ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : সময়-অসময়

লোকে বলে, ‘Be Careful…Veracruz is intoxicating...’ গালফ অফ মেক্সিকোর উপকূলবর্তী, ছবির মতো সুন্দর শহর ভেরাক্রুজে (Veracruz) আমাদের জাহাজ নোঙর ফেলেছে আজ দুদিন হল। ১৫১৯ AD-তে Hernan Cortes এই বন্দরে পৌঁছে প্রবল যুদ্ধের পরে ধূলিস্যাৎ করেছিলেন পরাক্রমশালী অ্যাজটেক (Aztec) সাম্রাজ্য। তারপর শত শত বছর ধরে ভেরাক্রুজের আকর্ষণে এখানে যুদ্ধে নেমেছিলেন ফ্রান্সিস ড্রেক (Francis Drake), লরেন্ট ডি গ্যাফ (Laurent De Gaff), উইনফিল্ড স্কট (Winfield Scotte)- এর মতো বাঘা বাঘা নৌ সেনাপতিরা। আজও ভেরাক্রুজের (Veracruz) পথে দেখা যায় তাদের স্মৃতিসৌধ আর পরাক্রমের নিদর্শন।
ভেরাক্রুজের (Veracruz) প্রায় ২০০ কিমি উত্তরে রয়েছে এল তাজিন (el tajin) আর্কিওলজিক্যাল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। ৮০০ থেকে ১৫০০ AD অবধি এইখানে ছিল টোটোনাকান (Totonacan) মানুষদের রমরমা শহর এল তাজিন (el tajin)। দুই ধারে বয়ে যাচ্ছে নদী, চারপাশ পাহাড়ে ঘেরা, বন্দরের বেশ কাছাকাছি এই শহর ছিল টোটোনাকান মানুষদের প্রাচুর্যের অভিজ্ঞান। প্রত্নতাত্ত্বিকরা মাটি খুঁড়ে প্রায় ১৫০টা ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করেছেন যা দেখলে সেই সময়কার মানুষদের জীবন-যাপনের ছবি চোখের সামনে খানিকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ভেরাক্রুজের প্রায় ২০০ কিমি উত্তরে রয়েছে এল তাজিন আর্কিওলজিক্যাল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। ৮০০ থেকে ১৫০০ AD অবধি এইখানে ছিল টোটোনাকান মানুষদের রমরমা শহর এল তাজিন। দুই ধারে বয়ে যাচ্ছে নদী, চারপাশ পাহাড়ে ঘেরা, বন্দরের বেশ কাছাকাছি এই শহর ছিল টোটোনাকান মানুষদের প্রাচুর্যের অভিজ্ঞান।
তা গতকাল কাকভোরে আমরা, ছাত্র ও শিক্ষক মিলিয়ে ৬০ জন মানুষ বাস ধরলাম এল তাজিন (el tajin) অভিমুখে। ভেরাক্রুজের (Veracruz) আবহাওয়া এখন অনেকটা কলকাতার ডিসেম্বরের গোড়ার দিকের মতো। তাই ভোরবেলা ব্যাগ গোছানোর সময় ক্যামেরা, জলের বোতল, রোদ-চশমা, আর একটা আপেলের (apel-er) সাথে সাথে কী মনে করে মায়ের দেওয়া নস্যি রঙের মাফলারটাও পুড়ে ফেললাম। কলকাতা ছাড়বার সময় মা ওই মাফলারটা আমার ব্যাগে গুঁজে দিয়ে পই পই করে মা বলেছিল যে বস্টনে প্লেন থেকে নেমে আমি যেন মাথায়, গলায় মাফলার জড়িয়ে তবে কার পার্কে গিয়ে বরফের মধ্যে গাড়ি খোঁজাখুঁজি করি। জাহাজে আসার সময় বাড়ি থেকে নিজের বালিশের ওয়ার আর ব্যক্তিগত তোষকের সাথে সাথে বাড়ির কথা, মায়ের কথা মনে পড়ানো মাফলারটাও নিয়ে এসেছিলাম সঙ্গে করে। অতএব ব্যাগবন্দি হয়ে নস্যি রঙের মাফলারও চলল আমার সাথে এল তাজিন (el tajin) দর্শনে।
ভেরাক্রুজ বন্দর
বেশিরভাগ ছাত্র আর শিক্ষক দেখি পাতলা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরে এসেছে। তাদের কাছে বস্টনের ডিপ ফ্রিজের পরে ভেরাক্রুজ (Veracruz) হল রোদে বড়ি শুকোতে দেওয়া। বিশাল সবুজ রঙের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের ঠিক সামনের আসনে বসলাম। এর সুবিধা হল যে বাস চললে যেমন পাশের দিকটা দেখা যায়, তেমনি সামনের বিশাল কাচ দিয়ে আগামীকে দেখা যায় সকলের আগে। বাস ছুটলো ভোরের ভেরাক্রুজ ছাড়িয়ে উত্তরমুখে। জাহাজঘাটা, হোটেল আর দোকানপাট ছাড়িয়ে সামনের উইন্ডস্ক্রিনে দেখতে পেলাম এক ঘন সবুজ প্রান্তর, দিকচক্রবলে নীলচে পাহাড়ের প্রকার আর পাশের জানালা দিয়ে দেখলাম মধ্যবিত্তের ঘর-গেরস্থালি। ছোটো ছোটো রংচঙে একতলা বাড়িগুলোর মাথায় কালো প্লাস্টিকের জলের ট্যাংক আর সামনে এক চিলতে করে বাগানে লাল হলুদের ছোপ লাগানো ফুল গাছ। আমাদের হাসিখুশি গাইড জানালো তার নাম মি. মেস্কিকো (Mr. Mexico)। শুনেই প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে আমার মাথায় ঘুরতে লাগলো ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ সিনেমা আর শ্রীদেবীর ‘হাওয়া হওয়াই’ গানটা। যাই হোক, আরও জানলাম যে আমাদের টাই আর জ্যাকেট পরা মাঝবয়সী ড্রাইভারের নাম স্পিডি গঞ্জালেস (speedy Gonzales)! সে নামের মাহাত্ম্য বজায় রেখে গম্ভীর মুখে, বেশ সরু, পাহাড়ি রাস্তা ধরে ভয়ানক জোরে গাড়ি চালাতে লাগলো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একটা ছোটো পাখি হঠাৎ উড়ে এসে আমার ঠিক নাকের ডগায় উইন্ডস্ক্রিনে ঠাস করে আত্মাহুতি দেওয়াতে আমি দারুণ চমকে গিয়ে কিছুক্ষণ মি. মেক্সিকোর নানান খুঁটিনাটি নির্দেশাবলিতে আর কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না!
যে পাহাড়ি পথ ধরে আমরা যাচ্ছিলাম তার দুই পাশে ঘন আখের ক্ষেত। মি. মেক্সিকো জানালো যে, এখানে প্রচুর চিনির কারখানা আছে। শস্যশ্যামলা পাহাড়ে ঘেরা এই অঞ্চলে নানা রকম ফসল ফলে, যার মধ্যে অগ্রগণ্য হল আখ, কলা, নারকেল, কমলালেবু, ভুট্টা আর ভ্যানিলা। বিস্তীর্ণ আখের ক্ষেত, ভুট্টার ক্ষেত, হলদে আর কমলা রঙে ছোপানো কমলাবন, ফলফলন্ত কলা গাছের জঙ্গল আর দামাল হাওয়ার সাথে খেলতে থাকা নারকেল সারির পাশে আমাদের ডানদিকে মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছিলাম গভীর নীল ছোপানো গালফ অফ মেক্সিকোকে আর বুঝতে পারছিলাম কেন লোকে বলে, ‘Be Careful…Veracruz is intoxicating..’
যে পাহাড়ি পথ ধরে আমরা যাচ্ছিলাম তার দুই পাশে ঘন আখের ক্ষেত। মি. মেক্সিকো জানালো যে, এখানে প্রচুর চিনির কারখানা আছে। শস্যশ্যামলা পাহাড়ে ঘেরা এই অঞ্চলে নানা রকম ফসল ফলে, যার মধ্যে অগ্রগণ্য হল আখ, কলা, নারকেল, কমলালেবু, ভুট্টা আর ভ্যানিলা।
অবশেষে প্রায় ঘণ্টা পাঁচেক পরে পৌঁছালাম এল তাহিনের (El Tahiner) ভগ্নস্তূপে। এর মধ্যে একটা ভারী সুন্দর ছায়া ঘেরা মেক্সিকান রেস্তোঁরায় আমরা দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়েছি। সেখানে অনেকে খরগোশের মাংস খেল রসিয়ে কষিয়ে। আমি আমার বাগানে বাসা বাধা খরগোশটার কথা মনে করে স্নেহপরবশ হয়ে মুরগির বংশনাশ করলাম। এল তাহিনে (El Tahine) ফার্নান্ডো বলে পনিটেল বাঁধা একজন ছিপছিপে চেহারার মানুষ আমাদের গাইড হলো আর সে বলতে লাগলো সেই ভগ্নস্তূপের কাহিনি। রাজরাজাদের কথা, দেবদেবীদের কথা, চাষবাসের কথা, ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা, সাধারণ মানুষের কথা আর নরবলির কথা। দেব-দেবীদের সন্তুষ্ট রাখতে এই এল তাহিনের (El Tahin) শহরে নরবলির প্রথা প্রচলিত ছিল বহু বছর ধরে। তাহিন (Tahin) মানে বজ্র। গলফ অফ মেক্সিকোতে কুণ্ডলী পাকানো ঝড় হারিকেন, বজ্র আর বিদ্যুৎকে সারথি করে ঝাঁপিয়ে পড়তো এই শহরের বুকে। তখন দেবতাদের তুষ্ট করতে পুরোহিতেরা একজন সর্বগুণসম্পন্ন নিখুঁত পুরুষকে বলি দিতেন। বলির সময় এক অদ্ভুত কমলা রঙের ক্যাকটাসের শাঁস খেতেন তারা মত্ত হবার জন্য। সেই ক্যাকটাসের নাম পায়তো (Payato), যা এখনও টাকিলা মদে মেশানো হয়ে থাকে। কমলা রঙের ক্যাকটাসের স্বাদে অসম্ভব নেশাগ্রস্ত সেই সর্বগুণসম্পন্ন নিখুঁত পুরুষটির গলার নলি কেটে রক্ত দিলে তবে নাকি ক্ষান্ত হতেন দেবতারা। এল তাহিনের (El Tahiner) ধ্বংসস্তূপরূপে সেই নরবলির মঞ্চ। পাথরে খোদাই করা বলির চিত্র দেখে নীল পাহাড় থেকে নেমে আসা হাওয়াতে বড়ো শীত শীত করছিল। ব্যাগ থেকে নস্যি রঙের মাফলারটা বার করে গলায় জড়ালাম কী মনে করে।
এছাড়া দেখলাম দ্য ফ্লাইট অফ দা ভোলাডোরস (The Flight of the Voladores)। ভোলাডোরস মানে উড়ন্ত মানুষ। পাঁচজন আদিবাসী মেক্সিকান একটা খুব লম্বা পোলের ওপরে স্রেফ দড়িতে ঝুলে বাজনার সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম কসরত দেখালো। এত উঁচু থেকে ঝুলে থাকা মানুষগুলোকে দেখে সত্যিই মনে হচ্ছিল তারা মাধ্যাকর্ষণকে উপেক্ষা করে শূন্যে উড়ে বেড়াচ্ছে বোধ হয়।
অবশেষে, সব দেখেশুনে আবার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে জাহাজঘাটায় ফেরা। পথে সন্ধে ঘনিয়ে রাত নামলো। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। বাসের স্টিয়ারিং হুইলে গম্ভীর মুখে টাই পরিহিত স্পিডি গঞ্জালেস (Speedy Gonzales)... চারিদিকে ঘন অন্ধকারে ডুবে রয়েছে নারকেল বনের পাশে গলফ অফ মেক্সিকো, হলদে কমলা রঙের ছোপানো কমলাবন, ফলফলন্ত কলা গাছের জঙ্গল আর ভুট্টার ক্ষেতগুলি। চোখের সামনে সরু পাহাড়ি রাস্তায় উল্টো দিক থেকে আসা ট্রাকের হেডলাইটের আলো ঝলকে উঠছে শুধু। হঠাৎ অবাক হয়ে দেখলাম চারিদিকে অদ্ভুত কমলা রঙের আভা। মি. মেক্সিকোকে শুধোলাম সেই আলোর কথা। সে বলল, চাষিরা আখের খেতে আগুন ধরিয়েছে। আখ প্রায় বছরখানেক সময় নেয় সর্বাঙ্গসুন্দর আর নিখুঁত হতে। আর সেই এক বছরে আখের জঙ্গলে নানা সাপখোপ, পশুপাখি বাসা বাঁধে। চাষীরা তাই নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট এলাকায় আগুন জ্বালে আর নির্দিষ্ট সময়ে নিভিয়ে ফেলে। এতে করে আখ কাটতে তাদের অসুবিধে হয় না, আর আখগুলিও পুড়ে যায় না। অনেকটা মাড়ি সাপ, না ভাঙি লাঠি গোছের ব্যাপার আর কি!
ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে... সরু রাস্তায় আমরা স্পিডি গঞ্জালেসের অঙ্গুলিহেলনে। নিকষ কালো অন্ধকারে দুইপাশে দাউ দাউ করে জ্বলছে আখের বন। কমলা রঙের নেশায় বুঁদ হয়ে রয়েছে আকাশ। সর্বগুণসম্পন্ন নিখুঁত ফসল কাটার প্রস্তুতি চলছে। কেমন অদ্ভুত শৈত্যে মরা নিস্তব্ধতা... আর আমার মাথা, গলা, বুক জুড়ে... নস্যি রঙের মাফলার...
“কলঙ্কে রেখোনা কোন ভয়
এমন কলঙ্ক নেই যা দেহের চেয়ে বড়ো
এমন আগুন নেই যা আরও দেহের শুদ্ধি জানে
তুমি আমি কেউ নই, শুধু মুহূর্তের নির্বাপন
আমাদের ফিরে যেতে হয় বারেবারে
দেশে দেশে ফিরে ফিরে ঘুরে যেতে হয়
পরস্পর অঞ্জলিতে রাখি, যত উদ্যত প্রণয়
সে তো শুধু জলাঞ্জলি নয়... তারই বীজে
অসম্ভব তৃতীয় ভুবন এক জেগে ওঠে আমাদের ভেঙে
তাই এখানে নেমে আমাদের দেখা হল সমুদ্রের পর্যটনতটে
দুপুরের মতন দীর্ঘ উড়ে যায়, মেঘাচ্ছন্ন দিন
তোমারও শরীর আজ মিলে যায় সমুদ্রের রঙে
আমাদের দেখা হয় আচম্বিতে ভূমধ্যসাগরে...”
ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে... সরু রাস্তায় আমরা স্পিডি গঞ্জালেসের অঙ্গুলিহেলনে। নিকষ কালো অন্ধকারে দুইপাশে দাউ দাউ করে জ্বলছে আখের বন। কমলা রঙের নেশায় বুঁদ হয়ে রয়েছে আকাশ। সর্বগুণসম্পন্ন নিখুঁত ফসল কাটার প্রস্তুতি চলছে। কেমন অদ্ভুত শৈত্যে মরা নিস্তব্ধতা... আর আমার মাথা, গলা, বুক জুড়ে... নস্যি রঙের মাফলার...
রোদ্দুরে মাখামাখি ভেরাক্রুজের টুরিস্ট ডক ছেড়ে এসেছি প্রায় ৭২ ঘণ্টা হল। সব দড়িদড়া আলগা করে পরিচিতির সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে ভেসে যাবার ভেতরে একটা সন্ন্যাস ভাব আছে। F0106 কেবিনের বাইরে এক চিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভেরাক্রুজকে দিকচক্রবলে হারিয়ে ফেলতে ফেলতে এই কথাটাই মনে হচ্ছিল বারবার। নীল গোলাপি পুঁতির মালা, চুরুটের দোকান, জুতো পলিশের স্টল, দারুণ ঝাল মাছের ঝোল আর কাগজি লেবু, কারুকার্য করা খোসা ছাড়ানো আম... সবকিছু পেছনে ফেলে আবার যাত্রা শুরু নতুন গন্তব্যে।
এ কদিন যে সব ছাত্ররা আমাদের ক্লাস করেছে আজ তাদের পরীক্ষা ছিল। তাই গতকাল থেকে একটু বেশি রকম ব্যস্ততার ভেতরে কেটেছে। সন্ধেবেলা দুর্বল ছাত্রদের সাথে বসে পড়াগুলি আর একবার ঝালাই করে নেওয়া, প্রশ্নপত্র, ফটোকপি; আমার সাগরেদদের পাখিপড়া করে নির্দেশাবলী বোঝানো এবং সর্বোপরি পরীক্ষার খাতা দেখে অফিসের বাইরে নোটিশ বোর্ডে ফলপ্রকাশ।
ছাত্রদের পরীক্ষা
বিকেল নাগাদ একটু ফুরসত পেতে দেখা হল নার্স প্যাটি লাফানের (Patty Laffan) সাথে। প্যাটির স্বামী বিল লাফান (Bill Laffan) এই জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার। স্বামী স্ত্রী দুজনেই একই জাহাজে ভেসে চলেছে তবে যেহেতু এটা কর্মক্ষেত্র তাই তারা আলাদা কেবিনে থাকে। বিলের কেবিন সর্বদা হাট খোলা থাকে। দিন নেই রাত নেই জাহাজের কোন কলকব্জা বিগড়োলেই তার ঝক্কি সামলাতে হয় বিল ও অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারদের। আর অসুখ-বিসুখ যেহেতু দিনক্ষণ বিচার করে আসে না তাই প্যাটিকেও সজাগ থাকতে হয় অষ্টপ্রহর। অতএব এহেন কর্মী-মৌমাছি জীবনে ঠিক দাম্পত্য ধর্ম পালন করা যায় না... অতএব জাহাজের অন্যান্য ছয়শোটি মানুষের মতো প্যাটি আর বিলও এ যাত্রায় সন্ন্যাস ধর্ম অবলম্বন করেছে। প্যাটি থাকে একাকিনী আমার দুটো কেবিন পরেই। প্যাটি আমাকে দেখে বলল, “Bani..do not forget to set your clock forward by an hour today..” ভাগ্যিস মনে করালো, আমি তো সময়ের কথা ভুলেই গেছিলাম একেবারে!
সমুদ্রের ভেসে বেড়ানোর একটা মুশকিল হচ্ছে যে সময়-অসময় সদা পরিবর্তনশীল। ভেরাক্রুজ পৌঁছাবার আগে ক্যাপটেনের নির্দেশে আমরা প্রত্যেকে কব্জির ঘড়িতে সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে নিয়েছিলাম। অর্থাৎ গতকাল যে সময় বিকেল পাঁচটা বেজেছিল আজ বাজবে বিকেল চারটে। যাদের অবস্থানে স্থিতি নেই তাদের সময়ের স্থিতি থাকবে কী করে! তখন তো আমরা দারুণ খুশি হয়েছিলাম এক ঘণ্টা বেশি ঘুমোতে পারবো বলে... আজ আবার পরিবর্তন। আজ যখন বিকেল পাঁচটা আগামীকাল ঠিক তখন সন্ধে ছটা বাজবে। এক ঘণ্টা কম ঘুমোনো হবে এই আর কি! মধ্যিখানে যতই রদবদল, লম্প-ঝম্প করো না কেন ফাইনাল ট্যালিতে ঠিক হিসেব মিলিয়ে নেওয়া হবে কড়ায় গন্ডায়।
প্যাটির সাথে কথা সেরে বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। সন্ধে নামছে, গালফ অফ মেক্সিকোতে। কমলা আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে ঢেউ। দিন এবং রাত্রির এক আশ্চর্য সন্ধিক্ষণে স্থিতিশীল অবস্থান অতিক্রম করে সময় অসময়ের মধ্যবর্তিনী আমি...
“মাঝে মাঝেই বুকের মধ্যে ঝনকে ওঠে
এখন এই পড়ন্ত বেলায়
জানলাতে মুখ রেখে দেখি, দূরে-কাছে
আকাশ জুড়ে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে আছে
মন বসে না কোনো কাজে কোনো খেলায়
মাঝে মাঝেই বুকের মধ্যে ঝনকে ওঠে
এখন এই পড়ন্ত বেলায়।
বুঝি না ঠিক কীসের জন্য এতটা পথ
এমন করে ছুটে এলাম
বুঝি না ঠিক কার বিরুদ্ধে এত যুঝি
এই ধুলো-জঞ্জালের মধ্যে কাকে খুঁজি,
উড়িয়ে দিয়ে সকল পুঁজি কাকে পেলাম
প্রশ্ন জাগে কীসের জন্য এতটা পথ
এমন করে ছুটে এলাম...”
চলবে...
___
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।