ছক ভাঙা অনুবাদের দিশারী মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

দক্ষিণ আমেরিকার কিংবদন্তি সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গর্সিয়া মার্কেজ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৮২ সালে। তার অনেক আগেই ১৯৭০ সালে মার্কেজের সাহিত্যকীর্তি বাংলা ভাষায় অনুবাদের কাজ শুরু করেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়েলিজমকে তিনিই বাঙালিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
আসলে বাঙালিদের সামনে বিশ্বসাহিত্যের নতুন দিগন্ত খুলে দেন মানবেন্দ্র। একদিকে তিনি ছিলেন সাবলীল অনুবাদক। অন্যদিকে কথাসাহিত্যিক, কবি, প্রাবন্ধিক হিসেবেও কৃতিত্বের ছাপ রেখেছেন। অধ্যাপনার জগতেও ছিলেন প্রবাদপ্রতীম।
মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৮ সালের ২৫ এপ্রিল, এখনকার বাংলাদেশের সিলেটে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেন। তুলনামূলক সাহিত্য, ভারতীয় নন্দনতত্ত্ব ও ললিতকলার ইতিহাস ছিল অধ্যয়নের বিষয়। পড়ার জন্য পাড়ি দিয়েছিলেন পোল্যান্ডেও। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘদিন।
ছক ভাঙা অনুবাদক ছিলেন তিনি। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, এডগার অ্যালান পো, জুল ভের্ন, বরিস পাস্তেরনাক – বিদেশের কালজয়ী সাহিত্যিকদের অমূল্য সব কাজ আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। দক্ষিণ আমেরিকা, পূর্ব ইউরোপ থেকে দুর্লভ রত্ন আহরণ করে উপহার দিয়েছেন আমাদের। গদ্য এবং কবিতা ছাড়া নাটক অনুবাদেও তিনি সিদ্ধহস্ত। নানা দেশের সংস্কৃতিকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলার সহজাত দক্ষতা ছিল তাঁর।
শিশু সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য খগেন্দ্রনাথ মিত্র স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেছেন মানবেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে বিদ্যাসাগর পুরস্কারে ভূষিত করে। অনুবাদে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারেও সম্মানিত হয়েছিলেন। তাঁর সম্পাদনায় ‘আধুনিক ভারতীয় গল্প’ এক অতুলনীয় কীর্তি।
গতকাল করোনা ভাইরাস তাঁর প্রাণ কেড়ে নিল। বার্ধ্যকজনিত অসুস্থতার কারণে দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেরেও উঠেছিলেন প্রায়। তারপর সোমবার জানা যায়, তাঁর দেহে করোনা পজিটিভ। মঙ্গলবার রাত ৮টা নাগাদ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে বাংলার সংস্কৃতি জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।