মেরিকামায়া সাতকাহন : বিদেশে পড়তে এসেছি কিন্তু উচ্চশিক্ষার বীজ রোপন হয়েছিল কলকাতায়

প্ল্যান্ট বায়োলজি, অর্থাৎ বোটানি ডিপার্টমেন্টে এসে যেন একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। তার প্রধান কারণ, পড়াশোনাটা চেনা বৃত্তের মধ্যে আবার ফিরে এলো।
সেই কলকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজে, আর তারও আগে স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে উদ্ভিদবিদ্যার যে পাঠ শুরু হয়েছিল, তার কিছুটা পরিণতি পেয়েছিলো বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে এমএসসি পড়তে গিয়ে।
স্কটিশ স্কুলের মাস্টারমশাই তরুণবাবু মনের মধ্যে জীববিজ্ঞানের বীজ পুঁতে দিয়েছিলেন। সে বীজ থেকে অঙ্কুর বেরোলো বিদ্যাসাগর কলেজে অধ্যাপক দীপক গুপ্ত, সজল চক্রবর্তী এঁদের বারিসিঞ্চনে। আর সায়েন্স কলেজে গিয়ে মায়ের মৃত্যুর ট্রমা সহ্য করেও নতুন নতুন প্রফেসর আর কয়েকজন বিশেষ বন্ধুর উষ্ণতায় সে কিশলয়, সে তরুলতা একটু একটু করে বিকশিত হয়ে উঠেছিল।
এই প্রফেসরদের মধ্যে বিশেষভাবে ডঃ নির্মলেন্দু সমাজপতি এবং রবীন পুরকায়স্থর নাম করতে চাই। রবীনবাবুর নাম আগেই লিখেছি। অধ্যাপক সমাজপতি বহুভাবে আমাদের দুজনকে সাহায্য করেছেন। তাঁর সাহায্য ও সমর্থন ছাড়া দেশে আমার চাকরি পাওয়াও হতো না, আর আমেরিকায় পড়তে আসাও সম্ভব হতো না। বিনা প্রশ্নে, বিনা দ্বিধায় তিনি আমাকে দরাজ হাতে প্রশংসাপত্র লিখে দিয়েছেন। আমার জীবনের প্রথম বৈজ্ঞানিক গবেষণার পেপারও তাঁর সহায়তায়।
এছাড়া পুরোনো বন্ধুদের মধ্যে নাগেশ্বর রাও যে এখন ক্যালিফোর্নিয়াতে আছে বহু বছর, তারপর কলকাতার শ্যামল চক্রবর্তী, আশালতা রোজারিও, জার্মানি চলে যাওয়া বান্ধবী তপতী দত্ত যার সঙ্গে সেই প্রফেসর দীপক গুপ্ত আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন – এঁদের কথা বলতেই হবে। আর বলতে হবে অবশ্যই আমার তখনকার বান্ধবী এবং চিরকালের সঙ্গিনী মুক্তির কথা। আমরা একসঙ্গেই জীবন শুরু করেছিলাম সেকালের সাদাকালো ফটোর মতো।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে জীববিজ্ঞান নিয়ে যতই পড়াশোনা ও গবেষণা করি না কেন, অতীতের সেই সোনাঝরা দিনগুলোর কথা ভুলতে পারি না। স্কটিশ চার্চ স্কুলে সেই বিখ্যাত সায়েন্স এগজিবিশন। সেখানেও আমি একজন পাণ্ডা – সেক্রেটারি। হাজারে হাজারে মানুষ যেন বিখ্যাত কোনো বারোয়ারি দুর্গাপুজো দেখতে আসার মতোই স্কুলে ভিড় করে আসছে কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, আর আমাদের বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের নানারকম এক্সপেরিমেন্ট আর মডেল দেখার জন্যে।
ইংরিজিতে যাকে বলে ইন্টেলেকচুয়াল কিউরিওসিটি – জ্ঞান অর্জনের স্পৃহা – সেই থেকেই শুরু হয়েছিল।
সুন্দরবন হাজি দেশারৎ কলেজের চার বছর কনিষ্ঠতম অধ্যাপক হিসেবে আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সেই জ্ঞান অর্জনের স্পৃহা তৈরি করতে চেষ্টা করেছি আমার তখনকার অতি সীমিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে। সেকালের যে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী ও সহ-অধ্যাপক-অধ্যাপিকারা আমার সঙ্গে এখনো যোগাযোগ রেখেছেন, তাঁরাই বলতে পারবেন কতটা সফল বা ব্যর্থ আমি হয়েছিলাম। হয়তো পারিনি তেমনভাবে সফল হতে, কারণ প্রতিবন্ধকতা খুব বেশি ছিল। কিন্তু চেষ্টা করিনি প্রাণপণ, একথা বোধহয় কেউ বলতে পারবেন না।
সুন্দরবন হাজি দেশারৎ কলেজ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে প্রথম আড়াই বছর ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শুধু ব্যস্ত ছিলাম একটা গাছকে উপড়ে ফেলে নতুন অচেনা অজানা এক ভূমিতে সেই গাছকে আবার মাটিতে পুঁতে তাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রায়-অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রচেষ্টায়। যে গাছ বাঁচার আশা ছিলো না প্রায়। কিন্তু অনেক ধৈর্য্যে, পরিশ্রমে, স্বার্থত্যাগে, চোখের জলে এবং প্রচণ্ড একরোখা জেদে সে গাছকে আবার আমরা বাঁচিয়ে তুলেছি। আজ প্রায় চল্লিশ বছর পরে যারা এক বিশাল বটবৃক্ষকে দেখছে, তারা অনেকেই জানেনা এ বটবৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখার সেই গোড়ার লড়াইয়ের দিনগুলোর কথা।
ঊনিশশো অষ্টআশির এপ্রিল মাস। এক সিমেস্টার প্রায় পার করে আসার পরে আজ আমি সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির এক উজ্জ্বল ছাত্র। আমাদের ডিপার্টমেন্টে কয়েক মাসের মধ্যেই কেমন যেন কিছুটা অলৌকিকভাবেই আমি প্রতিষ্ঠা, সুনাম অর্জন করতে পেরেছি। ঈশ্বর আছেন কি নেই, আমি জানি না। কিন্তু সঙ্গে আছেন পরামর্শ ও উৎসাহদাতা ও দাত্রী কয়েকজন প্রফেসর। সেই অধ্যাপক ল্যারি ম্যাটেন, রেমন্ড স্টটলার, ওয়াল্ট সান্ডবার্গ, রবার্ট মলেনব্রক, বারবারা ক্র্যান্ডাল-স্টটলার এঁদের সবাইকে আজ আবার প্রণাম ও কৃতজ্ঞতা জানাই। জীবনটাকে আর সেই গাছটাকে নতুন জমিতে নতুন পরিবেশে বাঁচিয়ে রাখার খাদ্য, পানীয় ও সার যুগিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরাই।
আর সঙ্গে ছিল আমার ছোট্ট পরিবার – আমার স্ত্রী ও কন্যা -- যারা আমার সঙ্গেই বহু বছর আমেরিকায় কাটিয়েছে। যারা আমার জন্যে স্বার্থত্যাগ করেছে। যারা ভারত, বাংলাকে বহু বছর দেখেনি। আমার স্ত্রী ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে মার্কিন ডাক্তারের অবহেলা ও গাফিলতির শিকার হয়েছে। তার ফলে তার রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেমে চিরকালের জন্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। নতুন আসা বিদেশি ছাত্র আমি সে অবহেলার, গাফিলতির কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। কার্বনডেলে এসেও সে মারাত্মক ক্ষতির বোঝা আমাদের দুজনকে, এবং আমাদের মেয়েকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে।
মুক্তির সঙ্গে আমাদের মেয়ে
কিন্তু ওই যে বলেছি, কম বয়সের উৎসাহ, এনার্জি, পরিশ্রমক্ষমতা আর “সর্বহারার জয়ের জন্যে আছে সারা বিশ্ব” মনোভাব বেঁচে থাকতে, সফল হতে সাহায্য করেছে আমাদের। দেশে সেই সময়ে আমাদের পরিবারে, সমাজে, বন্ধুদের সার্কেলে চেনা ভাত চেনা ডাল চেনা রাস্তা চেনা গলিতে কত কী ঘটে গেছে। আমরা তার থেকে অনেক অনেক দূরে সম্পূর্ণ একাকীত্বের মধ্যে জীবন কাটিয়েছি। আজকের মতো তখন ইন্টারনেটও ছিলো না, সেল ফোনও নয়। হোয়াটস্যাপ করে বাড়ির লোকের সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না। ঊনিশশো পঁচাশির আগস্ট থেকে ঊনিশশো চুরানব্বইয়ের এপ্রিল আমরা দেশ থেকে দূরে থেকেছি। একবারের জন্যেও দেশে যেতে পারিনি। আমাদের খোঁজও কেউ তেমন করেনি কখনো।
চিঠি আসতো হয়তো মাসে একটা, বা দুমাসে একটা। সে চিঠির প্রেরক প্রায় সবসময়েই আমার বাবা, বোন মাঝে মাঝে, আর আমার শ্বাশুড়িমায়ের লেখা চোখের জলে ভেজা চিঠি। তারপর তাঁরা একে একে চলে গেছেন। তারপর চিঠি লেখার যে অদ্ভুত ভালোবাসার একটা ট্র্যাডিশন আমাদের ছিল, সে ট্র্যাডিশন সমানে আর চলেনি। সম্পূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে বাঙালির চিঠি লেখার হাজার বছরের ইতিহাস।
আর চিঠি এসেছে কালেভদ্রে হয়তো কোনো এক বন্ধুর কাছ থেকে, বা এক মামাতো বোন, মাসতুতো বোন লিখেছে তাদের মনের কথা। আরো কয়েকজন যারা আমাদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে সুখে ও দুঃখে চিরকাল, তারাও খোঁজ রেখেছে, কিন্তু চিঠি লেখেনি কারণ চিঠি লেখার জন্যে একটা বিশেষ মানসিকতা দরকার হয় যা সকলের থাকে না। আমি জানি আমার শিল্পীবন্ধু ও শ্যালক সুশান্ত তাদের মধ্যে একজন। আমার ছোটোমাসি শোভা তাদের মধ্যে একজন। বন্ধুদের মধ্যে মাঝে মাঝে চিঠি দিয়ে খোঁজ করেছে আমার শৈশবের বন্ধু সুব্রত। তারপর সেও নতুন সহস্রাব্দ শুরু হওয়ার ঠিক দুমাস আগে কলকাতার উপকন্ঠে এক লোকাল ট্রেনের ধাক্কায় শেষ হয়ে গেলো। তার চিঠি তারপর থেকে আর কখনো আসেনা।
অবশ্য সে অনেক পরের কথা।
এসআইইউ’তে প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট জীববিজ্ঞানের বাড়ির চারতলায়। আমাদের মাইকোলোজি অর্থাৎ ছত্রাক সম্পর্কে গবেষণার ল্যাবরেটরির ঘরের নম্বর চারশো দুই। তার ঠিক পাশেই আমার নিজের ছোট্ট অফিস চারশো এক নম্বর ঘর। নিজের একটা আস্ত ঘর, তা সে ঘর যতই ছোট হোক না কেন।
আমাদের প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট এই লাইফ সায়েন্স টু বাড়ির তিনতলায় ছিল
ডিপার্টমেন্টের অফিসঘরের সামনের হলওয়েতে আমাদের সব গ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রী এবং প্রফেসরদের ছবি টাঙানো থাকে। আণ্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টরা অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।
অন্য গ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যারা মাস্টার্স লেভেলের স্টুডেন্ট, তাদের নিজস্ব কোনো অফিসঘর নেই। যেমন আমার ছিলোনা আইএসইউতে থাকার সময়ে। ওখানে অবশ্য পিএইচডি স্টুডেন্টদেরও কোনো নিজস্ব ঘর ছিলো না। এখানে আছে। রবার্টসনের পিএইচডি ছাত্রী সুসানের অফিসঘর ওদের ল্যাবের মধ্যেই একটা কোণে। মলেনব্রকের পিএইচডি ছাত্র মাইকেল আর ছাত্রী এলেনের অফিসঘর অধ্যাপকের ঘরের পাশেই। ওরা দুজন একসঙ্গে অফিস শেয়ার করে। প্ল্যান্ট জিওগ্রাফির অধ্যাপক ডন ইউজেন্টের পিএইচডি ছাত্র ডেভিড ব্রীনও ইউজেন্টের ঘরের মধ্যেই একপাশে। এম-এস স্টুডেন্ট রয়েছে বেশ কয়েকজন। তার মধ্যে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো ক্যারেন ন্যাশ, কেভিন শ্যুটি, আর একেবারে নতুন আসা “চুল তার কবেকার” সুন্দরী বেথানি উইল্টশায়ারের। স্টটলার দম্পতির পিএইচডি ছাত্রী শ্যারন, আর আমার ভাগ্যনিয়ন্তা সান্ডবার্গের মাস্টার্স ছাত্র টিম।
কত প্রজাতির ছত্রাক। সান্ডবার্গ ও আর এক সতীর্থ -- হাতে এক বিশেষ প্রজাতির শ্যানটারেল
কত কী ঘটনাপ্রবাহ! ডেভিড ব্রীনের সঙ্গে বেথের প্রেম শুরু হলো। তারপর ওরা বিয়ে করলো পরে। টিম আর শ্যারনও তাই।
আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ ছাত্রছাত্রীই এই ডিপার্টমেন্টে প্রায় সবাই। ভেবে দেখুন, তার মধ্যে আমি হংসমধ্যে বকো যথা। কৃষ্ণাঙ্গ কেউ নেই তখন। আর আছে পাকিস্তান থেকে আসা আমারই মতো বিবাহিত এক ছাত্র – মোস্তাফিজ মোহাম্মদ। বেচারা বোধহয় প্রথম এদেশে এসেছে অনেক আশা নিয়ে। সঙ্গে স্ত্রী আর দু তিনটে বাচ্চা।
আমাকে অনেক প্রশ্ন করতো। অনেককিছু জানতে চাইতো, কারণ ওই যে বললাম, আমাদের লড়াই এক। আমাদের চোখের জলের গল্পও এক।
মোস্তাফিজ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে লড়াই জিততে পারলো না। কিছুদিন পরে আমি তাকে আর দেখিনি।
কোথায় হারিয়ে গেলো পাকিস্তানের সেই বিষাদমুখী ভদ্র নম্র ছেলেটা!
(ক্রমশঃ)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।