ফিরে এসেছে ‘মণির পাহাড়’

ব্যাঙ রাজকুমারী আর পিলিপ্কা-খোকনের আশ্চর্য গল্প। নিষ্কর্মা শেইদুল্লাই বা কম যায় কীসে! তারপর বেচারা ঘোড়াটা হয়ে উঠল মনিব। এইসব নিয়েই ছিল ‘মণির পাহাড়’। সে এক অলীক বই বটে। পাতায় পাতায় মণি-মুক্তো ছড়ানো। তেল ছলকে পড়া পৃষ্ঠায় ছাপা কাটা-কাটা খুদে অক্ষরগুলো দেখলেই কেমন কাঁটা দিয়ে ওঠে গায়ে। মলাটে কত্ত রং মেখে দাঁড়িয়ে দাড়ি-বুড়ো, রাজা-সং আর উড়ন্ত ড্রাগন। কেমন অদ্ভুত পোশাক তাদের। রাজপ্রাসাদগুলোও কেমন অন্যরকম দেখতে। হবে না? গপ্পগুলোই তো অন্য দেশের। আসলে অনেক দেশের। কিন্তু তখন যে তারা একসঙ্গে জুড়ে জুড়ে ছিল। সোভিয়েত দেশের রূপকথা যে এইসব। আমাদের আগের বেশ কয়েকটি প্রজন্মের শৈশব জুড়ে ছিল এই বই।
সুদূর রাশিয়ার মস্কো থেকে নানা বই তখন উজিয়ে আসত এই রাজ্যে। বাংলায় ছাপা বই, প্রকাশক রাদুগা পাবলিশার্স। সারা পৃথিবীর নানা দেশেই অসংখ্য ভাষায় নিজেদের সাহিত্যকে পৌঁছে দিত রাদুগা পাবলিশার্স। মস্কোর পাশাপাশি তাশখন্দেও তাদের শাখা ছিল। এইসব বইয়ের তালিকাতেই ছিল ‘মণির পাহাড়’। সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়নের রূপকথার সংকলন। ১৯৭৫ সালে বইটি নতুনভাবে সম্পাদনা করতে শুরু করেন অরুণ সোম। ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এই বই প্রকাশিত হয়েছে নিয়মিত। বাংলার ছোটোরা-কচি-কাঁচারা মুগ্ধ হয়েছে আশ্চর্য সব গল্পে। বুঁদ হয়েছে বইয়ের সজ্জায়।
তারপর সোভিয়েত ভেঙে গেল। এই বইও ছাপা বন্ধ হল। যে-কটি পুরোনো বই মিলত, তার ওপরেও ক্রমে ধুলো জমল। ইতিমধ্যেই বইটিকে ফের প্রকাশ করে বাংলাদেশের দীপ্র প্রকাশন। সেও অবশ্য বেশ কিছুদিন আগের কথা। কিন্তু কলকাতা তথা এপার বাংলার পাঠকরা এই বইয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিতই ছিলেন।
২৮টি বসন্ত পের করে এই বাংলায় ‘মণির পাহাড়’ফের প্রকাশিত হয়েছে সদ্য। প্রকাশকও বদলেছে। কলকাতার বৈ-চিত্র প্রকাশন নতুনভাবে ছেপেছে এই বই। যদিও প্রচ্ছদ একই রয়েছে, হুবহু এক রয়েছে ভিতরের অঙ্গসজ্জাও। এমনকি রাদুগা পাবলিশার্সের সেই কাটা কাটা বাংলা হরফের ছাঁদটাও অক্ষুণ্ণ এই নতুন বইতে। যেন সেই বইটাই ফিরে এসেছে আবার। নতুন করে। বেরোনোর পরপরই ফের সাড়া ফেলেছে ‘মণির পাহাড়’। ইতিমধ্যেই বিক্রি হয়ে গেছে বেশ কয়েক কপি।
দেশ ভাঙে, নতুন দেশ হয়। দেশের সঙ্গে ভাঙে যৌথতার স্বপ্নও। তা’বলে কি স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দেয় মানুষ? গল্প বলা ছেড়ে দেয়? রূপকথার স্বপ্ন-ঘোর তাই ঘিরে থাকে নতুন দেশের নতুন মানুষদেরও। আর পাহাড়-সমুদ্দুর পেরিয়ে সেইসব গল্পরা যখন এসে পড়ে নতুন দেশে, তারা দেখে সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে কত অগাধ বিস্ময়। বিস্ময়ের কোনো দেশ হয় না, কাঁটাতার হয় না, মৃত্যুও হয় না। মণির পাহাড় আরো বিস্ময় গড়ুক। আমাদের পরের প্রজন্মের কচি-কাঁচারা তাতে ডুব দিক। সে ডুবে মুক্তোর সন্ধান মিলবেই।
তথ্য-সাহায্য ও ছবি-ঋণ: পিনাকী গুহ খাসনবিশ