No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    করোনা ভাইরাস – ভাইরাল রোগের অতি-ভাইরাল গুজবের বাইরে গিয়ে কিছু কথা

    করোনা ভাইরাস – ভাইরাল রোগের অতি-ভাইরাল গুজবের বাইরে গিয়ে কিছু কথা

    Story image

    প্রথমেই নামকরণ প্রসঙ্গে আসি। নাহ, করো ‘রোজা নমাজ’ বা করো ‘রাম নাম’ নয়, ‘করোলা’ বা ‘করুণা’ও নয়। ভাইরাস পার্টিকল হল জীব ও জড়ের মধ্যবর্তী বাধ্যতামূলক অন্তঃকোশীয় পরজীবী, যা জীবিত কোশের বাইরে অল্প কিছু সময়ের বেশি বেঁচে থাকে না, বা বলা ভালো সংক্রমণ ঘটানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এখন এই ভাইরাসের এহেন নাম কেন? সূর্যের বা অন্যান্য নক্ষত্রের চারপাশে প্লাজমা অবস্থার কোরোনা স্তর থাকে। ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে তোলা ছবিতে এই ভাইরাসকেও সেইরকমই দেখায়, তাই এই নাম। মানব মস্তিষ্কের একটা অংশ আর ডিম্বাণুর চারপাশের রশ্মির মতন এলাকার নামও একই কারণে করোনা রেডিয়াটা। আশা করি এখন ভাইরাসের এহেন নামের কারণ বোঝা যাবে। 

    ছবি ১- সূর্যের করোনা। এমনিতে আলোর ছটায় একে দেখা না গেলেও, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় এই প্লাজমা স্তরকে দেখা যায়। নাসার ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া ছবিটি। 

    কয়েকশ’র মতন করোনা ভাইরাসের মধ্যে সাতটিকে জানা গেছে মানব শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে। এরা মূলত উট, শূকর, বিড়াল আর বাদুড় এইসব স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে থাকে। কখনো ‘স্পিলোভার ইভেন্ট’ এর মতন মানুষে চলে এলেই শুরু হয় বিপত্তি। একবিংশ শতাব্দীতে তিন বার থাবা বসিয়েছে করোনা ভাইরাস। প্রথম ২০০২-তে চিনে। সার্স করোনা ভাইরাস বলে চিনেছি আমরা তাকে। সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম ঘটায় সে। ঠিক এখনও যেরকম হচ্ছে। ২০০৪-এ এই সংক্রমণ হারিয়ে যায়। আবার ফিরে আসে ২০১২-তে মার্স অর্থাৎ মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম নাম নিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাবা বসায় সে। এবার ২০১৯-এর ডিসেম্বরে ফিরে আসে নোভেল করোনা ভাইরাস নাম নিয়ে।

    যেকোনো নতুন ভাইরাসের সংক্রমণ বুঝলে চিকিৎসকরা সিম্পটোম্যাটিক আর সাপোর্টিভ চিকিৎসা চালানোর পাশাপাশি নমুনা পাঠান বিজ্ঞানীদের কাছে। এক্ষেত্রে রোগীর লালারস পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতে পাওয়া আরএনএ-কে দ্রুত সিকোয়েন্স করে তার লিপি উদ্ধার করে আগের করোনা ভাইরাসের সঙ্গে এলাইন করে মিলিয়ে দেখা হয়েছে কতটা মিল আর কতটা অমিল। তাতে অভিনবত্ব পেয়ে চট করে নাম দেওয়া হয়েছে নোভেল করোনা ভাইরাস। এরপরের দুই সপ্তাহে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন কীভাবে এই ভাইরাস সংক্রমণ ঘটায়, কোন পথে ঢোকে মানব কোশে, নিজের গায়ের কোন গ্লাইকোপ্রোটিনকে কীভাবে কাজে লাগায় সে। এতসব জেনে বুঝে তারপর সার্স-কোরোনা ভাইরাস-২ নামকরণ হল। 

    এরপর আসি ভ্যাকসিনের কথায়। আমার লেখা একটি রিভিউ আর্টিকল এক্ষেত্রে আমি উল্লেখ করব। নিচে দেওয়া লিংকে গেলে সেটি পড়া যেতে পারে। সেই আর্টিকলে যে চিত্রটি দেওয়া আছে, তাতে ভাইরাসটির গঠন সম্পর্কে  সম্যক ধারণা হয়ে যাবে। ভেতরের নিউক্লিক অ্যাসিডের বাইরে গ্লাইকোপ্রোটিনের অর্থাৎ সুগার-প্রোটিনের আবরণ রয়েছে। সেই আবরণে আছে হিমাগ্লুটিনিন এস্টারেজ উৎসেচক বানানোর প্রোটিন। অন্যান্য ফ্লু ভাইরাসের মতনই হিমাগ্লুটিনিন রয়েছে, যা কিনা আবার আমাদের লোহিত রক্তকণিকার গায়ে থাকা প্রোটিনের মতন একই গঠনের। ফলে ভ্যাকসিন বানাতে গেলে দুটি বিপদ রয়েছে। এক, আরএনএ ভাইরাস হবার কারণে খুব দ্রুত মিউটেশন হয়। আজকের ভ্যাক্সিন কালকে আর কাজে লাগবে না, যদি এর মধ্যেই ভাইরাসের প্রোটিনের গঠনে সেই মিউটেশন কোনো পরিবর্তন এনে দেয়। দুই, অটোইমিউনিটির সমস্যা থেকেই যায় নতুন ভ্যাকসিনে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে বানানো ভ্যাকসিন সুস্থ মানুষকে দেবার পর সে মানব শরীরের কোশকেই না আক্রমণ করে ফেলে। 

    তাই অন্যান্য সিম্পটোম্যাটিক আর সাপোর্টিভ চিকিৎসার পাশাপাশি, ব্রড স্পেক্ট্রাম এন্টিভাইরাল ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। অনেকে প্রশ্ন করছেন তাই, এইচআইভির ওষুধ এক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে কেন? তবে কি?! নাহ, এতে ঘাবড়ে যাবার কিছু নেই। ভাইরাস মানব কোশের ভেতরে থাকে, তাই তাকে মেরে ফেলার জন্য যে নির্দিষ্ট ওষুধ, তার নাম এন্টিভাইরাল ড্রাগ। ঠিক যেমন এন্টিবায়োটিক ব্যাকটিরিয়াকে মেরে ফেলার জন্য। এখন গনোরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক তো সাধারণ ফোঁড়ার চিকিৎসাতেও কাজে লাগানো হয়। সেখানে কি এত ভয় পান? নাহ, অতএব এখানেও পাবেন না। আজকাল চিকেনপক্সেও ডাক্তারবাবুরা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দেন। সেই ওষুধই এক্ষেত্রেও ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির মাধ্যমে চিকিৎসা করবার চেষ্টা চলছে, কিন্তু মোনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ডেভেলপ বা প্রয়োগে খুব কিছু আশার আলো দেখা যায়নি।

    এই রোগকে আটকাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্দেশ মেনে চললেই হবে। আবারও মনে করিয়ে দিই।

    ১। আজ অবধি কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি।
    ২। এই ভাইরাসে এক্সপোজ না হওয়াই এর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।
    ৩। এই ভাইরাস ক্লোজ কন্ট্যাক্টে ছড়ায়। রোগীর হাঁচি বা কাশি থেকে যে ড্রপলেট বের হয়, তার মাধ্যমে ভাইরাসটি সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
    ৪। সারাদিনে কিছু সময় অন্তর কুড়ি সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুতে থাকুন। বাইরে বেরোলে বা নতুন মানুষের সংস্পর্শে এলে তো বটেই। সাবান না থাকলে অ্যালকোহল জাতীয় স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোবেন। এই সাবান বা অ্যালকোহল ভাইরাসের গ্লাইকোপ্রোটিনগুলোকে নষ্ট করে ফেলে।
    ৫। ধাতব বা অন্য যেকোনো জিনিসে হাত কম রাখুন। আক্রান্ত মানুষের লালারস হাঁচি কাশির মাধ্যমে এইসব জায়গায় পড়লে অনেকক্ষণ সক্রিয় থাকে। হাত লাগলে আবার হাত ধুয়ে ফেলুন।
    ৬। আপনার হাঁচি কাশি হলে মাস্ক ব্যবহার করুন। চিকিৎসকের কাছে গেলে মাস্ক ব্যবহার করুন। আচমকা হাঁচি কাশি এলে টিস্যু ব্যবহার করুন, হাতের কাছে টিস্যু না পেলে কনুই-এর ভাঁজে হাঁচুন বা কাশুন। বাতাসে ড্রপলেট ছড়িয়ে দেবেন না। অহেতুক চোখ, নাক, মুখে হাত দেবেন না। ব্যবহৃত টিস্যু উপযুক্ত জায়গায় ফেলে দিন। 
    ৭। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকুন। নিজে সচেতন থাকুন। অন্যকে ভালো রাখুন। গুজবে কান দেবেন না। ঘরে বসে থাকুন। এটিই সর্বোত্তম উপায়।

    লিংকঃ https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4758313/

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @