No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ‘মন্দার’-এর শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি তিন ডাইনির বঙ্গীকরণ, ক্লাসিক সাহিত্যে জায়গা পেল গ্রামের ভাষা

    ‘মন্দার’-এর শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি তিন ডাইনির বঙ্গীকরণ, ক্লাসিক সাহিত্যে জায়গা পেল গ্রামের ভাষা

    Story image

    “কালের কোলে কপাল ফেরে, কেউ রাজা কেউ রাজার বাপ” — এমনই এক সংলাপ দিয়ে শুরু হয়েছিল অনির্বাণ ভট্টাচার্য পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘মন্দার’-এর ট্রেলার। যাঁরা শেক্সপিয়ার রচিত ‘ম্যাকবেথ’ পড়েছেন, তাঁরা জানেন মূল টেক্সটে ‘কাল’ অর্থাৎ সময় এবং ‘রাজা’ —এ দুটি খুবই তাৎপর্যবহ শব্দ। শেক্সপিয়ায়ের অন্যতম ডার্ক নাটক ‘ম্যাকবেথ’, যেখানে দর্শন এবং মনস্তত্ত্ব একে অপরের দ্বন্দ্বে উজ্জীবিত। গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রথম ‘ম্যাকবেথ’-এর অনুবাদ করেছিলেন বাংলায়। আর দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে এর আগেও বাংলায় ‘ম্যাকবেথ’ অবলম্বনে প্রচুর কাজ হয়েছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘স্বপ্নসন্ধানী’ থিয়েটার দলের অসামান্য প্রযোজনার কথা। এই তালিকায় নব্য সংযোজন হইচই ওটিটি-তে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মন্দার’ — যার প্রধান কাণ্ডারী একালের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য। উল্লেখ্য, এটিই অনির্বাণের প্রথম পরিচালিত কাজ। আর প্রথম কাজ হিসেবে তিনি অনেকাংশেই সফল। শুধুমাত্র দর্শকদের ভালোবাসা বা হইচই-এর সাবস্ক্রাইবার বাড়ছে বলে নয়, শিল্পের গুণগত মানের দিক থেকেও বাংলা ওটিটিতে এমন কাজ বিরল। উল্লেখ্য, মূল টেক্সট পুরোপুরি অনুসরণ করেনি এই সিরিজ।

    গল্পের পটভূমি গেইলপুর। সমুদ্রের ধারে এক প্রান্তিক নোনা গ্রাম। সেখানে মাছের ভেড়ির একচেটিয়া মালিকানা ডাবলু ভাইয়ের হাতে। তিনিই এই অঞ্চলের রাজা। ডাবলুর দুই বিশ্বস্ত অনুচর মন্দার আর বঙ্কা। বঙ্কার একমাত্র ছেলে ফন্টুস। অন্যদিকে ডাবলু ভাইয়ের ছেলে মোঞ্চা, এবং স্ত্রী-ও আছে। মন্দারের স্ত্রী লাইলি। যাঁরা ম্যাকবেথ পড়েছেন, তাঁরা চরিত্রগুলির অ্যাডাপটেশনের সঙ্গে মূল চরিত্রের মিল পাবেন অনেকটাই। রাজমুকুট ছিনিয়ে নিতে ডানকানকে খুন করেছিল ম্যাকবেথ। এই সিরিজেও একইভাবে ডাবলু ভাইকে খুন করে মন্দার এবং রাজপাট তুলে নিতে চায় নিজের হাতে। যদিও রাজার মুকুটই একসময় হয়ে উঠবে পথের কাঁটা। তাকে সরাতে মরিয়া চেষ্টা করলেও, ভবিতব্য খণ্ডাতে পারবে না কেউই। ম্যাকবেথ তাঁর স্ত্রী লেডি ম্যাকবেথের দ্বারা প্রভাবিত। এখানেও মন্দার প্রভাবিত হয় লাইলির দ্বারা। লাইলির বুদ্ধিতেই সে খুন করে ডাবলুকে এবং নিজের পথের কাঁটা বিস্তার করে নিজেই। তারপর শুধুই ফাঁদ আর ফাঁদ। খিদের ফাঁদ, যৌনতার ফাঁদ, ক্ষমতার ফাঁদ। ফাঁদের সে পথে কখনও চাপ চাপ রক্ত, কখনও ক্লেদ, কখনও লোভের হাতছানি।

    অনির্বাণ ভট্টাচার্য বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, এই সিরিজে থিয়েটারের অনেক অভিনেতাদের দেখা যাবে। লেখার সময় যাঁদের মুখ মাথায় এসেছে, তাঁদেরকেই নেওয়া হয়েছে।

    ম্যাকবেথের অন্যতম মুখ্য চরিত্ররা হলেন থ্রি উইচেস অর্থাৎ তিন ডাইনি। মন্দারে তিন ডাইনি তিন সংকেত রূপে কাজ করেছে। তিন ডাইনিকে অবলম্বন করে ‘ম্যাকবেথ মিরর’ নাটক মঞ্চস্থ হত কলকাতা তথা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ও রাজ্যে। সেখানে তিন ডাইনিকে সরীসৃপের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। ওরাই ইরা, পিঙ্গলা, সুষুম্না। অথবা বেতাল, পিশাচ এবং রাক্ষস। সাপের মতো এঁকে বেঁকে চলাই তাদের ধর্ম। কালের গর্ভ থেকে তারা কিলবিল করে বেরিয়ে আসছে। “বেতালস্য পিশাচস্য রাক্ষসস্য সরীসৃপা” — পরিচালক অনির্বাণের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রূপান্তর মনে হয়েছে এটিই। ‘মন্দার’-এ তিন ডাইনি হয়ে গেছে মা, ছেলে এবং পোষ্য বেড়াল কালা। তাঁদের সংলাপ, অভিব্যক্তি, চাহনি অস্বস্তিকর। তিন ডাইনির মজনু, পেদো এবং কালা এই সিরিজের সম্পদ। শুধুমাত্র তাঁদের অভিনয়ের জন্যই সিরিজের পাঁচটি পর্ব দেখে ফেলা যায়।

    আর ম্যাকবেথের চরিত্রেরা? অনির্বাণ ভট্টাচার্যের দক্ষতায় তারা হয়ে উঠল প্রান্তিক বাংলার। রাজনৈতিক নেতা মদন যখন বলেন, “কেস তো পঞ্চায়েতেই বড়োবাবু। শহরের পার্টির হেডলাইট জ্বলে। ইঞ্জিন গ্রামে।” — চমৎকারভাবে রাজনীতির একেবারে ভিতরের দিকটি চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন পরিচালক। মূল টেক্সটের বাইরে বেরিয়েও নতুন চরিত্র সংযোজন হয়েছে মন্দার-এ। তার মধ্যে অন্যতম মুকাদ্দর রূপী অনির্বাণ ভট্টাচার্য নিজেই। বাকি চরিত্রগুলির তুলনায় পুলিশ অফিসার মুকাদ্দর একেবারেই আলাদা। সে ধীর, শান্ত অথচ সাংঘাতিক খল। ম্যাকবেথ-এর বঙ্গীকরণে গ্রামের নোনাবালির পাড়ে থাকা চরিত্রেরা হয়ে উঠেছেঃ

    ম্যাকবেথ > মন্দার
    লেডি ম্যাকবেথ > লাইলি
    ডানকান > ডাবলু
    ডানকানের বড়ো ছেলে ম্যালকম > মোঞ্চা
    ম্যাকডাফ > মদন
    ব্যাঙ্কো > বঙ্কা
    ব্যাঙ্কোর ছেলে ফ্লিয়াস > ফন্টুস
    মূল টেক্সটে ডানকানের স্ত্রীর উল্লেখ ছিল না। এখানে সেই চরিত্রটি সংযোজিত হয়েছে।
    মূল টেক্সটে ম্যাকডাফের স্ত্রীকে এখানে বোন করে দেওয়া হয়েছে।

    শেক্সপিয়ারের ইংরেজি যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন, শেক্সপিয়ার একবার পড়ার বিষয় নয়৷ কারণ তাঁর শব্দচয়ন। অথচ কী অদ্ভুতভাবে এমন ক্লাসিক এক নাটককে অনির্বাণ ভট্টাচার্য নিজস্ব মুনশিয়ানায় প্রান্তিক ডাইলেক্টে পুনর্নিমাণ করে তুললেন। তাঁর গল্পের শ্রেণি হয়ে গেল একেবারে সমাজের নিচুতলার। ‘ম্যাকবেথ’ নাটক যেভাবে শেষ হয়েছিল, ‘মন্দার’ গতিপথে ভিন্ন আকার ধারণ করেছে। সমাপ্তির সঙ্গে একেবারেই মিল নেই। কীভাবে মন্দার শেষ হচ্ছে, তার জন্য মূল সিরিজটি দেখে ফেলতে হবে।

    তবে মন্দার যাঁদের জন্য শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকবে, তাঁরা হলেন— চিত্রগ্রাহক সৌমিক হালদার, মেকআপ আর্টিস্ট সোমনাথ কুণ্ডু, শুভদীপ গুহর আবহ, সংলাপ ভৌমিকের সম্পাদনা এবং সুব্রত বারিকের প্রোডাকশন ডিজাইন। আর যাঁদের কথা না বললেই নয়, তাঁরা এই সিরিজের অভিনেতা। সকলেই নিজস্ব চরিত্রে দুর্দান্ত এবং অভিনব। তবে আলাদা করে বলতে হয় দেবাশিস মণ্ডলের মন্দার হয়ে ওঠা পরতে পরতে দর্শকদের শিহরিত করবে। তাঁর চাহনি অপূর্ব। চোখের সেই দৃষ্টিতে অনেক কথা। সোহিনী সরকার শরীরী ভাষ্যে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন তাঁর চরিত্র। এছাড়াও দেবেশ রায়চৌধুরী, দিগন্ত সাহা, কোরক সামন্ত সকলেই অপূর্ব। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের চরিত্রটিও ভালো লেগেছে৷ তবে মুকাদ্দরকে মূল সিরিজে অতিরিক্ত বলে মনে হয়েছে। সে না থাকলেও মন্দার নির্মাণে অসুবিধা হত না। আলাদা করে এই চরিত্রটির তেমন কোনো তাৎপর্য চোখে পড়েনি, শুধুমাত্র নিজেকে বেড়ালের সঙ্গে তুলনা করা ছাড়া।

    চলচ্চিত্র দুনিয়ায় প্রি প্রোডাকশন এবং পোস্ট প্রোডাকশন নামক দুটি কথা আছে। প্রি প্রোডাকশনে মূল নির্মাণ নিয়ে ভালো গবেষণা থাকলে আর পোস্ট প্রোডাকশনে টেকনিক্যাল আর্টিস্টদের সহায়তা থাকলে কাজটি ভালোভাবে উৎরানো যায়। মন্দার-এর ক্ষেত্রেও তা সত্যি। অনির্বাণ ভট্টাচার্য অত্যন্ত যত্নসহ এবং গভীর পড়াশোনার মাধ্যমে যেভাবে ‘ম্যাকবেথ’-কে করে তুলেছেন প্রান্তিক সমাজের ভুখা পেটের মানুষ, তাঁর গল্পের প্রেক্ষাপট যেখানে প্রান্তিক একটি জনপদ, সেখানে তাঁকে কুর্নিশ জানাতেই হয়৷ কারণ তাঁর পড়াশোনা এবং গবেষণায় ছিল পরিশ্রম। বেশ কয়েকটি দৃশ্যের প্রপস ব্যবহার করা হয়েছে রূপক হিসেবে। মাছ আর বেড়ালের সম্পর্কের তীব্রতা ধরা পড়েছে খুব সুন্দরভাবে। আসলে এই পৃথিবীতে সবাই রাক্ষস। সবাই ক্ষুধার্ত। কারও খাবারের খিদে, কারও লোভের খিদে আবার কারও খিদে শরীরের।

    বাংলা ওয়েব সিরিজের দুনিয়ায় অনেকদিন রয়ে যাবে ‘মন্দার’-এর নাম এবং আগামিদিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ পাওয়া যাবে অনির্বাণ ভট্টাচার্যের থেকে, এই আশা বুকে নিয়ে আলোচনা শেষ করলাম। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ম্যাকবেথের “Fair is Foul, Foul is Fair” (Act 1, Scene 1)-এরই সম্ভবত বাংলা করেছেন রসিক অনির্বাণ, “পোঁদ ইজ কপাল, কপাল ইজ পোঁদ”।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @