে কত কী বাদ দেয়, কত কী রাখে। কত বড়োকে ছোটো করে, ছোটোকে বড়ো। সে আগের জিনিসকে পাছে ও পাছের জিনিসকে আগে সাজাইতে কিছুমাত্র দ্বিধা করে না। বস্তুতঃ তাহার কাজই ছবি আঁকা, ইতিহাস লেখা নয়।”

    তাই, নব্বই, একানব্বই, বিরানব্বই এই তিনটে বছরের স্মৃতি ওভারল্যাপ করে আছে আমার এই জীবনকাহিনিতে। তারা ভীড় করে আছে – ছাদের ওপর রোদে শুকোতে দেওয়া বালিশগুলোর মতো। একটার থেকে আর একটাকে ঠিক আলাদা করা যায় না।

    সেই ভীষণ ক্রেজি ব্যস্ততার দিনগুলোতে আমি নানা জায়গা থেকে গ্র্যান্ট সংগ্রহ করে গেলাম ভবিষ্যতের জন্যে নিজেকে আরো একটু বেশি প্রস্তুত করতে। সান্ডবার্গ মোটেই খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু প্রিলিমস পরীক্ষায় ওইভাবে পাশ করে যাওয়ার পরে আর কোনো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর ছিলোনা -- পুরো ডিপার্টমেন্ট এবং ল্যারি ম্যাটেন আমার সহায়। কাজেই, আমি টিস্যু কালচার শেখার জন্যে একবার গেলাম পূর্ব টেনেসীর নক্সভিলে বিখ্যাত ছত্রাকবিদ রোনাল্ড পিটারসেনের কাছে। তারপর মলিক্যুলার বায়োলজিকে কীভাবে ইভোল্যুশন গবেষণায় কাজে লাগানো যায়, তা শেখার জন্যে গেলাম নতুন প্রজন্মের নামকরা বিজ্ঞানী রিটাস ভিলগ্যালিসের ল্যাবে নর্থ ক্যারোলাইনার ডিউক ইউনিভার্সিটিতে।

    নতুন শিক্ষা, নতুন অন্তর্দৃষ্টি নিয়ে ফিরে এলাম, এবং সেসব নতুন টেকনোলজি নিজের কাজে লাগালাম। অনেকটা পূর্ণতা ও সফলতা পেলো আমার কাজ। এবারে ডিসার্টেশন শেষ করার পালা।

    তার পরেও অনেক কিছু বাকি। পিএইচডি শেষ হলে তারপর কী হবে? কোথাও তো একটা যেতে হবে! এখন তো আর দেশে ফিরে যেতে পারবোনা। ওখানে আমাদের জন্যে আর কিছুই নেই। চাকরি নেই, অর্থ নেই, বাড়ি নেই। আমাদের কোনো রাজনৈতিক দাদা দিদি নেই। কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি আমরা নই যে দেশে ফিরে গেলেই আমাদের দুজনকে দুটো ভালো চাকরি কেউ দিয়ে দেবে।

    কিন্তু সে আশ্চর্য ঘটনাও ঘটেছিলো। অত্যাশ্চর্য ঘটনা। সে কথায় পরে আসবো।

    একটা জাতীয় কনফারেন্সে পেপার পড়তে গিয়ে যেমন আলাপ হয়েছিল রোনাল্ড পিটারসেন আর রিটাস ভিলগ্যালিসের সঙ্গে, তেমনই হয়েছিল নিউ ইয়র্ক বোটানিক্যাল গার্ডেনের ছত্রাকবিদ রয় হলিঙের সঙ্গে। আলাপ হয়েছিল শিকাগো বোটানিক্যাল গার্ডেনের গ্রেগ মুয়েলারের সঙ্গে – উষ্ণ, হাস্যমুখে গ্রেগ আবার সান্ডবার্গের কাছেই একসময়ে মাস্টার্স করে গিয়েছেন সেই টিম বেগানের মতো। আলাপ হলো অলব্যানির নিউ ইয়র্ক স্টেট বায়োলজিক্যাল সার্ভের জন হেনসের সঙ্গে।

    ডঃ জন হেন্স (বসে বাঁদিকে), যাঁর কাছে আমেরিকার প্রথম আসল চাকরি শুরু করেছিলাম

    এই সব হাজার সূত্রকে কাজে লাগিয়ে আমি স্কলারশিপ জোগাড় করে কাজ করে এলাম শিকাগো আর নিউ ইয়র্কে। শিকাগোকে তো আগেই খুব ভালো চিনতাম, এবারে চিনলাম নিউ ইয়র্ক শহরকে। একানব্বই সালে ব্রঙ্ক্স এলাকার বিখ্যাত বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেস্ট হাউসে থেকে গেলাম এক মাস – স্ত্রী ও কন্যাকে কার্বনডেলে রেখে এসে। নিউ ইয়র্ক শহরের সঙ্গে সেই আমার প্রথম ভালোবাসা।

    সারাদিন রয় হলিঙের ল্যাবে কাজ করতাম। আর সারা সন্ধ্যে পায়ে হেঁটে আর সাবওয়েতে নিউ ইয়র্ক শহর চষে বেড়াতাম একা একা। সে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা!

    পিএইচডি শেষ হলো আমাদের সেই লাঞ্চ রুম কাম কনফারেন্স রুমে আমি পাবলিক সেমিনার দিলাম। তারপর আর একটা ছোট ঘরে তিন ঘন্টা ধরে কমিটির সঙ্গে ভাইভা, অর্থাৎ ওরাল ডিফেন্স। শেষে আমাকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে কমিটি সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন।

    প্রধান রিসার্চ গাইড ওয়াল্ট সান্ডবার্গ ও হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট লরেন্স ম্যাটেন বাইরে বেরিয়ে এসে হাসিমুখে আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন।

    কংগ্র্যাচুলেশন্স, “ডঃ ব্যানার্জী। উই আর প্রাউড অফ ইউ।”

    অনেকদিন আগে ভুলে যাওয়া সেই দিনটার কথা মনে পড়ছিলো। আর জি কর হাসপাতালে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেছি এম এস সি ক্লাস শেষ করার পর।

    মা আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললো, “ভালো করে পড়াশোনা কোরো।”

    এক বৈজ্ঞানিক জার্নালের পাতায় জন হেনসের কাছে আমার কাজের খবর। শেষ প্যারাগ্রাফ

    জন হেনস ফোন করে আমাকে বললেন, “হে পার্থা, দিস ইজ জন ফ্রম অলব্যানি। রিমেম্বার মি?”

    আমি বললাম, “ইয়েস জন। উই মেট ইন উইসকনসিন। হাউ আর ইউ?”

    জন – “আই অ্যাম ডুইং গ্রেট। লুক, আই হ্যাভ এ জব ফর ইউ হিয়ার অ্যাট নিউ ইয়র্ক বায়োলজিক্যাল সার্ভে। আই উড বি ভেরি হ্যাপি ইফ ইউ টেক ইট।”

    আমি -- (বাকরুদ্ধ, শ্বাসরুদ্ধ।)

    (চলবে)

    [মেরিকামায়া সাতকাহনের দুই কাহন সমাপ্ত। তৃতীয় কাহন শুরু হবে পরের সংখ্যা থেকে।] 
    *আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

    ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

    ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @