দুবরাজপুরে পাহারা দিচ্ছেন মামা এবং ভাগ্নে

সমতলভূমির মধ্যে হঠাৎ গজিয়ে উঠেছে পাহাড়। চারদিক শান্ত, বিস্তৃত। লালমাটির সেই অঞ্চলের মানুষজন নিজেদের ‘পাহাড়ি’ বলতেই অভ্যস্থ। বীরভূমের দুবরাজপুর শহরের একপ্রান্তে এভাবেই ইতিহাস হয়ে উঠেছে ‘মামা ভাগ্নে পাহাড়’। আজকের পৌরসভা অঞ্চল দুবরাজপুর এককালে ‘জঙ্গল দুবরাজপুর’ নামে পরিচিত ছিল। কয়েক শতাব্দী আগে এই জনপদ ছিল সাঁওতালদের দখলে। জনবসতির ইতিহাস বলে, এরপর রাজনগরের মুসলিম রাজা, হেতমপুর রাজাদের হাত ঘুরে পাহাড়েশ্বর আসে দুবরাজপুরের শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ভূপানন্দ মহারাজের হাতে। মামা ভাগ্নে বীরভূম জেলার একমাত্র পাহাড়। ছোটো নাগপুর মালভূমির অন্তর্গত দুবরাজপুরের এই জায়গাটি বর্তমানে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে বেশ সুবিদিত। এই অঞ্চলের আশেপাশে কোথাও পাহাড় বা টিলা না থাকলেও ব্যতিক্রমী ভাবে এই বিক্ষিপ্ত অনুচ্চ টিলা ও প্রস্তরররাজি বহু পুরাণকথার জন্ম দিয়েছে। রাম যখন সীতা উদ্ধারে লঙ্কা যাত্রা করেন তখন হিমালয় থেকে সেতু বন্ধের পাথর রথে করে আনা হচ্ছিল। সেসময় কিছু পাথর পড়ে মামা ভাগ্নে পাহাড়ের জন্ম হয়েছে। অন্য একটি পৌরাণিক সূত্রে জামা যায়, দেবতা বিশ্বকর্মা মহাদেব শিবের আদেশে দ্বিতীয় কাশী নির্মাণ করছিলেন এক রাত্রির মধ্যে। সেইসময় পড়ে যাওয়া পাথর থেকেই সৃষ্টি হয় মামা ভাগ্নে পাহাড়। এই অঞ্চল সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর। হেতমপুর রাজবাড়ির কাছেই দুবরাজপুর। শোনা যায়, হেতমপুরের রাজাই প্রাচীন দুবরাজপুরের শাসক ছিলেন। চোখে পড়বে একটি পাথরের উপর আরেকটি পাথরের সজ্জারীতি, দেখলে মনে হয় কেউ প্রতিটি পাথর অন্যটির উপর অনেক চিন্তাভাবনা করে নিঁখুত ইমারত কৌশলীর মতো সাজিয়ে রেখেছে।
এক বর্গকিমি জুড়ে বিভিন্ন মাপের বিভিন্ন আকৃতির, বেশিরভাগ গোলাকার গ্রানাইট পাথর, তাদের অদ্ভুত নিঁখুত সজ্জারীতি, পাথরের ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন ছোটোবড় লতাপাতার জঙ্গল, আঁকাবাঁকা উচুঁনিচু পাথরের খাঁজের ভিতর দিয়ে পায়ে হাঁটা লাল রাস্তা, নিঃশব্দ পরিবেশের মধ্যে পশুপাখির বিচিত্র ডাক, পাহাড়ি রাস্তায় পায়ে হাঁটার শব্দ সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়া। বাংলার অন্যান্য পাহাড়গুলি থেকে আপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেবে।
মামা ভাগ্নে পাহাড়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পাহাড়েশ্বরী যোনী পিঠ। এবড়োখেবড়ো পাথর দিয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রাকৃতিক বেদী। বেদীতে সিঁড়ি করে দেওয়া হয়েছে। তার একদিকে কংক্রিটের ছোট্ট একটি কালীমন্দির, স্থানীয়দের কাছে তিনি মা শ্যামাঙ্গী বলে পূজিত হন। প্রাকৃতিক যোনী চিহ্নের উপরে দুটি পাথর গলা জড়াজড়ি করে আছে। একটি পনেরো ফুট অন্যটি বারো ফুট। স্থানীয় লোকজনদের মুখে মুখে তারাই পরবর্তীতে বড় পাথরটি মামা আর ছোটটি ভাগ্নে হিসাবে পরিচিত হয়েছে।
আরও পড়ুন
যে নদীকে জয় করা যেত না একদিন
বোলপুর থেকে দুবরাজপুর মামা ভাগ্নের দূরত্ব মোটামুটি এক ঘণ্টার। তাই যারা বীরভূমের লাল কাঁকুড়ে মাটির গন্ধ ভালোবাসেন, তারা অবশ্যই মামা ভাগ্নে ঘুরে আসতে পারেন একবার। সেখানকার সবুজ শান্ত পরিবেশ আপনাকে পাগল করবেই। ইতিহাস কিংবা মিথ এখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রাচীন শিবমন্দিরটির সংস্করণ কড়া হয়েছে। পর্যটকের ভিড় বাড়াতে এই অঞ্চলের ছেলেদের অযথা ভিড় এবং মদ্যপান বন্ধ করার দিকে নজর দিচ্ছে দুবরাজপুর পৌরসভা।
বীরভূম মানেই গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম আর শীতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। এই হেমন্ত থেকেই মামা ভাগ্নে চত্বরে হালকা শীতের আমেজ পাবেন। অত্যন্ত স্বল্প খরচে আপনি ঘুরে আসতে পারবেন দুবরাজপুরের মামা ভাগ্নে পাহাড় থেকে। বোলপুর থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে যেতে সময় লাগবে মাত্র ৪৫ মিনিট। এছাড়াও রয়েছে ট্রেন বা বাসের সুবিধা। তাহলে এই হেমন্ত বা শীতে একবার ঢুঁ মেরেই আসুন বীরভূম জেলার দুবরাজপুরে। সেখানকার মামা এবং ভাগ্নে আপনাকে আপন করবেই।