No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মনোয়ারা বেগম : মুসলিম মহিলা মহলের প্রিয় গানবুবু 

    মনোয়ারা বেগম : মুসলিম মহিলা মহলের প্রিয় গানবুবু 

    Story image

    পূর্ব বর্ধমানের নবগ্রামে অজয় নদের অদূরে যে গ্রাম, সে গ্রামে ছোটবেলা থেকেই উদার, আনন্দদায়ক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন মনোয়ারা বেগম। মনোয়ারা বেগম নামটা হয়তো তেমন মেইনস্ট্রিম হতে পারেনি৷ এর নেপথ্যে নিশ্চিতভাবে কিছু কারণ রয়েছে৷ কারণ যাই হোক, বাংলা বিবাহের গীত নিয়ে আলোচনা হলে মনোয়ারা বেগমের নাম উচ্চারিত হওয়া উচিত৷ জীবনের নানা পর্যায়ে মুসলিম বিবাহের গানের চর্চা এবং বিস্তারে নিজেকে মেলে ধরেছেন তিনি৷ পরবর্তী প্রজন্মকে উদ্ধুদ্ধ করেছেন এই বিবাহের গানের সঙ্গে যুক্ত হতে।

    সংসারে বাবা, দাদু, নানাদের সময়ে বাহিরমহলে মনোরঞ্জন, বিনোদনের নানারকম মাধ্যম ছিল কবিগান, ফকিরি-দেহতত্ত্বের গান। এছাড়া সত্যপীরেরগান, লেটোগান, আলকাপ ইত্যাদি। মনোয়ারার মা খাতির সেখ, বাবা ইদ্রিস মোল্লা প্রমুখরা ছিলেন মঙ্গলকোট, আউসগ্রাম ব্লকের জনপ্রিয় লেটো শিল্পী। পরিবারের এই সংগীতের চর্চা মনোয়ারাকে অন্য জগৎ উপহার দিয়েছিল৷ দুখু মিঞা অর্থাৎ কাজী নজরুল ইসলামের প্রেরণায় লেটো আসর জমে ওঠে। তবে বাহিরমহলের আসর ছিল পুরুষদের দখলে। কিন্তু মহিলাদেরও তো বিনোদন এবং নিজস্ব ভাবনা প্রকাশের পরিসর লাগে। এই স্বাভাবিক প্রয়োজন থেকেই অন্দরমহলে পারিবারিক উৎসবে ধারাবাহিক ভাবে চলেছে বাঙালি মুসলিম নারীদের গীতি-প্রীতি-সংস্কৃতি। তাই ছোটোবেলা থেকেই বড়োদের গীত শুনতে শুনতে বড়ো হয়েছেন মনোয়ারা৷ শুনে শুনে গাওয়ার মাধ্যমে অজান্তে জড়িয়ে পড়েছেন বিয়ের গীতের কর্মকাণ্ডে। এরপর বড়ো হয়ে ভালোবাসার জায়গা থেকে নিজেরাই বিয়ের গীত গাইতে শুরু করেন৷ এই যাপনে ধ্বনিত হয়–

    “ওরা থাকে অন্দরে, 
    গান বাঁধে, সুর দিয়ে গান করে। 
    গান:-আমরা গীতগাহুনী বাঈ, 
    আমরা মনের সুখে গান গাই, 
    আমরা মনের দুখে গান গাই। 
    সভাজন, সেলাম জানাই।”

    শুধু নিজের পরিবারই নয়, মুসলিম প্রধান গ্রামগুলিতে বিয়ের আসরে অন্দরমহলে গীতের প্রচলন মনোয়ারাকে ভীষণ প্রভাবিত করে। পঞ্চম শ্রেণি থেকেই মাসি-পিসিরা ভার দিলেন গীতগুলির দু-ইলাইন করে রুলটানা খাতায় লিখে রাখতে। সেই হাতেখড়ি। পাশাপাশি তিনটে পাড়া– ল পাড়া, সেখ-মল্লিক পাড়া এবং মোড়ল পাড়া। তিনটি পাড়ায় গীতের প্রতিযোগিতা লেগেই থাকতো। একটা উৎসবমুখর হুজুগ। যেখানে মূল ব্যাপার হল – পরপর গান চলবে, ঢোল যেন না থামে।

    এভাবে পুরুষদের পাশাপাশি বংশপরম্পরায় মৌখিকভাবে অন্দরমহলবাসিনীদের উদ্যোগে গীতের প্রবহমানতা বজায় থেকেছে। পৃথিবীর সকল ধর্মসমাজের মধ্যে নারীদের বিবাহ গীতির প্রচলন আছে। বাঙালি মুসলিম সমাজ কীভাবে ব্যতিক্রম হতে পারে? গভীরে গিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে মুসলমান সমাজ গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধর্ম সমাজ থেকে আগত মানুষদের নিয়ে। এই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের জায়গা থেকে বাঙালি মুসলিম নারীদের উৎসবকেন্দ্রিক বিবাহগীতগুলি মূলত দুই ধারা দ্বারা পুষ্ট হয়েছে। যার একটি হল দেশীয় গীতের ধারা আর অন্যটি আরব-ইরানীয় ধারা। আনুমানিক ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের পর নব্য মুসলিমদের হাত ধরেই সমৃদ্ধ মিশ্রসংস্কৃতি হিসাবে বিয়ের গীতের চর্চার স্রোত প্রবাহিত হয়েছে। মুসলিম নারীরা সেই উত্তরাধিকার লাভ করেছেন তাঁদের মা, খালা, ফুফু, দাদি-নানিদের থেকে। বড়ো অমূল্য এই উত্তরাধিকার। সেদিনের যুবতী মনোয়ারা দাদি-নানিদের মুখেই শুনেছেন, “যে বিয়েতে ঢোল-গীত নাই, রসম নাই, সে বিয়ে ঘরে জান নাই। তাই সে ঘরে যাবার মনও নাই।”

    গীতের সহজ সরল সুর ও বাঁধন, ভাষা, কম কথায় ভাব প্রকাশ এই বিষয়গুলো মনোয়ারাকে আকৃষ্ট করেছে। নানা অভাব অনটনের মধ্যে দিনযাপন করেও মহিলারা গীত বেঁধেছেন, সুর দিয়েছেন, উৎসব বাড়িতে এসে গান গেয়েছেন, নাচ করছেন, সং বা কাপ্ পরিবেশিত হয়েছে। গানে গানে যত না খুশি, মজা, মশকরা থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে অতি আপনজনের কাছে পাওয়া– “অতি গোপন, না বলা বেদন!”

    পৃথিবীর সকল ধর্মসমাজের মধ্যে নারীদের বিবাহ গীতির প্রচলন আছে। বাঙালি মুসলিম সমাজ কীভাবে ব্যতিক্রম হতে পারে? গভীরে গিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে মুসলমান সমাজ গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধর্ম সমাজ থেকে আগত মানুষদের নিয়ে।

    গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে প্রতিবছর ১১ জ্যৈষ্ঠ  দুইদিন ধরে নজরুল জয়ন্তী পালন করা হত। নজরুলের কবিতা পাঠ আর নজরুল গীতি গাওয়া ছিল মনোয়ারার সাংস্কৃতিক চর্চামুখর শৈশব। নিজের মতো করে নাচতেন– প্রজাপতি প্রজাপতি...। কখনও রুমঝুম রুমঝুম...। পঞ্চম শ্রেণিতে পালিগ্রাম হাইস্কুলে ভর্তি হলেন মনোয়ারা। সেই প্রথম সরস্বতী পুজোতে রবীন্দ্রসংগীত গাইলেন, নাটকে অংশগ্রহণ করলেন। শুরু হল আরও বিকশিত হওয়ার পর্ব। সে যুগে একজন মুসলিম পরিবারের মেয়ে সরস্বতী পুজোয় রবীন্দ্রগান করছেন, স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন৷ এই উদাহরণ থেকে তখনকার ভিন্নভাবে ভাবার পরিসরের কথা জানা যায়৷

    শুধু গানবাজনাই নয়, অন্যান্য বিভাগেও মনোয়ারা ছিলেন নদীর মতোই উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত, বেগবতী৷ স্কুলে মেয়েদের কবাডি টিমে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি রক্ষণশীল পর্দানশীন করে রাখার বিপরীতে অন্য উদাহরণ পেশ করে। দৌড়, স্কিপিং ইত্যাদিতেও তিনি চৌকস ছিলেন৷ পিসির ঘরে ক্যারাম বোর্ড রাখা থাকতো দাদাদের। ছুটির দিনে ক্যারামও ছিল অবসরের সঙ্গী৷ আব্বার কাছে দাবা খেলা শিখে দাদাদের সঙ্গে বুদ্ধি শানানোর অভ্যাস চলতো। ডাংগুলি, সাঁতার কাটা, মার্বেল খেলাও খুব প্রিয় ছিল। পড়াশোনা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে বিকশিত হতে থাকলো মনোয়ারার ভাবনা। তিনি বুঝলেন জেনানাদের বিয়ের গীতগুলিকে কালচার বা সংস্কৃতি হিসাবে তুলে ধরা জরুরি। বিষয়টিকে নারীসংস্কৃতি বললেও অত্যুক্তি হয় না। মানোয়ারার মতে, “ভূমি বা জমিনের সঙ্গে জুড়ে থাকা দেশজ সংস্কৃতি, যা নারীরা রসম বা আচার হিসাবে লালন পালন করে আসছে সুদীর্ঘ সময় ধরে। নানান কৃষিজ উপকরণগুলি মাঙ্গলিক উপকরণ হিসাবে দেখি আমরা।”

    বিয়ের সময় গায়েহলুদ, হাতে মঙ্গল সুতো বা ধাগাবন্ধন, ক্ষীর-পিঠা-থুবড়া ভাত, মঙ্গল স্নান, মালাবদল, একঠাঁই এবং সব অনুষ্ঠানে মঙ্গলগীত। এসব সংস্কৃতিই তো হাজার বছর ধরে চলে আসছে বংশ পরম্পরায়। বিয়ের আসর বা আলমতলায় বিয়েরগান বাড়ির মহিলাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। তাদের মনোরঞ্জন, বিনোদনের নিজস্ব মঞ্চ, নাট্যশালা। এই বিবাহ বাসরে গানের আসর ভাবের আদানপ্রদানের ক্ষেত্র, তাদের আনন্দ নিকেতন, কল্পনার বিকাশ ভূমি। চলতি কথায়– জান জুড়ানোর জায়গা। সম্পর্কের টানাপোড়েনজনিত রক্তক্ষরণের মধ্যেও অঙ্কুরিত নানা ভাব পল্লবিত হয়েছে এই আলমতলার আসরে। তাদের সারাদিন সংসারের খাটা খাটনির পর সন্ধ্যার আকাশটুকু তারা নিজেদের মনের মাধুরী দিয়ে সাজাতে সুযোগ পেয়েছে। কল্পনার জানালা দিয়ে বাইরের আকাশকে দেখতে পেয়েছে বিয়ের গীতি কবিতা দিয়ে। সংসারে স্বামীর অবহেলা, শাশুড়ি-ননদের বাঁকা কথা, বাপের বাড়ির কথা ভেবে বিরহ গানের রূপ পেত। একাকীত্ব, বঞ্চনা, সুখ-শান্তির অভাবের প্রতিফলন শ্রোতাদের মোহিত করত। এরই সূত্র ধরে মহিলামহলে অনেক ক্ষেত্রেই আদিরসাত্মক চটুল কৌতুক-পরিহাস চলত। পুরুষদের আড়ালে জেনানাদের আড্ডায় নিজেদের মধ্যে নানান মশকরা এই গানে গানেই। বিয়ের গানগুলো তাদের কাছে শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং তা সামগ্রিক রূপ পেত। এখানে সমাজ বা পুরুষের কোনোরকম বিধিনিষেধের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এই চর্চার পরিসরে মেয়েরা স্বাধীন এবং অবাধ।

    সংসারে স্বামীর অবহেলা, শাশুড়ি-ননদের বাঁকা কথা, বাপের বাড়ির কথা ভেবে বিরহ গানের রূপ পেত। একাকীত্ব, বঞ্চনা, সুখ-শান্তির অভাবের প্রতিফলন শ্রোতাদের মোহিত করত। এরই সূত্র ধরে মহিলামহলে অনেক ক্ষেত্রেই আদিরসাত্মক চটুল কৌতুক-পরিহাস চলত।

    বিভিন্ন এলাকার বিয়ের গীতে আঞ্চলিক ভাষার প্রয়োগ রয়েছে। রয়েছে উত্তর এবং প্রতি উত্তরের নিজস্ব কৌশল৷ ধরা যাক পাড়া-প্রতিবেশীরা বলছেন, “দুলহন সাজাও আম্মা খুবসুরত করিয়া/ দামান আসিছে দেখি পাগড়ি নাড়িয়া।” এই পরিস্থিতিতে মা প্রতিবেশীদের উত্তর দিচ্ছেন গীতের আশ্রয় নিয়ে, “আসুক নারে পুতার দামান, চিন্তার নাই কিছু/ কামরঙা রং পাটি পিঁধে বেটি যাবে পিছু পিছু।” বরযাত্রী নিয়ে বর এসে পৌঁছালে, বর দেখে এসে বাড়ির মেয়েমহলে বরের রূপ বর্ণনা করার রেওয়াজও ছিল খুব স্বাভাবিক– “কোথায় গিলা পুতের মা/ দামান দেখো আইয়া/ রূপের বান ডাইকা দিল/ কত মিস্টি লইয়া।”

    বেতারের দৌলতে জনপ্রিয় গানের সুর প্রভাব ফেলত বিয়ের গীতে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শ্যামল মিত্রের ‘কী নামে ডেকে’ গানের সুরে তৈরি হয়েছে ‘বিয়ের গীত’ – “কী নামে ডেকে, বলব বিয়াইকে/ তোমার ছোটো মেয়ে দিবে আমাদের ঘরে।/ ঘড়ি নিব সাইকেল নিব/ নিব মাকুড়ি,/ বউ হবে ছোট পারা /খুব সুন্দরী....।”

    গানের মধ্যে উত্থাপিত হয় বাল্যবিবাহ, পণপ্রথার মতো সামাজিক প্রথার দিকটি। একটি মেয়ের জীবনে বাধা-নিষেধের ঘেরাটোপ এবং সেই বাধা পেরিয়ে তার কামনা-বাসনা, ব্যথা-বেদনার কিস্যা, তার অপূর্ণ স্বপ্ন, ইচ্ছের কথা যেমন এসেছে গানে, পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজে ঘটে চলা নানান ঘটনার প্রভাব পড়েছে এই গানগুলিতে৷ বিয়ের গানে প্রেমের কথা, স্বামীর ভিনরাজ্যে থাকা নিয়ে মনোবেদনার কথা নানাভাবে এসেছে। সরাসরি প্রকাশ না করলেও স্বামীসঙ্গ পাবার ইচ্ছে গানের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেছেন তাঁরা। পুত্র সন্তানের তুলনায় কন্যাসন্তানের প্রতি পারিবারিক অবহেলা এবং ‘গলার কাঁটা’ ভাবার মতো সাংসারিক দিকও সুরের ভাষায় মিশে গেছে। 

    বিবর্তনের নিয়মে বিয়ের গানের সুর, তাল, চলন বিভিন্ন অঞ্চলভেদে আলাদা হয়ে গেছে। কোনও গান হয়তো বহুদিন ধরে কোনও পরিবারে চলে আসছে, এখন সেই পরিবারের একটি মেয়ে বিয়ের পর অন্য কোনো গ্রামে, অন্য জেলায় গিয়ে সেখানকার প্রচলিত গানের সুরে তাঁর জানা পুরোনো গানের কথাগুলো বসিয়ে নিয়েছেন। মুখে মুখে গাওয়া আর মুখে মুখেই তৎক্ষণাৎ বেঁধে ফেলা এই গানগুলো তাই মৌখিক ঐতিহ্যের রীতি মেনে সুরে-ছন্দে-কথায় বদলে গেছে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে গানের শব্দ। সময়োপযোগী শব্দ বসিয়ে নিয়ে সেই অনুযায়ী গানের তাল আর সুরকে ভিন্ন আঙ্গিক দিয়েছেন বিয়েগাউনিরা। গানের মধ্যে বৈচিত্র্য এসেছে এভাবেই। কোনও কোনও গানে ব্যবহৃত হয়েছে সাধারণ প্রচলিত লোকবাদ্য, ছোটো ঢোল, ঘুঙুর ইত্যাদি। আবার কোথাও আচারের রীতি মেনে বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই গান চলেছে বিয়ের আসরে। 

    মুসলমান সমাজে গানবাজনাকে আপত্তিকর জিনিস হিসাবে ধরা হয়, এ বিষয়ে মনোয়ারার মত একটু ভিন্ন৷ তাঁর মতে এমন কথা ষাট বছর চলার জীবনে সামনে আসেনি। এ ব্যাপারে রসিকতা করে তিনি বলেন–

    “ছাগলে কি না খায়, 
    আর, পাগলে (থুড়ি!)
    হাম বড়াই পণ্ডিতে, 
    কী না কয়!”

    তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে, “ও সব কথা কোথাও বলা হয়ে থাকলেও যারা গান গাইবে বা শুনবে তারা বুঝবে।” হজরত মুহম্মদ-এর জীবন চরিত ‘হাদিস শরীফ’ থেকে জানা যায় একবার হজরত আয়েশা এক আনসারী সাহাবীর সঙ্গে তাঁর এক বান্ধবীর বিবাহ দিচ্ছিলেন। তখন প্রিয় হজরত নবী করিম বলেন, “বিবি আয়েশা, তোমাদের কাছে কি উৎসবের কোনো সরঞ্জাম নেই? আনসাররা তো গান পছন্দ করেন!” মনোয়ারার উল্লেখিত এই ঘটনা তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মেয়েদের শ্রমগান আনছে বিপ্লব, গান সংগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা শিক্ষিকা চন্দ্রা মুখোপাধ্যায়ের।

    বিয়ের গীতের সংগ্রাহক হিসাবে, আলমতলার আসরে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন শ্রেণির, বিভিন্ন বয়সের মহিলাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, তাঁদের সঙ্গে মেলামেশা মনোয়ারাকে সমৃদ্ধ করেছে৷ তিনি দেখেছেন সংসারে টিকে থাকার অদম্য লড়াইয়ের পথে নারী জীবনে সমাজের কাছে এক পরিচয়, ‘ওমুকের বউ’। নিজস্ব পরিচয়ের বড্ড অভাব৷ মেয়েদের বাঁধা নানা গানে উঠে আসে সেই সমাজ— “তুমি সুহাগন নারী,/ স্বামী আছে, তাই রাজরানি,/ মরলে স্বামী, তুমি ভিখারিনী।”

    কিংবা তালাকপ্তাপ্ত স্ত্রীলোকের পরিস্থিতি উঠে এসেছে গানের কলিতে, “তালাকুন নারী,/ সমস্যার হাঁড়ি।”

    হাজারো বিবাহ গীতের সংকলন পর্যালোচনা করে বলা যায়, নারী ব্যবহারের দিক থেকে দুই রকম। মেয়ে মানুষ এবং কাজের মেয়ে। মেয়েমানুষ ভাবলে নারী পরের উপার্জনজীবী হয়ে যায়। আর কাজের মেয়ে ভাবলে সে গানে গানে অনায়াসে বলতে পারে, “ভাত কি দেয় ভাতারে?/ ভাত দেয়লো গতরে।” অথবা, “হাতে আছে বিড়ির পাত,/ খাবো না লো ভাতারের ভাত।”

    মনোয়ারা মনে করেন পুরোনো গীতগুলির সংকলন দরকার। দরকার পুরোনো সুরগুলির সংরক্ষণ। বিয়ের গীত নিয়ে তথ্যচিত্র হলে এই আর্টফর্ম দলিল হিসেবে অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে থাকবে। গীতের যে ইতিহাস তা তুলে ধরতে মনোয়ারা বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে বিভিন্ন প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে স্কুলের ম্যাগাজিনে ‘ক্ষীরখিলানী গান’ নামে প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৯৩ সালে ‘মুসলিম বিয়ের গান’ বইটি প্রকাশিত হয়৷ ২০০৫ সালে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন৷ ২০০৭ সালে ডাক আসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য৷ মনোয়ারার উপস্থিতিতে বাঙালি মুসলমানের গীত বিষয়টি আলোচিত হয়৷ চেন্নাই-এর NFSC থেকে রিসার্চ প্রজেক্টে বিয়ের গান বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করার সুযোগ পান৷ এছাড়া বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তিনি বাঙালি মুসলিম বিয়ের গীত সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরেন৷

    গানের মধ্যে উত্থাপিত হয় বাল্যবিবাহ, পণপ্রথার মতো সামাজিক প্রথার দিকটি। একটি মেয়ের জীবনে বাধা-নিষেধের ঘেরাটোপ এবং সেই বাধা পেরিয়ে তার কামনা-বাসনা, ব্যথা-বেদনার কিস্যা, তার অপূর্ণ স্বপ্ন, ইচ্ছের কথা যেমন এসেছে গানে, পাশাপাশি বৃহত্তর সমাজে ঘটে চলা নানান ঘটনার প্রভাব পড়েছে এই গানগুলিতে৷

    তাঁর একাধিক বই এবং বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালিখির সুবাদে তিনি পান নতুন গতি পুরষ্কার। লেখার প্রশংসার একটি নমুনা তুলে ধরলে পাঠকরা সমৃদ্ধ হবেন— “বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ, যার বয়স ৭০০/৭৫০ বছর। তার ক্রম বিবর্তনের ধারাটি, তার গতিপ্রকৃতি, ক্রমবিকাশ, সমাজের বৈশিষ্ট্য, তার কাঠামো, তার মানসিক গঠন জানাতে সক্ষম হবে ৭০০ বছর ধরে মুখে মুখে প্রবাহিত হাজার হাজার এই মুসলমান নারীদের বিয়ের গানগুলি। এই সমাজ গড়ে ওঠার শুরু থেকেই দুই ধারা—দেশীয়, আরবীয় দ্বারা সমৃদ্ধ, স্ত্রীআচারের সাথে প্রায় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে এই বিয়ের গীতগুলি। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত গানগুলির মাধ্যমে ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’ — আদর্শটি পাঠকের সামনে ফুটে উঠবে। মুসলিম বিয়ের গীতের আসর থেকেই বা আলমতলার আসর থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি বা বলতে পারছি— আমরা না আরবের, না আরযের (আর্যের) – আমরা মানবের।”

    মনোয়ারা গীত গাউনী হিসাবে যাঁদের কথা স্মরণ করেন তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন মরহুমা সকিনা বিবি। তিনি নিজে গীত বাঁধতেন, সুর দিতেন এবং গাইতেন। এখনকার প্রজন্মের মধ্যে বিয়ের গীত নিয়ে আগ্রহ দেখেন? এ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনোয়ারা অনেকখানি হতাশ৷ তাঁর মতে– নতুন প্রজন্মরা তো মধ্য-উচ্চ শিক্ষিত। এ বিষয়টিকে বাঁচিয়ে রাখার দায় তাদের। তবে তা পালনের কথা তেমন শুনছি না। এর পাশাপাশি অনেকে ঝোলা কাঁধে গীত সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে গবেষণা সন্দর্ভ জমা দিচ্ছেন। এটা ভালো খবর।

    মনোয়ারা বেগম পরিচিত মহলে হয়ে উঠেছেন ‘গানবুবু’ (গানবিবি), অর্থাৎ গানদিদি নামে। নতুন প্রজন্মকে কাছে টেনে এখনও বিয়ের অনুষ্ঠানগুলিতে গানবাজনার চর্চা জীবিত রাখার চেষ্টা করছেন৷ সবাইকে নিয়ে গানবাজনার প্রয়াস শুধু গানের একটি ধারাকে জীবিত রাখেনি, বাড়ির মহিলাদের একত্রিত করার, মহিলা মহল গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করেছে৷ তাঁদের একা হয়ে যাওয়ার সমস্যার সমাধান খুঁজেছে৷ নারীদের বিভিন্ন সাংসারিক ঝামেলাও বড়ো দিদির মতো সামলে নিয়েছেন৷ আগলে রেখেছেন৷ এই যোগসূত্র তৈরি করেছে বিবাহের গীত। একসময় পোলিও খাওয়ানোর ব্যাপারে মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি হয়৷ সেই পরিস্থিতিতে পোলিও খাওয়ানো কেন জরুরি তা নিয়েও গান বেঁধেছেন মনোয়ারা৷ 

    সমাজ বদলেছে৷ বদলেছে বিনোদনের মাধ্যম৷ এখন চারপাশে ধুমধাড়াক্কা গানবাজনার চাহিদা বেশি, তার সঙ্গে বিয়ে গীতের অসম লড়াই। তবু হেরে যাওয়ার আগে হার স্বীকারের ব্যাপার নেই। নারীর জীবনের ব্যথা-বেদনা-হাসি-ঠাট্টা-কৌতুক উঠে আসতো যে বিয়ের গীতে তার গতি ক্রমশ রুদ্ধ হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার বিপরীতে আছেন এক বুবু– গানবুবু৷ মনোয়ারা বেগম নামে চেনা ছবি ভেসে ওঠে– ষাটের চৌকাঠ পেরোনো এক দিদি বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে নিজ দলবলকে উজ্জীবিত করে বিয়ের আসর মাতাচ্ছেন। বিভিন্ন উরুস এবং পরবে গান গাইছেন৷ জেনানাদের মর্মব্যথা ধ্বনিত্ব হচ্ছে শব্দে-সুরে। মনোয়ারা হয়ে উঠছেন একটা ধারা আগলে থাকা সৈনিক৷ বার্ধক্য তাঁকে কিছুটা হতোদ্যম করে তুললেও, বিবাহ গীতের প্রচারে তাঁর প্রাণশক্তি নতুন ভাষা পাচ্ছে। স্বীকৃতির ঊর্ধ্বে গিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন পাতা সংযোজিত হচ্ছে৷

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @