‘ম্যানগ্রোভ বিপ্লব’ এবার ঝড়খালি, রায়দিঘিতেও

বকখালির হেনরি আইল্যান্ডে চার হেক্টর জমিতে বিশাল চত্বরে বেড়ে উঠছিল প্রায় চার লক্ষ ম্যা নগ্রোভ চারাগাছ। দুজন বনকর্মী দিনরাত ব্যনস্ত ছিছেন রক্ষণাবেক্ষণের কাজে। গত কয়েক বছরের আচমকা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছিল বকখালির বেশকিছু অঞ্চল, কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল এই অঞ্চলের মানুষও। তাই ‘ম্যানগ্রোভ বিপ্লব’ যে আগামীতে যে কোনও বিপর্যয় মোকাবিলা করতে চমকপ্রদ পদক্ষেপ নেবে সে বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি নিশ্চিত এই অঞ্চলের বাসিন্দারাও।
বকখালির পর ম্যানগ্রোভ সাফল্যের বড়ো দৃষ্টান্ত হতে চলেছে ঝড়খালি ও রায়দিঘি। পরিসংখ্যান চমকে দিয়েছে নদীর দুই পাড়ের ম্যানগ্রোভের অফুরন্ত সবুজ। ঝড়খালির ৩০ হেক্টরেরও বেশি নদীসংলগ্ন পাড়গুলিতে আড়াই কোটি ম্যানগ্রোভ মাথাচাড়া দিচ্ছে উন্মুক্ত আকাশ ছুঁতে। পতিত চরাগুলিতে গতবছর থেকে দুটি পর্বে ম্যানগ্রোভ লাগানোর কাজ শুরু হয়েছিল ঝড়খালিতে। প্রথম পর্বের পরে দ্বিতীয় পর্বে বৃক্ষরোপণ সার্থক হয়েছে ৭০ হেক্টর জমিতে। অন্যদিকে রায়দিঘিতে আনুমানিক ৫০০ হেক্টর জমিতে যে ম্যানগ্রোভ চারা গতবছর রোপণ করা হয়েছিল তাদের রক্ষণাবেক্ষণ চলছে জোরকদমে। তাই নির্ধারিত সময়ের চেয়েও গাছগুলি বেড়ে উঠেছে দ্রুত।
রায়দিঘি বিধানসভার অন্তর্গত ঠাকুরানচড় ও নদীর দুই প্রান্ত ছাড়াও বনবিভাগের মূল লক্ষ্য ছিল মুদ্রাপুর-২ ব্লকের অন্তর্গত ভুবনেশ্বরী চর পর্যন্ত পাঁচকোটি ম্যানগ্রোভের বিস্তার। দু-তিন বছরের উদ্যোগের ফল মিলছে এখন।
রায়দিঘি বিধানসভার অন্তর্গত ঠাকুরানচড় ও নদীর দুই প্রান্ত ছাড়াও বনবিভাগের মূল লক্ষ্য ছিল মুদ্রাপুর-২ ব্লকের অন্তর্গত ভুবনেশ্বরী চর পর্যন্ত পাঁচকোটি ম্যানগ্রোভের বিস্তার। দু-তিন বছরের উদ্যোগের ফল মিলছে এখন। খেয়াল রাখতে হবে, এখানকার বেশিরভাগ অঞ্চলেই চর গ্রাস করে নিয়েছে নদী। প্রাকৃতিক নিয়মে নদীর এই খামখেয়ালিপনা বন্ধ করা না গেলেও বনবিভাগের কাজে সহায়ক হয়েছে সেই চর। কারণ নদীর বাড়তি চরগুলি ম্যানগ্রোভ চাষের আদর্শ জায়গা। বিশেষজ্ঞদের মতে এই মাটিতে ম্যানগ্রোভ গাছ বাড়ে দ্রুত গতিতে।
নিছক সৌন্দর্য নয়, সুন্দরবন-সহ উপকূলবর্তী জেলাগুলির প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হল ম্যানগ্রোভ অরণ্য। ২০২০ সালে আমফান, ২০২১-এর ইয়াসের মতো ঝড়ে বিপুল ক্ষতির হাত থেকে বাংলাকে বাঁচানোর পরই মুখ্যনমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত নেন, বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ অঞ্চলকে আরও বৃদ্ধি করা হবে৷ সেই সময়েই তিনি ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রকৃতিই রক্ষক’ নামে একটি প্রকল্পের কথা বলেন, পাশাপাশি প্রকল্পটি বাস্তবায়নে জোরও দেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই ইচ্ছাকে পরিপূরণের লক্ষ্যে গত দু’বছর ধরে দুই ২৪ পরগণা ও পূর্ব মেদিনীপুরে ম্যাানগ্রোভ লাগানোর কাজ চলেছে জোরকদমে। রাজ্য বন বিভাগের তরফে ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে জানানো হয়েছিল, নতুন রোপণ করা ম্যানগ্রোভের সংখ্যাটা আনুমানিক প্রায় ২০ কোটিরও বেশি। রাজ্যের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জানিয়েছিলেন, এই এত ম্যানগ্রোভ কীভাবে রোপণ করা হল, সেই অভিযান দেশের বাকি রাজ্যগুলিকেও বাংলাই শেখাবে। অন্ধ্র, ওড়িশা, গোয়ার মতো উপকূলীয় রাজ্যগুলিকে শেখাবেন বাংলার বন দফতরের আধিকারিকরা। পাশাপাশি থাকবেন বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রতিনিধিরাও।
রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলেও মনে করছেন উপকূলবাসীরা। এই মহাকর্মযজ্ঞে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ। বনবিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২১ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৫,৩৯,১৭৫টি শ্রমদিবস তৈরি হয়েছে ম্যানগ্রোভ চারারোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। এর মধ্যে বাসন্তী ব্লকে ৩৬,৪০০টি, ক্যানিং-১ নম্বর ব্লকে ৩১,৫২৫টি, জয়নগর-২ ব্লকে সেই সংখ্যা ১৬,২৫০ এবং কাকদ্বীপে ৬১,৬৬৫টি। এছাড়াও রয়েছে কুলতলি ব্লকে ৫৭,২০০টি, মথুরাপুর-২ ব্লকে ৭৯,৯৫০ টি, নামখানা ব্লকে ৮৪,৫০০টি, পাথরপ্রতিমা ব্লকে ১,১৪,৭২৫টি এবং সাগর ব্লকে ৫৩,৯৫০টি শ্রমদিবস তৈরি হয়েছে। সাফল্যের অবসরে প্রতিটি দিনের ব্যবধানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে গর্জন, বাইন, কাঁকড়া, বকুল-কাঁকড়া, ওটাং ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ প্রজাতি।
রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে বলেও মনে করছেন উপকূলবাসীরা। এই মহাকর্মযজ্ঞে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পেরেছেন অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ।
বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বিশ্বাস, বাংলার এই ম্যানগ্রোভ সাফল্য গোটা দেশের কাছেই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। পাশাপাশি এই সুরক্ষা ভবিষ্যৎকেও নিশ্চিত করবে। পরবর্তীকালে নদীর ভাঙনে লোকালয়ের কোনও ক্ষতি যেন না হয়, তারও আগাম রূপরেখা করে রেখেছেন বনবিভাগের আধিকারিকরা।
____
ছবি সৌজন্যে : বননিভাগ