No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাংলার একমাত্র চিনা উপনিবেশের স্মৃতি আছিপুরের নামে

    বাংলার একমাত্র চিনা উপনিবেশের স্মৃতি আছিপুরের নামে

    Story image

    কলকাতা থেকে সামান্য দক্ষিণেই বজবজ। তার পাশে আছিপুর। নাম শুনলে মনেই হবে না, কতখানি ইতিহাস নিয়ে বসে আছে সে। যে-সে ইতিহাস নয়, বঙ্গভূমিতে চিনা সংস্কৃতির শিকড় গাঁথার ইতিহাস। এমনকি আছিপুরের ‘আছি’ও কোনো বাংলা, আরবি, ফার্সি তা তৎসম শব্দের অপভ্রংশ নয়। ঘোরতর চিনা প্রপার নাউন।

    পলাশির যুদ্ধের পর চিনের সঙ্গে কোম্পানির ব্যবসা জমে উঠল। রপ্তানি হওয়া প্রধান পণ্য আফিম। আঠারো শতকের গোড়ায় আফিম রপ্তানির কারবার ছিল ডাচদের হাতে। আঠারো শতকের শেষে সেই ব্যবসাতেও ইংরেজদেরই রমরমা। চিন থেকেও জাহাস আসে। জাহাজ ভেড়ে কলকাতাতেও। জাহাজের সঙ্গেই আসে চিনা মানুষরা। সবাই জাহাজের সঙ্গে ফিরে যায় না। এই অচেনা শহরই ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেবে ভেবে থেকে যায়। কেউ কেউ অর্থ-সম্পত্তির গুণিতক বাড়ানোর অ্যাডভেঞ্চার করতেও বাসা বাঁধে শহরের আশেপাশে। কলকাতা ও উপকণ্ঠে এক-দুই করে চিনাদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে।

    এমনই এক চিনা ভাগ্যান্বেষী টং আছু (Alias Yang Da Zhao) কলকাতায় নানলেন ১৭৭৮ সালে। সঙ্গে করে টাকা-পয়সা নেহাত কম আনেননি আছু। ইচ্ছে, এই নতুন ভূখণ্ডে জাঁকিয়ে বসবেন, পসার ফাঁদবেন। ধন-সম্পত্তি-নাম-প্রতিপত্তি বাড়বে। যেমনটা হয় আর কি। কিন্তু কলকাতায় নয়, আছুর নজর পড়ল গঙ্গাতীরের এক অন্য জায়গায়। বজবজের ছ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে। অনেকটা ফসলি জমি, ফাঁকা জায়গা। কলকাতাও খুব দূরে নয়। আছু হয়তো ভেবেছিলেন, পরে এখানেই নতুন নগর পত্তন করবেন। কলকাতা যেমন বিদেশিদের হাতে তৈরি শহর, তেমনই চিনাদেরও একটা শহর হবে বেশ। কিংবা, হয়তো ভেবেছিলেন কলকাতা থেকে দূরে ব্যবসা ফাঁদলে সাহেবদের নজরদারির প্রকোপ খানিক কমবে। স্বাধীনভাবে ব্যবসা করা যাবে। এসব আমরা অনুমানই করতে পারি কেবল। ইতিহাস উত্তর দেবে না আর।

    যাই হোক, আছু বুঝলেন এখানে জাঁকিয়ে বসতে গেলেও সাহেবদের সাহায্য লাগবে। তখন ওয়ারেন হেস্টিংসের আমল। আছু বিনীতভাবে জমি চেয়ে দরখাস্ত পেশ করলেন হেস্টিংস-এর কাছে। হেস্টিংসও ভাবলেন চিনা বিনিয়োগ এলে মন্দ কি? নতুন ব্যবসা মানেই খাজনা। তাছাড়া, উল্টে এতে কোম্পানি-চিন মৈত্রী আরো দৃঢ় হতে পারে। অতএব, ৫৬০ বিঘা জমি ফসলি জমি আছুকে দান করে দিলেন হেস্টিংস। এই ‘দান’-এর আড়ালে কোনো চিনা উপহারের গোপন গপ্প ছিল না কিনা অবশ্য জানা নেই। তবে, শহুরে চিনাদের মুখে মুখে ঘোরে একটা অন্য গল্প। হেস্টিংস যখন জানতে চাইলেন—কতখানি জমি লাগবে, তখন আছু দুহাত গোল করে গোটা জায়গাটা দূর থেকে দেখিয়ে বললেন—‘এই এত্তটা।’ সেইমতোই তাঁকে জমি দিলেন হেস্টিংস। প্রাপ্ত জমির আকার হল অনেকটা অশ্বক্ষুরাকৃতি। এই ঘোড়ার ক্ষুরের আকৃতি এরপর জড়িয়ে গেল কলকাতায় আগত চিনা সংস্কৃতির সঙ্গেও। সে কথায় পরে আসছি।

    আছুকে হেস্টিংস জমি দিয়েছেন শুনেই ছুটে এলেন বর্ধমানের রাজা। দাবি জুড়ে বসলেন—এই জমি তাঁর। হেস্টিংস সব শুনে আছুর জন্য বার্ষিক পঁয়তাল্লিশ টাকা খাজনা ধার্য করে দিলেন। আছু তাতেই রাজি। উর্বর জমিতে ফসল ভালোই ফলে। তাছাড়া তিনি ততদিনে ঠিক করে ফেলেছেন, এখানে চিনির কারখানা স্থাপন করবেন।

    কলকাতা বা আশেপাশে তখনো একটিও চিনি তৈরির পুরোদস্তুর কারখানা নেই। কারখানা স্থাপনের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছেন আছু। কারখানার জন্য শিক্ষিত শ্রমিক লাগবে। আছু সেই শ্রমিকের খোঁজে চিন গেলেন। জাহাজ-ভর্তি শ্রমিক নিয়ে ফিরলেন। সবার সঙ্গে চুক্তি রয়েছে, আছুর কাছেই থাকতে হবে যতদিন না কাজ শেষ হয়। বজবজের পাশের এই অঞ্চল তখন চিনা মানুষে গমগম করছে। বলা যেতেই পারে ছোটোখাটো চিনা উপনিবেশ। চিনিকল স্থাপিত হল। শ্রমিকদের যাতায়াতের সুবিধের কথা ভেবে আছুই নাকি প্রথম প্রচলন করলেন হাতে টানা রিক্সার। যে রিক্সার সঙ্গে কলকাতার এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক তৈরি হয়ে যাবে এরপর। এটিও নাকি এক চিনামানুষের উপহার। 

    জমি, ফসল, কারখানা—সব মিলিয়ে আছুর প্রতিপত্তি তখন বিরাট। তাঁর রমরমার খবর পৌঁছে গেল স্বদেশিদের কানেও। কলকাতায় তখন ধীরে ধীরে চিনাদের সংখ্যাবৃদ্ধি হচ্ছে। তাঁরা অনেকেই নাকি পলাতক নাবিক। আছুকে দেখে তাদেরও ইচ্ছে হল বড়োলোক হওয়ার। শুধু ভালো ইচ্ছে না, ঈর্ষাও। তাই, আছুর শ্রমিকদের ভাঙিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করল তারা। টাকার লোভে কাজও হতে লাগল। শ্রমিকরা একে একে সরে পড়তে লাগলেন আছুর কারখানা থেকে। গতিক বুঝে আছু সরাসরি চিঠি লিখলেন ‘গভর্নর জেনারেল’কে। সেই চিঠির মোদ্দা কথাটি হল—‘আপনাদের বদান্নতায় যে জমি হাতে পেয়েছি, তা নিয়ে এক সমস্যা শুরু হয়েছে। সমস্যার মূলে কলকাতার চিনা-সমাজ। এরা জাহাজ-পলাতক, ভবঘুরে, বেকার। এরা আমার কাজে বাধা দিচ্ছে, আমার শ্রমিকদের প্রলোভন দেখিয়ে কাজ ছেড়ে দিতে বলছে। এইসব শ্রমিকদের সংগ্রহ করতে আমার প্রচুর অর্থ-শ্রম ও সময় ব্যয় হয়েছে। আপনাদের সাহায্য না পেলে ব্যবসা রক্ষা করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হবে না।’

    কলকাতার চিনাদের নিয়ে আরেক চৈনিকের এহেন গুরুতর অভিযোগ পেয়ে নড়েচড়ে বসল কোম্পানি শাসক। তাঁদের সমর্থন আছুর দিকেই। ১৭৮১ সালের ৫ মে ‘গভর্নর জেনারেল’ এবং তাঁর পারিষদের নামে ঘোষণাপত্র প্রচারিত হল শহরজুড়ে। তাতে লেখা হল, কোম্পানি বাহাদুর আছু এবং তাঁর উদ্যোগে স্থাপিত চিনা উপনগরীটিকে উৎসাহ দিতে চান। তাই যে সব বদ চিনারা আছুর কাজে বাধা সৃষ্টি করছে, তাঁরা সংযত না হলে শাস্তি পাবে। 

    কোম্পানি বাহাদুরের নির্দেশে নিশ্চয়ই কাজ হয়েছিল। কিন্তু, সেই শান্তি বেশিদিন ভোগ করতে পারেননি টং আছু। তাঁর প্রিয় কারখানা, অশ্বক্ষুরাকৃতি জমি আর বিপুল স্বপ্নের মাঝেই তিনি মারা যান। খুব সম্ভবত ১৮৮৩ সালে। কিন্তু, আছুর স্মৃতিকে মুছে যেতে দেননি ওই অঞ্চলের চিনেম্যানরা এবং স্থানীয়রাও। আছুর প্রতিষ্ঠিত চিনা মন্দিরের পাশেই সমাধি দেওয়া হয় তাঁকে। আছুর পাওয়া জমির ঐ কিংবদন্তী অনুযায়ী সেই সমাধিও অশ্বক্ষুরাকৃতি। যে অশ্বক্ষুরের গড়ন এরপর স্থায়ী হয়ে যাবে কলকাতার চিনা-সমাজে। কলকাতার ছটি সমাধিক্ষেত্রেই দেখা মিলবে অশ্বক্ষুরাকৃতি সমাধির।

    ১৮০৪ সালে আছুর সম্পত্তি নিলামে উঠল। কিন্তু, আছুর তৈরি মন্দির আর সমাধি টিকে গেল। ততদিনে এ দেশের চিনাদের কাছে এই মন্দির অত্যন্ত পবিত্র স্থান। সেই মন্দির আজো আছে। চায়না টাউন, টেরিটি বাজারের জি হিং চার্চ এবং জি হিং ক্লাব এখন ট্রাস্টি এই মন্দির আর সমাধিক্ষেত্রের। মন্দিরে এখনো পূজিত হন আছু প্রতিষ্ঠিত দুই দেবতা—থুটি কুং আর থুটি ফো। স্থানীয় মানুষদের ধর্মবিশ্বাস, চিনা পুরাণ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এখানে। থুটি কুং আর থুটি ফো তাই হয়ে পড়েন ‘খুদা, খুদি’, কনফুসিয়াস আর দক্ষিণ রায় নাকি দুই ভাই। এমনই হয়তো হয়। দুটি ভূখণ্ড-পুরাণ-সংস্কৃতি এভাবেই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

    আছু-প্রতিষ্ঠিত চিনির কল আর নেই, সেই সাধের চিনা উপনগরীও নেই। এমনকি, আছুর প্রকৃত সমাধিকেও নাকি গ্রাস করেছে নদী। এখনকার সমাধিটা নাকি পরে তৈরি করা। যে সব চিনারা এখানে ভিড় করেন, তাঁরা এখন ভারতেরই নাগরিক। যদিও শিকড় খুঁজছেন প্রায় সবাই। শিকড়হীনতার যন্ত্রণা থেকেই ছুটে আসছেন আছুর মন্দিরে। সামান্য দূরের গঙ্গা, ওপারে উলুবেড়িয়ার নিকটস্থ দামোদরের সঙ্গম, দু’পাশের ঝোপ-ঝাড় সরিয়ে সরিয়ে খোঁজার চেষ্টা করছেন কলকাতায় চিনাদের সেইসব সোনার দিন। তার কিছুই আর অবশিষ্ট নেই প্রায়।

    শুধু, টং আছুর স্মৃতিকে বুকে চেপে ‘আছিপুর’ নামটি আজো বেঁচে আছে। বাংলার বুকে চিনাদের হয়ে উঠতে না পারা একমাত্র উপনিবেশের প্রতীকী নাম হয়ে। 

    তথ্যসূত্র: Basanta Kumar Basu, A Bygone Chinese Colony in Bengal, Bengal Past and Present, 47, 1934, শ্রীপান্থ, কলকাতা, https://en.m.wikipedia.org>wiki>Interment of Chinese Indians

    ছবি: ঋত্বিকা ব্যানার্জী

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @