মেরিকামায়া সাতকাহন : নাদাকাভুকারেন, কানিনিত, ইয়ালাগালাওয়াড়ি, থাডা… এরা সব কারা?

আইএসইউ-এর আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীরা
“বিশ্বসাথে যোগে যেথায় বিহারো
সেইখানে যোগ তোমার সাথে আমারো।”
ম্যাথু নাদাকাভুকারেন, কানিনিত পুপাতউইবুল, ইয়ালাগালাওয়াড়ি গোবিন্দা রাও, থাডা ওয়ারারচাকুল, জিন সুন্ হান ...
এরা সব কারা?
হ্যাঁ, আমেরিকায় গত সাঁইত্রিশ বছরে হাজার দেশের হাজার মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। এদেশে না এলে সারা পৃথিবীর নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান যে কাকে বলে বুঝতেই পারতাম না। এবং তাদের নাম যে কত রকমের হতে পারে, তার সম্পর্কে কোনো ধারণাই হতো না। আমাদের দেশেও বিশাল বৈচিত্র্য আছে -- সেই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, আর কান্দাহার থেকে কামরূপ।
কিন্তু সারা বিশ্বের মানুষের বর্ণোজ্জ্বল সমাবেশ দেখতে আসতে হবে আমেরিকা। কিংবা ব্রিটেন।
যাই হোক, ব্রিটেন বা জার্মানিতে কখনো থাকিনি। যেখানে থেকেছি জীবনের অর্ধেকেরও বেশি, সে দেশটার কথাই বলি।
প্রত্যেকটা মানুষের নাম মনে আছে – অন্ততঃ যাদের সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়েছিল। অথবা, যাদের নাম কেবলমাত্র সেই নামটার জন্যেই আমার মনের মধ্যে চিরকালের মতো গেঁথে গেছে। এই নামের বিষয়টা চিরকালই আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে। অন্য একটা জগতে নিয়ে গেছে। কল্পনার জগৎ, ফ্যান্টাসির জগৎ।
মনে আছে, একেবারে ছেলেবেলায় – তখন হয়তো আমি স্কটিশ চার্চ স্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ি – আমার এক বন্ধু আর আমি খেলোয়াড়দের ছবি জমাতাম। মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মহামেডান স্পোর্টিং এসব ক্লাবের বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়রা – যেমন চুনী গোস্বামী, বলরাম, পিকে, সমাজপতি, অরুণ ঘোষ, নায়ীম, জন, থঙ্গরাজ, বলাই দে, রামবাহাদুর – এঁরা তো ছিলেনই আমাদের অ্যালবাম অর্থাৎ মুদির দোকান থেকে কিনে আনা খাতার পাতায়, তারপর ক্রিকেটে সোবার্স, হল, গ্রিফিথ, ব্র্যাডম্যান, ব্যারিংটন, কাউড্রি, ট্রুম্যান, পতৌদি, বেদী, প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর – এঁরা আলো করে থাকতেন আমাদের শৈশবে ও বাল্যকালে। তারপর হকির ধ্যানচাঁদ থেকে গুরুবক্স সিং থেকে গণেশ। আমেরিকা, রাশিয়ার বিখ্যাত অলিম্পিক অ্যাথলিটরা। সেই ছোটবেলার সোভিয়েত জিমন্যাস্ট ল্যারিসা লাতিনিনা থেকে কলেজে পড়ার সময়ে রোমানিয়ার নাদিয়া কোমানেচি। ভীষণ জটিল সব নাম আমার মনে থাকতো। সোভিয়েত নামগুলো তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে থাকতো। তাদের কুস্তি, ভারোত্তোলন, এসব। সাঁতারে আর দৌড়ে মার্কিনরা তো আছেই। অবশ্য তাদের নাম সবচেয়ে সহজ। যেমন, লং জাম্পে বব বীমন। সে সময়কার পূর্ব জার্মানির বিখ্যাত অ্যাথলিটরা। বক্সিংয়ে কিউবার থিওফিলো স্টিভেনসন। এসব নাম আমার এখনো কণ্ঠস্থ আছে।
সেই হাফপ্যান্ট পরার সময়ে আমার বন্ধু পৃথ্বীশ আমাকে বলেছিলো সালে নামক এক ফুটবল খেলোয়াড়ের আসল নাম। সত্যি মিথ্যে জানি না, কারণ আমাকে যা হোক একটা বলে বুঝিয়ে দেওয়া আর আমার চোখদুটোকে ছানাবড়ায় পরিণত করা সেই সময়ে খুব সহজ ছিল।
পৃথ্বীশ বললো, “সালের আসল নাম জানিস?”
আমি বললাম, “না! আসল নাম মানে কী?”
পৃথ্বীশ গড়গড় করে বলে গেলো, “পিতাম পারাম্বুল বাবাখান আব্দুল রাজ্জান খানজান সালে।” বলে, আমার দিকে তাকিয়ে একটা দিগ্বিজয়ী হাসি দিলো। যেন, এই নামটা দেওয়ার সব কৃতিত্ব ওরই।
তারপর পৃথ্বীশ একঝাঁক বন্ধুর সঙ্গে স্কটিশ ছেড়ে হিন্দু স্কুলে চলে গেলো। আর কখনো দেখা হয়নি জীবনে।
কিন্তু সেই নামটা মনে আছে এখনো।
পৃথ্বীশকে আমিও চমকে দিতে পারতাম এখন – কানিনিত পুপাতউইবুল, ইয়ালাগালাওয়াড়ি গোবিন্দা রাও, গেদালুপে ফার্নান্দেজ র্যামিরেজ দাভিলা কিন্তু উচ্চারণ হবে দাভিয়া, ইরানের সিমিন সাফারিপুর, কিংবা অনেক পরে শোনা বুত্রোস বুত্রোস-ঘালি এসব নাম বলে। ওর চোখ ছানাবড়া করে দেওয়ার অনেক উপকরণ এখন আমার কাছে রয়েছে।
কিন্তু কী করবো, দেখাই তো আর হলো না।
ডঃ ম্যাথু নাদাকাভুকারেন
দেখা হলো ডঃ নাদাকাভুকারেনের সঙ্গে। সংক্ষেপে সবাই যাকে বলতো ডঃ এন। আমেরিকায় যা দস্তুর। আমাদের দেশে যেমন অধ্যাপক সুনীল কুমার ভট্টাচার্য্য হয়ে যান এসকেবি, অথবা এই অধম সুন্দরবন কলেজে পড়ানোর সময়ে যেমন হয়ে গিয়েছিলেন পিবি স্যার, আমেরিকায় দেশের মতো ওরকম ভাবে নাম সংক্ষেপ করা হয় না। এখানে প্রথম অক্ষর। ডঃ এন – কারণ যারা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ওরকম ভীষণ একটা আসুরিক নামে পরিণত করতে পারে, তারা নাদাকাভুকারেনের নাম বলতে গিয়ে তিনবার ডিগবাজি খাবে, আর ছ’বার হেঁচকি তুলবে। তার চেয়ে ডঃ এন অনেক ভালো। সময়ও অনেক বাঁচে – আমেরিকায় সময় বাঁচানোটা জীবনধারণের একটা বিশাল অঙ্গ।
যদি হিসেব করে দেখা যায়, একজন ছাত্র বা ছাত্রী নাদাকাভুকারেনের পুরো নামটা দিনে পঁচিশ বার উচ্চারণ না করে ডঃ এন বললে কত মিনিট বাঁচে? ইয়ার্কি নয়!
আমাদের ক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি মিনিট সেভ। ডঃ এন শুধু যে আমেরিকায় আমার প্রথম চাকরি – অর্থাৎ সেই তিনশো আশি ডলারের মাসিক এ্যাসিস্টেন্টশিপের কাজ সুপারভাইজ করতেন তাই নয়। প্রতি সপ্তাহে আমাদের গ্রুপের মিটিং, কাজ বুঝিয়ে দেওয়া, খাতা দেখে জমা দেওয়া, অফিসে দেখা করা – এসব তো আছেই। তারপর তিনি আমার অবস্থা দেখে নিজের দায়িত্বে মুক্তিকে তাঁর ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপি ল্যাবে একটা বিনা বেতনের কাজের ব্যবস্থা করে দিলেন, শুধু যাতে ও দেশ থেকে এখানে চলে আসতে পারে। তখন তো প্রতিদিন হাজার বার তাঁর সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তাঁর বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে সেই ডঃ ওয়েবারের মতো একদিন ডিনার খাইয়ে দিলেন, আর তাঁর মার্কিন স্ত্রী এ্যান ও তাঁদের দুই মেয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। চমৎকার ফ্যামিলি।
ডঃ এন এবং ডঃ ম্যাকক্র্যাকেন এই দু’জন বোটানির অধ্যাপক ছিলেন, এবং আমার আমেরিকায় আসা নামক শিকে ছেঁড়ার পিছনে এই দু’জনের ষড়যন্ত্র ছিল বলেই আমার মনে হয়। সুতরাং, এই ষড়যন্ত্র করার জন্যে আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। পৃথিবীর দরজাটা খুলে দিলেন প্রথমে আপনারাই।
তারপর থাইল্যাণ্ডের একঝাঁক বন্ধু ও বান্ধবী হলো। আমি যেমন আমার বউকে দেশে ফেলে রেখে এসে মন খারাপ করে থাকতাম, কানিনিত তার স্বামী ও দুটো ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েকে দেশে রেখে এসে সেই একই অবস্থায় দিন কাটাতো। সুতরাং, আমার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হলো। আমাকে ওর বাড়িতে দুপুরবেলা ক্লাসের ফাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়ে কফি খাওয়াতো, আর আমার থেকেও বাজে ইংরিজিতে গল্প করতো। বা, বেশির ভাগটাই হাসতো।
কানিনিত পুপাতউইবুল
হাসি হলো সবচেয়ে ভালো আর সহজ ইউনিভার্সাল ল্যাংগোয়েজ। বিশ্বায়িত ভাষা। এস্পেরান্তোর থেকেও ভালো।
তবে, আমার মতো আমেরিকায় সারা জীবন থেকে যাওয়ার বাধ্যতামূলক অবস্থা ওর হয়নি। সেই রঞ্জনের প্রফেসর ব্রকম্যানের কাছে মলিকুলার বায়োলজির গবেষণা করে একটা ডিগ্রী নিয়ে কানিনিত পুপাতউইবুল দেশে ফিরে গেলো। তার আগে একবার হাজব্যান্ড আর বাচ্চাদের বেড়াতে নিয়ে এসেছে। শুনেছিলাম, ফিরে গিয়ে লপ বুরি না চন বুরি ঐরকম ভীষণ সুন্দর একটা জায়গায় সে সায়েন্সের ডীন হয়ে কাজ করছে। আমাদের আর এক থাই বান্ধবী আমাদের সে খবর জানিয়েছিল পরে।
সে বান্ধবীর নাম ছিল, হেঁচকি তুলবেন না -- লা-অ আম্পর্নপান।
কানিনিত আমেরিকায় হয়ে গিয়েছিলো নিট। লা-অ’র উচ্চারণ আমরা সহজ বিউটিফুল বাংলায় করে নিয়েছিলাম, হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন, লাউ। সে-ষড়যন্ত্র করেছিল আমাদের বাংলাদেশের একমাত্র আই এস ইউ প্রতিনিধি আবু হায়দার। যেন একটা উচ্চিংড়ে।
লাউ কখনো আপত্তি করেনি। নেহাতই সাধাসিধে সরল একটা মেয়ে। অনেক বেশি বয়েসে পড়তে এসেছিলো আমেরিকায়। ইংরিজি নিয়ে ভীষণ সমস্যা ছিল ওই কোরিয়ার মেয়ে জিন সুন্ হানের মতোই।
আমার ইংরিজি তখন হৈহৈ করে মার্কিনি রেসিং কারের মতো ছুটে চলেছে। ডিপার্টমেন্টের ছ’ফুট লম্বা মডেলের মতো মারাত্মক সুন্দরী ব্রেন্ডা আমার ওপর ঝুঁকে পড়ে বলতো, “ডু ইউ নো হাউ ফ্যাস্ট ইয়োর ডুইন ইট?”
ওর লম্বা সোনালী চুলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমি বলতাম, “রিয়েলি?”
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।