লোকাল ট্রেনেই ম্যাজিক বোনেন জাদুকর বিপ্লবকুমার

চন্দ্রবিন্দুর ‘চ’, বেড়ালের ‘তালব্য শ’, রুমালের ‘মা’? হল চশমা?” লোকাল ট্রেনে এমন অবশ্য হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু, এমনটাই হয়। পায়ের তলায় নেই কোনো সুসজ্জিত মঞ্চসজ্জা, হাতে নেই অর্থবহুল যন্ত্র-সরঞ্জাম, সামনের সারিতে নেই ঝাঁ চকচকে পোশাকের দর্শকমণ্ডলী। আছে শুধু ভিড়ে ঠাসাঠাসি যাত্রীবোঝাই এক ট্রেনের কামরা। তারই মাঝে হাতের জাদুতে ‘হ য ব র ল’-র স্বপ্নময় দেশ তৈরি হয় রোজ। তৈরি করেন যাদুকর বিপ্লবকুমার। তারপর মুগ্ধ যাত্রীদের হাতে সামান্য টাকার বিনিময়ে তুলে দেন ম্যাজিকের বই। কোনোটার দাম ১০ টাকা, কোনোটা বা ২০ টাকা। বলাই বাহুল্য, বইগুলোর লেখক বিপ্লবকুমার স্বয়ং।
হকারের হাঁক মূলত যাত্রীরা চেনে মূলত বাদাম, ছোলা, ঠাণ্ডা জলের বোতল, মৌসম্বি, পেয়ারা বা গামছা-ইত্যাদি দিয়েই। কিন্তু, যাত্রী-বোঝাই ট্রেনে যখন একজন হকার বলে ওঠেন- “ঢপের কীর্তনে মানুষ ঠকে। আমরা যেগুলোকে মনে করি যাদু-তন্ত্র-মন্ত্র; আসলে সেসব বুজরুকি। একটু বুদ্ধি খাটালে আপনাকে দেখেও শিক্ষিত মানুষ চমকে উঠতে পারে। একটা কাজ করুন। একটা খালি দেশলাই বাক্সের গায়ে লেগে থাকা বারুদ একটা ব্লেড দিয়ে চেঁচে এক টাকার কয়েনে জমা করুন। এবার একটা দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে বারুদটা পুড়িয়ে দিলে দেখা যাবে বারুদটা ছাই হয়ে আঠার মতন কয়েনে আটকে গেছে। এবার আপনার কাজ হচ্ছে যে, ওই ছাইটাকে গোপনে হাতে ভালোভাবে মেখে নিয়ে হাতটা ঝেড়ে ফেলা যাতে কিছু বোঝা না যায়। এবার আপনি আপনার বন্ধুকে বলুন- ‘দেখ আমার হাত ফাঁকা। আমার ভেতরে এমন এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে যে কোনো শর্তে আমার হাত থেকে আগুন বেরোবে। আপনার বন্ধু যখন বলবে- ‘তা আবার হয় নাকি?’, কোনো তর্কে যাবেন না। ভড়ংবাজির একটা মন্ত্র উচ্চারণ করে হাতটা ডলা দিন। আপনার হাত পুড়বে না, গরম লাগবে না, অথচ আপনার হাত দিয়ে ধোঁয়া বেরোবে। আর এটা দেখে আপনার বন্ধুর তখন হাওড়া টু শিয়ালদা। আর এরপরেই আপনি হাসতে হাসতে বলুন, ‘ধ্যাত্তেরিকা! এ আর কী দেখলি! জানিস আমার আরেকটা ক্ষমতা কী করকম? তুই দাঁড়া। তোর চুলে হাত দেব, তোর চুল পুড়ে যাবে! দেখবেন বন্ধু পালাচ্ছে।’’-- তখন স্বভাবতই আপনার সমস্ত আকর্ষণের ভরকেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় ওই বিশেষ মানুষটি। বিপ্লবকুমার। চলতি ট্রেনে কয়েন ভ্যানিশ কিংবা ফাঁকা বাক্সে প্যাসেঞ্জারের রুমাল থেকে গামছা বের করা-- এসবে মেতে থাকে আপ-ডাউনের সমস্ত লোকাল। শিয়ালদহ থেকে বারাকপুর, হাসনাবাদ, বনগাঁ বা সাউথের গড়িয়া-- যখন যে ট্রেনে মন চায় উঠে পড়েন তিনি। পাড়ায় বা অনুষ্ঠানে ম্যাজিক শো-ও কম আসে না তার। তখন তিনি গায়ে চাপিয়ে নেন ছন্দনাম-- ‘ম্যাজিশিয়ান ম্যাগনেট’।
বয়স ৫০। বাড়ি উত্তরপাড়া। ‘কীভাবে এই লাইনে আসা?’- উত্তরে বিপ্লব বাবু জানান, ছোটবেলা থেকেই যাদুবিদ্যা তাঁকে টানত। হতদরিদ্র গরীব পরিবারে জন্মানোর দায়ে তাঁকে আসতে হয় হকারি লাইনে। প্রথম প্রথম তিনি ট্রেনে ম্যাজিক দেখাতেন। খুশি হয়ে যাত্রীরা হাতে ধরিয়ে দিত টাকা। একদিন বুম্বাদা নামের একজন চকলেট বিক্রেতা তাঁকে টেনে নামায় স্টেশনে। বুদ্ধি দেয়, ম্যাজিক দেখানোর পাশাপাশি ম্যাজিকের বই বিক্রির। কিন্তু, বিপ্লব তখনো ভালো কথা বলা রপ্ত করে উঠতে পারেনি। তাই বুম্বাদা আর বিপ্লবের যৌথভাবে এই কাজে নামা। বুম্বাদাই কথা বলত, বই বিক্রি করত আর বিপ্লব দেখাতেন ম্যাজিক। তাঁরা তখন বিক্রি করতেন লিটন ম্যাজিশিয়ানের লেখা ‘মডার্ন ম্যাজিক শিক্ষা’ নামের বই। এরপরে বুম্বাদা অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেও বিপ্লব কিন্তু একদিনের জন্যও থেমে থাকেনি। ট্রেনের মধ্যে একদিন বিপ্লবের সঙ্গে পরিচয় ঘটে গেল এক প্রকাশকের। তিনি বিপ্লববাবুকে বললেন নিজেই একটা বই লিখতে। এবং এও জানালেন, তিনি নিখরচায় সেই বই প্রকাশ করবেন। লিখেও ফেললেন বিপ্লব দা। ‘তপন পুস্তকালয়’ থেকে বেরোল তাঁর প্রথম বই ‘সচিত্র ম্যাজিক শিক্ষা’। এরপর নিজের লেখা বই নিয়ে সেই যে দাপিয়ে বেড়ানো শুরু হল ম্যাজিশিয়ানের, আজও তার গতিবেগ একমাত্রাও কমেনি। তিরিশ বছর ধরে ছুটন্ত ট্রেনে ম্যাজিশিয়ানের ম্যাজিক যেন ছুটেই চলেছে।
আরও পড়ুন
অভিনব কুলিং জ্যাকেট তৈরি করল বাংলার রূপম
শুধুমাত্র আর্থিক কারণেই নয়, কুসংস্কার, মন্ত্র-তন্ত্রের বুজরুকির বিরুদ্ধে লড়াই-ও এই পেশা বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ। বিপ্লবকুমার সত্যের পূজারী। মন্ত্র-তন্ত্রের মধ্যে নিহিত সত্যটাকে তুলে ধরতেই নিরন্তর ট্রেন বদল তাঁর। ইতিমধ্যে লিখে ফেলেছেন প্রায় দশটি বই। যার মধ্যে ‘যাদুর আড়ালে বিজ্ঞান’, ‘সত্যি কি অলৌকিক’, ‘মানুষ চেনার চাবিকাঠি’ অন্যতম। বিপ্লবকুমারের যাদুবিদ্যা এককালে মুগ্ধ করেছিল যুক্তিবাদী প্রবীর ঘোষকেও। ‘অলৌকিক নয় লৌকিক’ গ্রন্থের ১৭৯ পাতায় প্রবীরবাবু লিখেছেন বিপ্লব বাবুর যাদুবিদ্যার মাহাত্ম্য। ছাপোষা এই হকার ম্যাজিশিয়ানকে দেখে বোঝাই যায় না কত গুণীর কদর আছে তাঁর প্রতি।
বই বিক্রি শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য নয়। ‘বিজ্ঞান+বুদ্ধি= ম্যাজিক’ বইতে তিনি লিখেছেন যে, এই বই-এর মাধ্যমে তিনি এক সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিতে চান। তাঁর কথায় “আন্দোলনের তিনটি দিক (ক) ওঝা গুনিনদের মানুষের দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে বুজরুকি চালানো বন্ধ করা, (খ) অলৌকিক ও সাপ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা দূর করে সকলকে সচেতন করা, (গ) মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে প্রতিটি গ্রামীণ হাসপাতালে সার্বিক সুচিকিৎসার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা।”
অর্থাৎ, নিছকই একজন যাদুকর নন বিপ্লবকুমার। কিন্তু, তিনি নিজেকে ম্যাজিশিয়ান বলতেই ভালোবাসেন। বাংলার লজঝরে লোকাল ট্রেনের এই ম্যাজিশিয়ান আসলে মফস্বলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ম্যাজিকগুলোর গল্পও বলে চলেন রোজ। ম্যাজিক শো’এর টিকিট হয়ে ওঠে ‘অ-মূল্য।