মেরিকামায়া সাতকাহন : ঘুমিয়ে পড়া গ্রামের মতো এক ছোট্ট শহর টেনেসী রাজ্যের জ্যাকসন

টেনেসীর পাশ দিয়েও বয়ে চলেছে বিশাল মিসিসিপি-মিসৌরি নদী
ঘুমিয়ে পড়া গ্রামের মতো এক ছোট্ট শহর টেনেসী রাজ্যের জ্যাকসন। ঠিক যেন সেই বিশ্বদাদের লাইল। সেই একই রকম জনশূন্য। সেই একই রকম ফাঁকা ফাঁকা রাস্তা, দোকান, লাইব্রেরি, মল।
এক এক সময়ে মনে হতো, এভাবে লোকগুলোর চলে কীকরে? বিক্রীবাটাই তো হয় না প্রায়!
তাও চলে নিশ্চয়ই ওদের জীবন। একটা শহর, একটা মেন রাস্তা শহরটার মাঝখান দিয়ে চিরে গেছে। একটা হাইস্কুল, একটা পাবলিক লাইব্রেরি, একটা শপিং মল, একটা পুলিশ স্টেশন, একটা অগ্নিনির্বাপক কেন্দ্র যাকে এদেশে বলে ফায়ারফাইটারদের স্টেশন যেখানে দুটো বা তিনটে লাল রঙের ইঞ্জিন।
আর অনেকগুলো চার্চ। আমেরিকায় বোধহয় প্রতিটি হাইস্কুল আর লাইব্রেরির সাথে সাথে গোটা পাঁচেক গির্জা আছে। লাইলে কতগুলো আছে আমি জানি না, কিন্তু এই দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রের রাজ্যগুলোতে আছে হাজারে হাজারে। রক্ষণশীলতা যে কোথায় গিয়ে পৌঁছতে পারে এই একবিংশ শতাব্দীতে, টেক্সাস, টেনেসী, অ্যালাবামা, আর্কানসা, মিসিসিপি, কেন্টাকিতে বাস না করলে বোঝা যাবে না।
টেনেসীর জ্যাকসন – ব্ল্যাক আমেরিকার আনন্দের জায়গা এই লেকের ধারে মাছ ধরা
ইলিনয়ের উত্তরে শিকাগোর মতো গমগমে, রমরমে মেট্রোপলিস। সেখানে এলজিবিটি, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার, আর মী টু আন্দোলন। বারাক ওবামা, মিশেল ওবামার অ্যাকটিভিজমের আঁতুড়ঘর। রেশিয়াল জাস্টিসের লড়াই চলেছে প্রতিনিয়ত।
আর সেই একই ইলিনয়ের দক্ষিণে কার্বনডেল স্কুল ক্যাম্পাসটা ছাড়িয়ে পাঁচ মাইল চলে গেলেই মনে হয় যেন এব্রাহাম লিঙ্কনের আগের আমেরিকায় ফিরে গেছি টাইম মেশিনে চড়ে। সেখানে এখনো কৃষ্ণাঙ্গরা সাবধানে হাঁটাচলা করে, ভুলক্রমেও শ্বেতাঙ্গ নেবারহুডে পদার্পণ করেনা। ব্ল্যাকদের প্রিয় মাছের দোকানে হোয়াইটরা কখনো যায় না। ব্ল্যাকদের প্রিয় মাছ ধরার মিসিসিপি-মিসৌরি নদীতে সেই মার্ক টোয়েনের সময় থেকেই পাড়গুলো অলিখিতভাবেই আলাদা করা আছে। কালোদের এলাকার পাড়গুলো ভাঙাভাঙা, কাঠের বাড়িগুলোর তক্তা রংজ্বলা, আর বাড়ির পিছনের একচিলতে জমিগুলোর ঘাসের রং সবুজ নয়, প্রায় ধূসর।
ব্ল্যাক আমেরিকার গরিবদের বাড়ি
আর জ্যাকসনের ধনী শ্বেতাঙ্গ এলাকার বাড়িগুলো প্রাসাদের মতো। চার্চগুলোও প্রাসাদের মতো। যীশুখ্রীষ্ট ধনীদরিদ্র্যের জীবনের আকাশপাতাল পার্থক্যের কথা বলে গিয়েছিলেন। এখন সেসব কথা আর কেউ বলে না। প্রাসাদোপম গির্জার ফুটবল মাঠের মতো বড়ো উপাসনা হলে বিত্তবানরা শান্তির খোঁজে আসে প্রতি রবিবার সকালে সুসজ্জিত হয়ে।
গরিব কৃষ্ণাঙ্গদের চার্চ
পাথরের দেওয়াল, বিশাল সবুজ লন, অনেকেরই বাড়ির পিছনে টেনিস কোর্ট কিংবা সুইমিং পুল। গ্যারাজে স্বামী, স্ত্রী, একটি টিনএজার ছেলে এবং আর একটি প্রায় টিনএজার মেয়ের জন্যে একটি করে গাড়ি।
তার সঙ্গে আমাদের রবিদার মতো অতি-ধনিকদের বিলাসবহুল একটি মাঝারি সাইজের ইয়াট – প্রমোদতরণী।
কাটলো বেশ কয়েকটা দিন সেখানে। রবিদা, মুনমুন দুজনেই হাসিখুশি, দিলদরিয়া। বাঙালি বন্ধু পেয়ে তারাও খুশি এই নিঃসঙ্গ জীবনে। মুনমুন সেই কলকাতার ডোভার লেনের ফ্ল্যাট থেকেই আমার বন্ধুর মতো। এদেশে এসে বন্ধুত্ব আরো অনেক বেশি বাড়লো। কলকাতার চিরপরিচিত হাহা হিহি।
দু’তিন মাইল দূরেই আর এক বাঙালির বাড়ি, যেখানে বাড়ির কর্তা স্থানীয় সরকারি আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক। যেহেতু তিনি ব্ল্যাক কলেজে পড়ান, এবং অপেক্ষাকৃত কম বিত্তবান, উচ্চবিত্ত বাঙালি সমাজের কাছে তিনি একটু ব্রাত্য। খুব ভালো করে না মিশলে বোঝা যাবেনা অবশ্য। উইকএন্ডের নিয়মিত পার্টিতে খাওয়াদাওয়া একসঙ্গেই হয়ে থাকে। কিন্তু ভারতীয় ও বাঙালি সমাজের এই প্রথাগত অভ্যন্তরীণ শ্রেণীবিভেদের চেহারা এদেশে সবজায়গাতেই এক।
এই জ্যাকসন কিন্তু মিসিসিপির বিখ্যাত জ্যাকসন নয়, যেখানে রেভারেণ্ড মার্টিন লুথার কিংয়ের নেতৃত্বে বিশাল জনজাগরণ হয়েছিল। টেনেসীর এই জ্যাকসন থেকে একটু দূরেই একঘন্টার ড্রাইভ হলো আর এক ঐতিহাসিক মেমফিস – যেখানে ঊনিশশো আটষট্টি সালের চৌঠা এপ্রিল সন্ধ্যে ছটার সময়ে লোরেইন মোটেলের বারান্দায় রেভারেণ্ড কিংকে দূর থেকে গুলি ছুঁড়ে হত্যা করেছিল এক ঘাতক। এতো কাছে হওয়া সত্ত্বেও টেনেসীর বঙ্গসন্তানদের কারুকে কখনো সেখানে যাবার কথা বলতে শুনিনি।
সত্যি কথা বলতে, ডীপ সাউথের এমন জায়গায় থাকা সত্ত্বেও বর্ণবৈষম্য সম্পর্কে কোনো আলোচনাই হতে শুনিনি তাঁদের বাড়িতে। কার্বনডেলে থাকার চার বছরে ওখানে গিয়েছি অনেকবার। বেড়াতে যাবার আমাদের দুটো জায়গা ছিল টেনেসী আর পশ্চিম কেন্টাকিতে। কেন্টাকির কথা পরে বলবো।
ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে পশ্চিম টেনেসীতে একটা তুষারঝড় এলো। আমরা ততদিনে জমিয়ে আড্ডা দিয়ে, রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে, কলকাতার জোক প্র্যাকটিস করে, রবিদার সঙ্গে নদীতে গিয়ে ছিপ ফেলে পর্গি মাছ ধরে, আর সেগুলো আবার নদীতেই ছেড়ে দিয়ে, আর বাকীটা পুষিয়ে নেওয়ার জন্যে ব্ল্যাক-অধ্যুষিত ফিশ মার্কেটে গিয়ে কাতলা মাছের মতো বাফালো ফিশ কিনে এনে বাড়িতে রান্না করে তুমুল দিন কাটাচ্ছি। আমেরিকায় এসে এই প্রথম বাঙালিদের সঙ্গে দিনের পর দিন আড্ডা। তা সে রবিদা যতই আর পাঁচটা ধনী আমেরিকান-ইন্ডিয়ানদের মতো রিপাবলিকান হোক না কেন, আর রাজনীতি-সমাজের সম্পর্কে যতই রক্ষণশীল হোক না কেন। ওসব কথা হয়নিও বেশি, আর তখনকার দিনে আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার ছিল প্রায় শূন্য। ফলে, ঝগড়াঝাঁটির কোনো অবকাশই ছিলোনা।
সেই সাতাশির শেষ সপ্তাহ আর অষ্টআশির প্রথম সপ্তাহ আনন্দে গল্পে হাসিতে ভরিয়ে তোলার জন্যে মুনমুন আর রবি বাররির পরিবারকে কৃতজ্ঞতা।
তুষারঝড় যা এলো, শিকাগোর কাছে থাকতে তেমন তুষারঝড়কে আমরা গ্রাহ্যই করতামনা। তার মধ্যে দিয়েই হেঁটে গেছি বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে। আবার তার মধ্যে দিয়েই হেঁটে ফিরেছি অনেকবার। শূন্যের থেকে পনেরো, কুড়ি ডিগ্রি নীচে তখন তাপমাত্রা। সুমেরু, কুমেরুতে কখনো থাকিনি, সাইবেরিয়াতেও নয়। মাউন্ট এভারেস্টে চড়ার সৌভাগ্য কখনো হয়নি। কিন্তু চোখে পুরু কাচের কালো সানগ্লাস দিয়ে তীব্র সান থেকে চোখদুটোকে বাঁচিয়ে, আর কান ও হাতদুটোকে ঠাণ্ডায় ফেটে যাওয়ার থেকে বাঁচানোর জন্যে সেই পর্বতারোহীদের মতোই মোটা উলের টুপি আর দস্তানা পরে বাড়ি ফিরেছি একহাঁটু বরফের মধ্যে স্নো বুট গেঁথে গেঁথে। নিঃশ্বাস নাক দিয়ে বেরিয়েই সঙ্গে সঙ্গে জমে বরফ হয়ে গেছে।
ছয় থেকে ষোলো ইঞ্চি বরফ স্তূপ হয়ে থেকেছে রাস্তায়, বারান্দায়, আর সেই ফুলের মতো সুন্দর সবুজ কোয়াডে। স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্টের দরজা আইস হয়ে জ্যাম হয়ে গেছে। সিকিউরিটির লোক ডেকে সে আইস কাটতে হয়েছে।
আর এখানে দেড় কি দু ইঞ্চি বরফেই জ্যাকসন প্রায় শাটডাউন। এলিমেন্টারি থেকে হাইস্কুল সব বন্ধ। কারণ, এখানে এমন স্নো হয়না, এবং সরকারের টাকাপয়সা নেই সে বরফ পরিষ্কার করে দেবার যন্ত্রপাতি বা রাস্তায় নুন ছড়িয়ে বরফ গলিয়ে দেওয়ার ট্রাকের।
আমার মেয়ে তখন মাত্র ছমাসের। চোখ পিটপিট করে তাকাতো আর হাসতো। তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কম্বলের মতো একটা পোশাক পরা থাকতো বলে রবিদা তাকে ডাকতো মাদার টেরেসা বলে। মুনমুনের ছেলে তখন হয়তো সাত কি আট বছরের, আর মেয়েটা হয়তো পাঁচ। সেই শীতের ছুটির দিনগুলোতে তারা খেলতো আমার মেয়ের সঙ্গে। পারিবারিক সুখ, আনন্দ সেই বিশ্বদার বাড়িতে পেয়েছি, আর এখন পেলাম এই বাররি ফ্যামিলিতে।
জানুয়ারি মাসের গোড়ায় আমার ইউনিভার্সিটি খুলবে। আমার নতুন পিএইচডি প্রোগ্রামের ক্লাস শুরু হবে। এবারে নতুন এক যাত্রা হলো শুরু।
কিন্তু এখন আমার আর কোনো ভয় নেই। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস। উত্তরের ইংরিজি রপ্ত আগেই করেছিলাম, এখন এই মার্ক টোয়েনের দেশে এসে দক্ষিণের উচ্চারণও শিখে নিচ্ছি খুব তাড়াতাড়ি। এখানকার ড্রল, টেনে টেনে বলা ইংরিজি। সানুনাসিকতা আর একটু বোধহয় বেশি।
সেই যে তুষারঝড়কে আমরা ভেবেছিলাম হাস্যকর, কার্বনডেলে ফিরে এসে দেখলাম পশ্চিম টেনেসীর মাত্র একশো মাইল উত্তরেই দক্ষিণ ইলিনয়ে সে ব্লিজার্ড মারাত্মক আকার ধারণ করে পার্কিং লটগুলো দু ফুট আড়াই ফুট বরফে ডুবিয়ে দিয়েছে। তার মধ্যে আমাদের বাবা ভ্যালিয়েন্ট কোথায় যে ঘাপটি মেরে বসে আছেন!
শেষ পর্যন্ত খুঁজে বের করলাম তাকে। এই ভীষণ ঠাণ্ডায় চাকা বসে গেছে, আর ইঞ্জিনও।
নানা কসরত করে মালিশ টালিশ করে তার সংজ্ঞা ফিরিয়ে আনা হলো। তারপর গেলাম আমাদের সংসারের প্রথম গ্রোসারি করতে কার্বনডেল নামক খনিশহরের একমাত্র সুপারমার্কেট কান্ট্রি ফেয়ারে।
সেখানে গিয়ে আলাপ হয়ে গেলো বাংলাদেশের এক দম্পতি তেজেন সরকার আর তার স্ত্রী সীমার সঙ্গে।
নতুন স্কুলের প্রথম নতুন বন্ধু তারাই।
(চলবে...)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।