No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মেরিকামায়া সাতকাহন : ভাড়া বাড়ি, ভাঙা গাড়ি আর অস্থায়ী ভিসা নিয়ে ৪ বছর আমেরিকায়

    মেরিকামায়া সাতকাহন : ভাড়া বাড়ি, ভাঙা গাড়ি আর অস্থায়ী ভিসা নিয়ে ৪ বছর আমেরিকায়

    Story image

    আমাদের নতুন নিসান সেন্ট্রা গাড়ি

    ঊনবিংশ পর্বের পর

    সেই যে মেয়ের সাত মাস বয়সে তাকে অন্নপ্রাশন দেওয়া হলো আমাদের সাদার্ন হিলসের এক কামরার ফ্ল্যাটে, সেখানেই কার্বনডেলের বেশ কিছু বাঙালির সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়ে গেলো। আগেই বলেছি বাংলাদেশের তেজেন সরকার ও তার স্ত্রী সীমা, মনিরুল আলম ও তার স্ত্রী কিশোয়ারা বেগম, আর ওদের গ্রুপেরই পারভেজ ও তার স্ত্রী নীপা। হৈহৈ করে কেটে গেলো সে দিনটা। মুনমুন আর তার ছেলেমেয়েরাও এসেছিলো সেই টেনেসী থেকে।

    মেয়ের অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানে রবি বরারি (বাঁ দিক থেকে), বাংলাদেশের কিশওয়ারা বেগম, আমি (একদম ডানদিকে)

    আমাদের এখানে একজন বাঙালি অধ্যাপকও রয়েছেন এডুকেশন ডিপার্টমেন্টে। ডঃ জ্ঞান ভট্টাচার্য্য থাকেন ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে। তাঁর বাড়িতে মাঝে মাঝেই ডাকেন তিনি তাঁর বন্ধুদের। দেশে থাকতে থাকতেই বোধহয় তাঁর সঙ্গে পরিচয় ছিল বিকাশদা ও তাঁর স্ত্রী শিপ্রা বৌদির। দুজনেই অনেক বেশি বয়সে এখানে পড়াশোনা করতে এসেছেন। কলকাতার উদারমনা বাঙালি সবাই। তাঁদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। আমাদের সঙ্গে খুব জমে গেলো।

    জ্ঞানদার জীবনসঙ্গিনী তখন মার্কিন শ্বেতাঙ্গিনী সুসান। বাংলাও বোঝে একটু একটু। আর সে বাড়িতে আশ্রিত আছে ইউনিভার্সিটির বেশ কয়েকজন ভারতীয় ছেলে। তারা ওখানে থেকে জ্ঞানদার নিজের পরিবারের মতোই হয়ে গেছে। গাছপালায় ঢাকা বিরাট বাড়ি। বিরাট লন। কিন্তু সেই লন বাড়ির পিছনের একটা জমি কেবলমাত্র। সুসজ্জিত টেনিস কোর্ট বা সুইমিং পুল সেখানে নেই। ওসব ধনতান্ত্রিক জায়গায় যেতে আমার কোনোকালেই ভালো লাগে না।

    প্রফেসর জ্ঞান ভট্টাচার্য্য আমার মেয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে

    সেখানে রাত্তিরবেলায় ক্যাম্পফায়ার জ্বেলে বারবেকিউ পার্টি হয়। আমরা আগুনের চারদিকে ঘিরে চেয়ারে বসে বাংলা ভাষায় গ্যাঁজাই। একটু বীয়ার, দু একটা সিগারেট। বাড়ি থেকে সবাই রান্না করে নিয়ে আসে। যাকে বলে ‘পটলাক পার্টি’।

    এমনই এক উইকেণ্ডের পার্টিতে গিয়ে এবারে আলাপ হলো সিনহা পরিবারের সঙ্গে। কৌশিক সিনহা যতদূর মনে আছে মিনারেল ইঞ্জিনিয়ার -- এই খনিশহরের ইউনিভার্সিটিতেই কাজ করেন তিনি। তাঁদের নিজেদের বাড়ি কার্বনডেল শহরের মধ্যেই। তাঁদেরও একটি ছেলে, একটি মেয়ে। স্ত্রী রত্না বোধহয় তখনও গৃহকর্মেই নিযুক্ত। পরে সে গ্র্যাজুয়েট ছাত্রী হয়ে পিএইচডি ডিগ্ৰী লাভ করেছে প্রচুর পরিশ্রমে, এবং আমরা এসআইইউ ছেড়ে চলে আসার পর অতবড় ইউনিভার্সিটিতে সে গ্র্যাজুয়েট স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডীন হয়ে বহুদিন কাজ করেছে। রত্না আমাদের খুব কাছের বান্ধবী হয়ে গেলো। তার বাড়িতে যাওয়া আসা। মনে আছে, রাতের বাঙালি খাওয়াদাওয়ার পর একসঙ্গে বসে রবীন্দ্রনাথের গান।

    মনে আছে, একদিন গাইলাম,

    “এ মোহ-আবরণ খুলে দাও, দাও হে।

    সুন্দর মুখ তব দেখি নয়ন ভরি,

    চাও হৃদয়মাঝে চাও হে।”

    মনে আছে, রত্নার মা তখন এসেছিলেন ওদের বাড়ি – কলকাতা থেকে। আমাদের হয়ে গেলো আমেরিকায় প্রায় চার বছর। আমাদের বাড়িতে দেশ থেকে কেউ আসেনি। আসবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। আমাদের টাকা নেই, বাড়ি নেই, গাড়িও প্রায় নেই বললেই চলে।

    রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া আর কিছুই নেই তখন আমাদের।

    রত্নার সঙ্গে যেমন আলাপ হলো জ্ঞানদার বাড়িতে গিয়ে, তেমনই একদিন আলাপ হলো বাংলাদেশের মেয়ে নাসীম আহমেদের সঙ্গে। সে তখন সবে এসেছে এখানে পিটসবার্গ শহর ছেড়ে। সঙ্গে আমার মেয়ের বয়সী একমাত্র মেয়ে নাইরীন। ওদের দুজনের একই দিনে জন্ম।

    আমার মেয়ে নন্দিনী ও নাসীমের মেয়ে নাইরীন

    অনেক কিছু মনে রাখার মধ্যে মনে আছে সন্ধ্যেবেলা আমি গেয়েছিলাম নজরুল ইসলামের গান,

    “মোর ঘুমঘোরে এলে মনোহর নমো নম।

    শ্রাবণ-মেঘে নাচে নটবর রমঝম।

    শিয়রে বসি চুপি চুপি চুমিলে নয়ন

    মোর বিকশিল আবেশে তনু নীপ-সম, নিরুপম, মনোরম।।

    মোর ফুলবনে ছিল যত ফুল

    ভরি ডালি দিনু ঢালি’ দেবতা মোর

    হায় নিলে না সে ফুল, ছি ছি বেভুল,

    নিলে তুলি’ খোঁপা খুলি’ কুসুম-ডোর।

    স্বপনে কী যে কয়েছি তাই গিয়াছ চলি’

    জাগিয়া কেঁদে ডাকি দেবতায় প্রিয়তম।”

    স্পষ্ট দেখেছিলাম, নাসীমের চোখে জল। শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুবারি আবার জেগে উঠেছিল আমাদের সবার – এই বিদেশ বিভুঁইতে বসে।

    এভাবেই একটু একটু করে নতুন সমাজ গড়ে উঠেছে আমাদের এই নতুন দেশে। নতুন ইউনিভার্সিটির নতুন ডিপার্টমেন্টে আমি এখন পরিচিত এক মুখ, এবং ডিপার্টমেন্টের বাইরেও এখন অনেকেই আমাকে চেনে। এই এসআইইউতে অনেক বাঙালি, অনেক ভারতীয়, আর বিদেশী ছাত্রছাত্রী যে অনেক বেশি তা তো আগেই বলেছি। একটু একটু করে পৃথিবীর নানা দেশের মানুষের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। আশ্চর্য এক রঙিন জগৎ খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে।

    শীত আর বরফ কেটে যাওয়ার পরে সাদার্ন হিলসের সবুজ গাছপালা আবার জেগে উঠেছে পত্রেপুষ্পে সুশোভিত হয়ে। যদিও আমি উদ্ভিদবিদ্যায় পিএইচডি ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন মুলুকের গাছপালার নাম জানি না। আমাদের দৌড় ওই প্যারেনকাইমা, কোলেনকাইমা, জাইলেম আর ফ্লোয়েম। অর্থাৎ নানাপ্রকার উদ্ভিদ কোষ ও কলা। সেল ও টিস্যু সিস্টেম। আমরা জানি সালোকসংশ্লেষ ও শ্বাসপ্রশ্বাস প্রণালী। আমরা জানি ইকোলজি আর ইভোল্যুশন। কিন্তু একটা অত্যন্ত পাড়াগাঁয়ের ছেলে বা মেয়ে একবার দেখেই যে গাছটার নাম বলে দিতে পারবে, আমাদের সে নাম সনাক্ত করতে তিনটে ভারী ভারী বইয়ের সাহায্য নিতে হবে। এই হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

    দেশে থাকতে এই ব্যাপারটা খুব বেশি অনুভব করেছিলাম। আমাদের সঙ্গে গ্রামের যে ছেলেমেয়েরা পড়তো, তারা আম জাম বট অশ্বত্থ কৃষ্ণচূড়া এসব খুব পরিচিত গাছপালা ছাড়াও অসংখ্য গাছের নাম জানতো, যা আমরা কলকাতার সবজান্তা ছেলেমেয়েরা জানতাম না। আমেরিকায় এসে দেখলাম, এখানে কিন্তু সাধারণ জ্ঞান ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনেক বেশি। বোটানি পড়তে যারা এসেছে, তারা শুধু বই মুখে করে বসে থাকে না। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে চারদিকের পৃথিবী, এবং তার প্রকৃতির সৌন্দর্য। যা আমরা দেশে থাকতে কখনো তেমন করে দেখিনি।

    এখানে অবশ্য আমি আরো অনেক বেশি হ্যান্ডিক্যাপড। আমি বিদেশী ছাত্র। আমি এদেশটাকে এখনো তেমন করে চিনি না। আমি জানি না আমার বাড়ির বারান্দার সামনে ওই যে বিরাট গাছগুলো চারদিকের লম্বা টানা বারান্দাগুলোর সামনেটায় রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলছে, তাদের পরিচয় কী। কোনটা ওক, কোনটা মেপল, কোনটাই বা অ্যাশ, পপলার, বার্চ – আমি কিছুই জানি না।

    রবার্ট মলেনব্রকের ট্রি আইডেন্টিফিকেশন ক্লাসটা যদি একবার নেওয়া যেতো! কত গাছের নাম জানতে পারতাম। কিন্তু আমার রিসার্চ প্রফেসর সান্ডবার্গ ওসব ক্লাস নিয়ে মোটেই উৎসাহিত নন। তিনি মাশরুম বিশেষজ্ঞ। তাঁর ইচ্ছে, আমি যেন শুধু মাশরুম নিয়েই পুরোনো দিনের স্টাইলে পড়াশোনা করি। হাজার রকমের মাশরুম আছে -- এবং তার হাজার রকমের বৈজ্ঞানিক নাম। সেসব চেনার দক্ষতা অর্জন করতে তো হবেই। কিন্তু কেবলমাত্র মাশরুম চেনার জন্যে আমি কি এতো কষ্ট করে এখানে পিএইচডি করতে এসেছি? আমার ইচ্ছে, নতুন নতুন আধুনিক পরীক্ষানিরীক্ষা করতে শিখবো। জেনেটিক্স শিখবো, মলিকুলার বায়োলজি শিখবো। রজার অ্যান্ডারসন আগেই ইকোলজির জ্ঞানের আলো মনের মধ্যে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। দেশে থাকতে সেসব কখনো শিখিনি তেমন করে। অথচ, এদেশে এসে বুঝেছি, জীববিজ্ঞান পড়তে গেলে কেবলমাত্র ওই সূর্যমুখী কাণ্ডের প্রস্থচ্ছেদ করো, আর পাঁচশোটা গাছের নাম মুখস্থ করে পরীক্ষাতে উগরে দাও – এ কোনো উচ্চশিক্ষাই নয়। আসল জীববিজ্ঞানের শিক্ষা হলো পরিবেশ, অভিব্যক্তি ও বিবর্তনের শিক্ষা। পরিবেশ সঙ্কট থেকে, লুপ্ত হয়ে যাওয়ার হাত থেকে জীবজগৎকে কীভাবে বাঁচাতে হবে, তার শিক্ষা।

    এখানে ল্যারি ম্যাটেন তাঁর উদ্ভিদপ্রত্নতত্ত্বের মাধ্যমে আমাকে একটু একটু করে সেসব শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। মলেনব্রকের ক্লাস নিয়ে আমার চোখ খুলে গেছে। কিন্তু সান্ডবার্গ পড়ে আছেন তার সেই আদ্যিকালের মাশরুম আইডেন্টিফিকেশন আর মাইক্রোস্কোপের নলে চোখ দিয়ে ছত্রাকের কোষকলার ছবি এঁকে থিসিস তৈরির জগতে।

    আমার কথা তাঁর পছন্দ নয়। এই সংঘাত একটু একটু করে তৈরি হচ্ছে এখানে এসে।

    সময় পেলেই আমি বেরিয়ে পড়ি। যেতেই হয়। একা একা ঘুরে বেড়াই বনেজঙ্গলে। নানারকম মাশরুম সংগ্রহ করে আনি। এছাড়া ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সহকর্মীদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি তো আছেই। ভারী বুট পরে আর গায়ে উজ্জ্বল কমলা রঙের ভেস্ট জ্যাকেট পরে পাইন বনের মিষ্টি গন্ধ উপভোগ করা সারা সকাল ধরে। উজ্জ্বল ভেস্ট, যাতে কোনো বন্দুকধারী মার্কিন শিকারী গুলি ছুঁড়ে না বসে।

    বনে জঙ্গলে ছত্রাকের শিকার। এই ছবিটি আমাদের এভারগ্রীন টেরেসের পিছনের বনে, দুপুরবেলায়

    ডিপার্টমেন্টে কাটাই সারাটা সপ্তাহ। বউয়ের সঙ্গে, মেয়ের সঙ্গে সারাদিন প্রায় দেখাই হয় না। ছোট্ট মেয়ে একটু একটু করে চাঁদের কলার মতো বড় হয়ে উঠছে। এক বছর বয়স হলো। মুক্তি অনেক চেষ্টা করে ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে একটা রিসার্চের কাজ খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু আইএসইউএর সেই ডঃ এন’এর মতোই এখানে ডঃ প্রীস। সদাশয় প্রফেসর। কাজ করার, নতুন নতুন গবেষণায় সাহায্য করার সুযোগ দিচ্ছেন। কিন্তু টাকাপয়সা দিতে পারছেন না। কারণ, বিদেশী ছাত্র আমি এফ-ওয়ান ভিসায় আছি। আমার ওয়াইফ আছে এফ-টু ভিসায়। মার্কিন ইমিগ্রেশন আইন অনুসারে সে ভিসায় অর্থ উপার্জনের কোনো অধিকার তোমার নেই। যদি বেআইনি কাজ করো, তোমার ভিসা তো বাজেয়াপ্ত হবেই, যে তোমাকে কাজ দিয়েছে, তাকেও বিরাট সমস্যায় পড়তে হবে। সুতরাং, আমার ওই তিনশো কুড়ি না পঁচিশ ডলার মাসিক উপার্জন, আর অবারটিনের সেই বনেজঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ওদের রিসার্চের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ এবং আরো দুশো তিনশো ডলার উপার্জন – এই নিয়েই আমাদের সংসার। তার মধ্যে বাড়িভাড়া, তার মধ্যে খাওয়াদাওয়া পোশাক পরিচ্ছদ, তার মধ্যে শিশুকন্যার খরচ, এবং তার মধ্যে প্রায়ই খারাপ হয়ে যাওয়া গাড়ির মেন্টেনেন্স।

    বীরবিক্রম ভ্যালিয়েন্ট গাড়ি আর চলছে না। পার্কিং লটেই বসে থাকে সর্বক্ষণ।

    (চলবে)

    *আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

    ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

    ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @