No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মেরিকামায়া সাতকাহন : ডিপার্টমেন্টের বাইরে আমাদের কোনো দেশ, সমাজ কিছুই ছিল না

    মেরিকামায়া সাতকাহন : ডিপার্টমেন্টের বাইরে আমাদের কোনো দেশ, সমাজ কিছুই ছিল না

    Story image

    ষষ্ঠবিংশ পর্বের পর

    তুন স্কুল, নতুন ডিপার্টমেন্ট, নতুন পাওয়া আত্মবিশ্বাস আর সম্মান।

    আইএসইউ ছিল কামারের গনগনে আগুনের হাপর। এসআইইউ এখন “ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে, ঢাল তলোয়ার ঝনঝনিয়ে বাজে।”

    মানুষ যখন তার আত্মবিশ্বাস ফিরে পায়, আর সাথে সাথে মানুষ হিসেবে তার যেটা প্রাপ্য, সেই সম্মান, তখন সে অসাধ্যসাধন করতে পারে। আমি এখন প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করি, আমিও তা পারি। না, আমি এখনো দারিদ্র্যপীড়িত বিদেশি ছাত্র দেশ থেকে বহু, বহু দূরে থাকা আমেরিকা বলে একটা দেশের একটা কলেজে। তিন বছর হতে চললো আমি দেশে যেতে পারিনি। কবে যেতে পারবো, তার কোনো ঠিক নেই। আমার স্ত্রী আর মেয়ে আমার এই নতুন জীবনের একমাত্র অবলম্বন। আমার একটা ভাঙামতো গাড়ি আছে, সেটা নিয়ে দূরে কোথাও যাওয়া যায় না। আমাদের বলতে গেলে ডিপার্টমেন্টের বাইরে কোনো দেশ নেই, সমাজ নেই।

    আমাদের অস্তিত্ব এই স্কুলের মধ্যেই, এই ডিপার্টমেন্টের মধ্যেই। তার বাইরে আমাদের কোনো পরিচিতি নেই। আমাদের পায়ের তলায় মাটি নেই।

    তাও যৌবনের উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকে। বাঁচার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে। ইংরিজিতে যাকে বলে অপ্টিমিজম, তা থাকে প্রচুর পরিমাণে। তাই নিয়েই ভেলা ভাসিয়েছি এই অকূল দরিয়ায়। সে দরিয়া যে কী বিশাল, এবং কী অসম্ভব তা পার হওয়া, তাও ভালো করে বোঝার মতো জ্ঞানবুদ্ধি তখনও আমার নেই।

    ভাগ্যিস ছিলো না। বেশি জ্ঞানবুদ্ধি থাকলে হয়তো বুঝতে পারতাম, কী অসম্ভবকে সম্ভব করতে চলেছি। হয়তো ভয়ে হাল ছেড়ে দিতাম। কিন্তু “সর্বহারার হারাবার কিছু নেই, জয়ের জন্যে আছে সারা বিশ্ব” – এই আপ্তবাক্য নতুন চেহারায় আমাকে, আমাদের জীবনকে সে দরিয়াতে ভেসে থাকতে, বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে।

    লড়াই করে যাচ্ছি প্রতিদিন। জানি না সে লড়াইয়ের পরিণাম কী – জীবন না মৃত্যু, জয় না পরাজয়। শুধু জানি, এ ছাড়া আর কোনো উপায় আমার নেই।

    প্ল্যান্ট বায়োলজি হলো বোটানি ডিপার্টমেন্টেরই আধুনিক নাম। আমেরিকায় পিএইচডি করতে গেলে অনেক ক্লাস নিয়ে তারপর বসতে হয় কম্প্রিহেন্সিভ পরীক্ষায়, যেখানে তোমাকে বায়োলজির সমস্ত বিষয়ে জ্ঞান ও বিশ্লেষণের পরিচয় দিতে হবে। তবেই তুমি থিসিস লেখার অধিকার পাবে। সে পরীক্ষায় যদি সসম্মানে উত্তীর্ণ হতে না পারো, তাহলে বিদায় নিয়ে চলে যেতে হবে। সুতরাং, ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছো, এবং স্কলারশিপ পেয়েছো বলেই যে টিঁকে থাকতে পারবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।

    বললাম না, লড়াই সবে শুরু হয়েছে। এখনো অনেক পথ চলা বাকী।

    তার মধ্যে অর্থ উপার্জনের মতো একটা জরুরি ব্যাপার আছে। ফ্যামিলি যতই ছোট হোক না কেন, বাড়িভাড়াও দিতে হবে, রান্না করে খেতেও হবে, জামাকাপড়ও কিনতে হবে। রেস্টুরেন্টে খাওয়া বা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার মতো বিলাসিতা না হয় বাদই দিলাম। আর হ্যাঁ, দেশে যাওয়ার টাকা নেই। তাই বোনের বিয়ের সব ঠিকঠাক হচ্ছে, কিন্তু আমরা যেতে পারবো না।

    সদ্য পাওয়া সম্মান আর প্রশংসা নিয়ে আমি দিন কাটাচ্ছি এই নতুন স্কুলে, নতুন ডিপার্টমেন্টে। নানারকম ক্লাস নিচ্ছি, এবং আমার মনে হয় কোনো ক্লাসেই আমি ফোর-পয়েন্ট-ও ছাড়া আর কিছু পাইনি। শুধু একটা ক্লাসে পরে বি-প্লাস পেয়েছিলাম, কারণ সে ক্লাসে আমিই ছিলাম একমাত্র ছাত্র। সেই যে ডঃ রেমন্ড স্টটলারের কথা বলেছিলাম, তাঁর একটা ক্লাস নিতেই হয়েছিল রিসার্চ করার অবশ্য-প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে। সে ক্লাসের বিষয় ছিল গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করার জন্যে কতরকমের জার্নাল আছে, পেপার আছে, আর আমার বিষয় সিস্টেমেটিক্স অর্থাৎ শ্রেণীবিন্যাস ও নামকরণ করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী কী কী। বলাই বাহুল্য, অত্যন্ত বোরিং একটা বিষয়, এবং বাধ্য না হলে কেউ সে ক্লাস নেয় না। তখন ইন্টারনেটও নেই, গুগলমাসিও তখন ভবিষ্যতের গর্ভে।

    ডঃ রেমন্ড স্টটলার

    আমার বোরিং প্রফেসর ওয়াল্ট সান্ডবার্গ আমাকে সে ক্লাস নিতে বাধ্য করলেন, এবং দেখা গেলো, “আমি ছিনু একা বাসর জাগায়ে।” এবং বাসরে জেগে থাকাটাই সে ক্লাসে একটা বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো। এদিকে একজন ছাত্র একা একা ক্লাসে বসে বসে ঢুলছে, সেটাও বিশেষ ভালো দেখায় না। এই ক্লাস নিলাম, এবং স্টটলার আমাকে জানালেন, তোমাকে এ-গ্রেড দিতে পারলাম না, কারণ তোমার সঙ্গে তুলনা করার আর কোনো ছাত্র সে ক্লাসে ছিলো না। তাই, বি-প্লাস।

    আমি বললাম, যাব্বাবা! এ আবার কী গ্রেডিং!

    কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ফেয়ার গ্রেডিং। কারণ, ক্লাসে বসে ঢোলার জন্যে কিছু পয়েন্ট তো কেটে নিতেই হবে। নেওয়াই উচিত।

    কিন্তু কয়েকটা ক্লাস আমি সেখানে নিয়েছি, যা সারাজীবন মনে থাকবে। তার মধ্যে একটা হলো আমাদের ডিপার্টমেন্টের বিখ্যাত ওল্ড-স্কুল প্রফেসর রবার্ট মলেনব্রোকের দেওয়া এনডেঞ্জার্ড প্ল্যান্টস অ্যান্ড অ্যানিমালস ক্লাস। সেই প্রথম এই বিষয়ে আমার চোখ খুলে দিলেন সত্তরোর্ধ স্নেহশীল বব স্যার। আমরা অবশ্য বব স্যার বলে ডাকতামনা কেউ। ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে খ্যাতনামা অধ্যাপক বোধহয় তখন তিনিই। দক্ষিণ ইলিনয় অঞ্চলের গাছপালা সম্পর্কে এনসাইক্লোপিডিয়া হলেন ডঃ মলেনব্রোক। কিন্তু কেবলমাত্র ওক মেপল বার্চ উইলো পপলার অ্যাশ চেস্টনাট নিয়েই তাঁর জগৎ নয়। সে জগৎ তো আছেই। বই আছে তাঁর একাধিক সে বিষয়ে।

    প্রফেসর রবার্ট মলেনব্রোক

    কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (IUCN), এবং জীবজগৎ সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক এই সংস্থা কোন কোন প্রাণী ও উদ্ভিদকে তাদের লাল তালিকায় রেখেছে, সে সম্পর্কে এমন আশ্চর্য মনোজ্ঞ আলোচনা আমি আগে কখনো শুনিনি। গোগ্রাসে গিলতাম তাঁর সহজ সরল ভাষায় লেকচার।

    কী আশ্চর্য সুন্দর তাঁর বাচনভঙ্গী!

    International Union for Conservation of Nature — এর নানা রকম র‍্যাংকিং

    কত গাছপালা আর প্রাণীর নাম যে শিখেছি এই ক্লাসে! থ্রেটন্ড স্পিসিস অর্থাৎ যাদের ওপর নানা বিপদের আক্রমণ হয়ে চলেছে – পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে অথবা মানুষের লোভ ও লালসার কারণে, আর তার থেকেও মর্মান্তিক অবস্থা যাদের সেই নিয়ার-এক্সটিঙ্কট (near-extinct) স্পিসিস, যারা ভীষণভাবেই এনডেঞ্জার্ড, তাদের অবস্থার পার্থক্য কী, এসব নিয়ে শিখতাম। আফ্রিকান হাতির কী সঙ্কটকালীন দশা, হিংস্র শিকার হয়ে চলেছে তারা হাতির দাঁতের লোভী চোরাকারবারিদের হাতে। ফ্লোরিডা এলাকার সাগরের ম্যানাটিদের অবস্থাও তাই। তাদের বলা হয় সী কাউ।

    মার্কিনি ছাত্রছাত্রীরা অনেকেই এসব জানে। কিন্তু আমি কী করে জানবো, আমি তো এখানকার মানুষই না।

    লোভী ব্যবসায়ীদের পাতা জালে আটকা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছে হাজারে হাজারে নিরীহ শুশুকের দল। আফ্রিকার উপকূলবর্তী অঞ্চলে শিশু শ্রমিকদের দাসের মতো লোহার শৃঙ্খলে বেঁধে কাজ করিয়ে নিচ্ছে আড়কাঠিরা। তারপর মেরু অঞ্চলের ভালুক এরা তো আছেই।

    ব্রেজিলে বৃষ্টিঅরণ্য ধ্বংস হচ্ছে নির্বিচারে। কত সহস্র উদ্ভিদ, প্রজাপতি, পাখি চিরকালের মতো শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারপর আছে মনুষ্যকৃত ক্লাইমেট চেঞ্জ ও তার বিভীষিকা।

    কত দীর্ঘ সময়ে ভারতে, কলকাতায় লেখাপড়া করেছি – স্কুলে, কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে। কত কী মুখস্থ করেছি পরীক্ষা পাশের জন্যে। কিন্তু আসল জীববিদ্যার গল্প কেউ কখনো আমাদের বলেনি। কী অদ্ভুত বাস্তবতা-বিরহিত ছিল আমাদের সে পড়াশোনা, আর জ্ঞান জাহির করার বহর!

    আর এখানে এই ডিপার্টমেন্টের একজন আপাত-রক্ষণশীল দক্ষিণী প্রফেসর বিশ্বের জীবজগৎ ও তার আসল অবস্থা সম্পর্কে আমার চোখ সম্পূর্ণ খুলে দিয়ে গেলেন। রসে মজিয়ে দিয়ে গেলেন আমাকে।

    অপেক্ষা করে থাকতাম প্রতি সপ্তাহে একবার তাঁর ক্লাসরুমে বসার জন্যে। যদিও তাঁর সঙ্গে আমি পরে কখনো কোনো কাজ করিনি, কিন্তু মানুষটা তাঁর অদ্ভুত শান্ত ঋষিতুল্য ব্যবহারে আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছিলেন।

    তাঁর কাছে পিএইচডি অথবা মাস্টার্স রিসার্চ যারা করতো, তারাও খুব শান্ত স্বভাবের ছিল। অধ্যাপকের ব্যক্তিত্ব ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেও কেমন প্রভাব ফেলে, তার প্রমাণ পেয়েছি। দক্ষিণী মেয়ে লম্বা চুলের এলেন সাইফারকে মনে পড়ে। তারপর মাইকেল যে আমাকে প্রথম সেই ইকোলজি পেপার এনে দেখিয়েছিলো। বব স্যারের মতোই এদের ব্যক্তিত্বও ছিল কোমলস্বভাবের।

    আর ছিল সুসান। সাদার্ন ড্রল খুব বেশি, কিন্তু খুব ভালো বান্ধবী। সে কাজ করতো উদ্ভিদ ইকোলজি নিয়েই ফিলিপ রবার্টসনের কাছে। খুব বন্ধু হয়েছিলাম আমরা। পরে সুসানের বিয়েতে ওদের চার্চে আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সুসান আর ওর বর নর্ম। সে কাজ করতো দ্য সাদার্ন ইলিনয়ান কাগজের সাংবাদিক হিসেবে। 

    আমার কাজও একেবারেই বাস্তব জগতের কাজ। ডিপার্টমেন্টে ওই অর্ধেক স্টাইপেন্ড পাওয়ার জন্যে আমি কাজ করি ওয়াল্ট সান্ডবার্গের টীচিং অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে। প্রথম সিমেস্টারে কাজ করলাম তাঁর ফরেস্ট প্যাথোলজি ক্লাসে। সাদার্ন ইলিনয়ের ঘন সবুজ বনাঞ্চল। তার লক্ষ লক্ষ গাছ। এবং গাছের পাতায়, ফলে, ফুলে, কাণ্ডে, মূলে নানারকম অসুখ। কোনোদিন ভালো করে দেখিনি নিজের চোখে এর আগে। সেই বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে প্ল্যান্ট প্যাথোলজি পড়াতেন আমাদের অধ্যাপক ডঃ রবীন পুরকায়স্থ। খুব ভালো পড়াতেন। চমৎকার মানুষ। আমাকে কেন জানিনা খুব স্নেহ করতেন, যদিও সেখানে আমি ভালো রেজাল্ট করতে পারিনি মোটেই। সে গল্প আমি “ঘটিকাহিনি”তে লিখে রেখেছি। কিন্তু উচ্চমানের অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও সিলেবাসটাই এতো প্রাগৈতিহাসিক ছিল যে সবকিছুই শিখতাম বই পড়ে পড়ে। রাস্তায় বেরিয়ে, বনেজঙ্গলে ঘুরে কেউ আমাদের হাতেকলমে এসব ব্যাপার দেখিয়ে দেয়নি।

    আর এখানে এসে দেখলাম, অদ্ভুত অদ্ভুত সব ছত্রাক, কীট, ভাইরাস কেমনভাবে অরণ্যের অধিকারের একটা অপরিহার্য অঙ্গ। ক্রিসমাসের সময়ে পশ্চিমী সভ্যতার আদরের মিসলটো যে আসলে একটা পরজীবী উদ্ভিদ, এবং আশ্রয়দাতা গাছের শরীরে তাদের শোষণমুল প্রবেশ করিয়ে দিয়ে রস শোষণ করেই যে তারা বেঁচে থাকে, তা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। জানতে পারলাম নতুন নতুন প্যারাসাইটের কথা, যারা জাহাজে করে আমেরিকায় এসে হাজির হয়েছে ইউরোপ বা অন্যান্য দেশ থেকে।

    ইতিহাসের গল্পও হতে থাকলো তার সঙ্গে সঙ্গে। আমেরিকায় ইউরোপীয় অভিবাসীদের আবির্ভাব।

    আমরা এশিয়া থেকে, ভারত থেকে এদেশে এসেছি তার অনেক, অনেক পরে। আমাদের ইতিহাস একেবারেই আলাদা।

    (চলবে...)

    *আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

    ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

    ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @