No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : চিরসবুজ

    ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : চিরসবুজ

    Story image

    গত পর্বের পর

    ই নিয়ে বার্বাডোসে দ্বিতীয়বার এলাম। তিন বছর আগে আমাদের জাহাজ নোঙর ফেলেছিল ব্রিজটাউনে। ঝাপসা মনে ছিল একটা মস্ত ক্রুইস টার্মিনাল, অত্যাধুনিক বিলাসী ভাসমান নগরীর মতো ক্রুইস জাহাজগুলি আলোয়, ব্যস্ততায় উজাগর। তাদের পাশে আমাদের ছাত্র শিক্ষক সম্বলিত খেটে খাওয়া, জং ধরা জাহাজ টি.এস. কেনেডিকে বড়োই বেমানান লেগেছিল। মাথার ভেতর কিছু অস্পষ্ট স্মৃতির নিঃশব্দ পায়চারী... মনে ছিল গোধূলির পড়ন্ত আলোয় হঠাৎ একটা কাঁঠালিচাঁপার গাছ দেখে কলকাতাকে মনে পড়া... মনে ছিল বন্দরে আসার মুহূর্তর জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকা... কলকাতায় টেলিফোন... মায়ের সুস্থ গলার শব্দ... মায়া মমতার শব্দ... ভালোবাসার শব্দ... মনে ছিল পান্না হীরে নীলায় সাজানো এক রাজকীয় মহাসমুদ্র যার ঐশ্বর্য দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়... কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার... এ ছাড়া আর কিছু মনে পড়ছিল না। ধন্দে পড়ে ভাবছিলাম... তিন বছর কি ঠিক এতটা সময় যে একটা শহরকে বেমালুম ভুলে যাওয়া যায়? জীবনের তিনটে দিন এই শহরে কাটিয়েছিলাম বছর তিনেক আগে... তার কিছুই মনে পরবে না? আমায় কি তবে পরিকল্পিত আম্নেসিয়ায় ধরল? দুঃখের মুহূর্তগুলি হৃদয় জুড়ে রাজ্যপাট চালাবে অনাদি অনন্ত কাল ধরে আর আনন্দের তিন তিনটি সুখের দিন বেমালুম ফক্কা? এ কেমন কথা?

    “আকাঙ্ক্ষার ডানাগুলি মিশে গেছে আকাশের অভ্রে ও আবীরে
    আগুনের দিনগুলি মিশে গেছে সদ্যজাত ঘাসের সবুজে
    প্রিয়তম মুখগুলি মিশে গেছে সমুদ্রের ভিতরের নীলে”


    ক্যারিব সাগরের মতো ময়ূরকণ্ঠী রং পৃথিবীর আর কোনো সমুদ্রে নেই। রোদ্দুরের আলোয় মহাসমুদ্রের ছলকে ওঠা রং মেখে অবশেষে পৌঁছলাম ব্রিজটাউন। এবার জাহাজ বাঁধা হলো ফ্লাওয়ার ডকে। ফ্লাওয়ার মানে নয়নাভিরাম সুগন্ধি ফুল নয়... ছাপোষা ময়দামাত্র। এই ডক থেকে আগে ময়দা রপ্তানি হত। সুদূর কানাডা থেকে জাহাজ বোঝাই গম আসত এই দ্বীপে। খুব কম খরচে সেই গম পিষে ময়দা তৈরি করত দ্বীপের অধিবাসীরা। সেই ময়দা আবার জাহাজে চেপে যেত দূর দূরান্তরে এই ফ্লাওয়ার ডক থেকে... তাই এমনধারা নামকরণ। একেবারে আউটসোর্সিং-এর গোড়ার কথা।


    এবার ক্রুইস টার্মিনাল তার আভিজাত্য বজায় রেখে আমাদের থেকে গা বাঁচিয়ে বেশ খানিকটা ব্যবধানে। শহর থেকে ফ্লাওয়ার ডকের দূরত্ব চিন্তা করে আমাদের সুবিধের জন্য একটা বাসের ব্যবস্থা করেছেন কাপ্তেন বুশী। সকাল দশটা থেকে প্রতি ঘণ্টায় ডক থেকে বাস ছাড়বে। পৌঁছে দেবে একেবারে ব্রিজটাউনের অন্তঃস্থলে। ফিরতি ব্যবস্থাও পাকাপোক্ত। তবে দুপুর দুটো থেকে সন্ধে ছটা পর্যন্ত কোনো বাস থাকবে না। সমস্ত যাতায়াত হয় তার আগে পরে করতে হবে নতুবা গাঁটের কড়ি খরচা করে ট্যাক্সি। বুঝলাম বার্বাডোসে দ্বিপ্রাহরিক ক্ষুন্নিবৃত্তির পরে একটা জম্পেশ দিবানিদ্রার প্রচলন আছে।

    বন্দরে প্রথম দিন। প্রথম বাসে প্রথম সিটে চেপে বসেছি আমি আর আমার ছাত্রী ডায়ানা। পেছনের সারিগুলিতে অন্যান্য ছাত্র, শিক্ষক, রাঁধুনি... ইত্যাদি প্রভৃতি। আমাদের ঠিক পেছনে ইঞ্জিনিয়ারিং দপ্তরের শিক্ষক জন আর তাকে ভীষণভাবে কোণঠাসা করে ট্রান্সপোরটেসন দপ্তরের দশাসই দেড়মনী শিক্ষক জো। দেড়মনী আগে এই জাহাজের কাপ্তেন ছিলেন। কিন্তু তার বাজখাই গলা আর বিটকেল মেজাজের সঙ্গে তাল মেলাতে সকলের প্রায় নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়। অতঃপর তার পদাভিষিক্ত হয়ে ক্যাপ্টেন বুশীর আবির্ভাব। কিন্তু কাপ্তেনী বোধহয় মানুষের জন্মগত অধিকার। অতএব জো আক্ষরিক অর্থে জাহাজে কাপ্তেন না হলেও কর্ণের সহজাত কবচ কুণ্ডলের মতো কাপ্তেনী তার মজ্জাগত। আচারে ব্যবহারে কথা বার্তায় তা সতত প্রকাশিত। আমাদের জাহাজের গতিপথ ঠিক কেমন হওয়া উচিত বা অমুক বন্দরে জাহাজ বাঁধার সময় ঠিক কী কী ভুল হয়েছে সেই বিষয়ে জো সবসময় তার বিদগ্ধ মতামত জানিয়ে থাকে। সেগুলি শুনলে মনে হবে কাপ্তেন বুশীর এখনও হাফ পেন্টুল পরে ডাংগুলি খেলার বয়েস পেরোয়নি।

    শহর থেকে ফ্লাওয়ার ডকের দুরত্ব চিন্তা করে আমাদের সুবিধের জন্য একটা বাসের ব্যবস্থা করেছেন কাপ্তেন বুশী। সকাল দশটা থেকে প্রতি ঘণ্টায় ডক থেকে বাস ছাড়বে। পৌঁছে দেবে একেবারে ব্রিজটাউনের অন্তঃস্থলে। ফিরতি ব্যবস্থাও পাকাপোক্ত।

    খেয়াল করেছি যে আমাকে জো কেমন একটা ছোটকাকাজাতীয় নাতিশীতোষ্ণ স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেন। এই যে আমি যে কোনো বন্দরে গিয়ে একা একা বাসে চেপে যত্র তত্র ঘুরে বেড়াই, তা যে একেবারেই বিচক্ষণ অধ্যাপিকাসুলভ নয় সেটা আমাকে সে জানিয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু আমি নাচার। এই সূর্যস্নাত দ্বীপগুলিতে এলেই আমার সহকর্মীরা খুব সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে সমুদ্রতীরে সিন্ধুঘোটকের মতো রোদে ভাজাভাজা হয় অথবা আকণ্ঠ মদ্যপান করে। এই দুটির একটিতেও আমি খুব একটা সুবিধে করতে পারি না। তা ছাড়া পায়ের তলায় সর্ষে। একটা নতুন দেশে এসে যতক্ষণ না তার সাথে ভালোমতো দোস্তি করতে পারছি ততক্ষণ শান্তি নেই৷ আমাদের বাস একটা সুন্দর চৌমাথার মোড়ে এসে পৌঁছল। একদিকে সাদা ধবধবে একটা গির্জা। তার পাশে তরি তরকারির বাজার। টাটকা মাছের টুকরি নিয়ে এসেছে জেলেদের দল। অনেক মানুষের ভিড়। ব্যাস! আমি অমনি সেখানে নেমে পড়লাম। নামার সময় শুনলাম জোয়ের বেশ চিন্তিত একটা “হুম ম ম ম ম” শব্দ যেটা একেবারে নাভিমূল থেকে উঠে আসছে বলে মনে হলো।


    ধীরে ধীরে শহরটাকে মনে পড়তে লাগলো। এই তো সেই জলের ধারে চায়ের দোকান যেখানে ফ্লাইং ফিস স্যান্ডউইচ খেয়েছিলাম... এই তো সেই বাস গুমটি যেখানে এক ডলারের টিকিট কাটলে যতদূর ইচ্ছে চলে যাওয়া যায়... এই তো সেই তটভূমি যেখানে আশ্চর্য নীল জল পা ধুইয়ে দিয়ে যায়...। বাস গুমটিতে একটা উত্তরমুখো বাস ধরলাম। কতরকম মানুষ চেপেছে বাসে। কোলের শিশু থেকে খুনখুনে বুড়ো চলেছে নিজস্ব গন্তব্যে। সব বয়েসের মেয়েরাই দেখলাম খুব আঁটোসাটো জামাকাপড় পরে। কল্পনার ভরসায় থাকে না বিশেষ কিছু। জানালার বাইরে মাইলের পর মাইল আখের ক্ষেত যার রসে তৈরি হয় বার্বাডোসের মিষ্টি রাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে যে শহরে পৌঁছলাম তার নাম বাথশেবা। একটা উচু পাথুরে টিলার ওপরে একটা ছোট্ট শহর। পাহাড়ের খাদ বেয়ে নিচে তাকালে সমুদ্রের অশান্ত রূপ দেখলে গা ছমছম করে। কী ভীষণ রাগে অভিমানে ফুলে ফেঁপে ঢেউগুলি এলোথেলো পোশাকে আছড়ে পড়ছে পাথুরে রুক্ষতায়। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এক আশ্চর্য বাগান। আন্দ্রমেদা হরটিকালচারাল গার্ডেন৷ সেখানে কতরকম লতা পাতা, ফুল পাখির সম্ভার। শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে শান্ত স্নিগ্ধ এক প্রাণ জুড়োবার জায়গা। বাগানের সীমানায় ক্যারিব সাগর। তার বাতাস এসে বাগানের নারকোল গাছের পাতার সাথে ফিসফিসিয়ে মনের কথা কয়। সেখানে হেঁটে হেঁটে শ্রান্ত হলে হিবিসকাস কাফেতে ঠান্ডা ফলের রস খাওয়া যায়। লাল টুকটুকে কাঠের টেবিলে সাজানো থাকে কমলা রঙের জবাফুল। সে বড়ো সুন্দর।

    ঠিক এমনি করে পরদিন আর একটা বাসে চেপে গিয়েছিলাম দেশের একেবারে পুবদিকে। তা সে বেশ অনেকটা পথ। বাস চলেছে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে। পথের পাশে দোকানপাট জনবসতি। বাসের ভেতরে নানা বয়েসের স্থানীয় বাসিন্দা৷ বহু বছর ইংরেজশাসিত হবার দরুন এখানে সকলেই ইংরেজি ভাষায় কথা বলে। নিজেদের ভেতরে যখন খুব তাড়াতাড়ি কথা বলে তখন ঠিক বোঝা যায় না। জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম যে ওরা ইংরেজিতেই কথা বলছে কিন্তু উচ্চারণের টানটা অন্যরকম বলে ঠিক ধরতে পারছিলাম না। বলল ওদের নিজস্ব কোনো ভাষা নেই... ইংরেজিই একমাত্র ভাষা। মনে মনে ভাবছিলাম যে আমরাও তো বহুদিন ইংরেজদের শাসনে ছিলাম... কিন্তু তবু নিজেদের ভাষা কখনো জলাঞ্জলি দিইনি। এখন দেশ স্বাধীন হয়েছে বটে তবে কলকাতায় গেলে মাঝে মাঝে পরের প্রজন্মকে দেখলে মনে হয় যে ইংরেজি ছাড়া বোধয় অন্য ভাষা জানা নেই তাদের।

    ব্রিজটাউন শহরকে পেছনে ফেলে সরকারি বাস চলেছে শহরতলির দিকে। একতলা রং চঙে গেরস্তর বাড়িঘর। উঠোনে ছাগল বাঁধা, মুরগি মা ছানাপোনা নিয়ে দানা খুঁটে খাচ্ছে৷ এক চিলতে বাগানে ফুলের গাছ, সবজির বাগান, দড়িতে জামা শুকোতে দেওয়া। প্রতিটি জনবসতিতেই একটি করে গির্জা আর মদের দোকান। আখের রস মজানো মিষ্টি রামের আখড়ায় কিছু মানুষকে দেখা যাবে দিনের যে কোনো সময়। দেখলাম এখানেও কলকাতার মতো মদের দোকানে গ্রিল বসানো। আসক্তির কোনো পরিমিতিবোধ নেই যে। লোহার গ্রিলের আড়ালে বসে দোকানি সুরা সরবরাহ করছেন। এরপরে পেরলাম এক বিমানবন্দর। উত্তর গোলার্ধের ভয়াবহ শীতের কব্জা থেকে কোনোরকমে হাত ছাড়িয়ে উষ্ণতার সন্ধানে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ উড়ে আসে এই দ্বীপে। কয়েকটা দিন কাটিয়ে যায় ক্যারিব সাগরের নীলে। আবার ফিরে যায় বসন্তের পথ চেয়ে। বাস গিয়ে থামল অদ্ভূত সুন্দর ক্রেন বীচে... পৃথিবীর কয়েকটি শ্রেষ্ঠ তটভূমির অন্যতম। বালির রং হালকা গোলাপি আর জলের রং আশ্চর্য রকমের নীল... সেই জল যে কোথায় আকাশে গিয়ে মিশেছে তা ঠিক ঠাহর করা যায়না...। কতক্ষণ যে সেখানে ছিলাম ঠিক খেয়াল নেই। এক সময় আকাশ কমলা করে সূর্য সেই নীল জলে ডুব দিল। ধীরে ধীরে গেরস্তর ঘরে বাতি জ্বলে উঠলো... ছেলেপুলেরা হাত মুখ ধুয়ে জলখাবার খেয়ে পড়তে বসলো... আমি ফিরতি বাসের জন্য বাস গুমটিতে অপেক্ষা করতে লাগলাম।


    অবশেষে মোটামুটি ফাঁকা একটা ব্রিজটাউনের বাস পেলাম। এবার পথ চেনা, তবে রাতের অন্ধকারে জনবসতির চেহারা খানিকটা অন্যরকম। আমার সঙ্গে সঙ্গে জানালার বাইরে একটা মস্ত চাঁদ মাথায় নিয়ে পথ চলছে ক্যারিব সাগর। বাসের ইঞ্জিনের আওয়াজ ছাপিয়ে শোনা যায় ঢেউয়ের আওয়াজ। চোখে মুখে হাত বুলিয়ে যায় ক্যারিব সাগরের দামাল হাওয়া। অবশেষে বেশ খানিক বাদে ব্রিজটাউনে ফিরলাম। রাত বেড়েছে। রাস্তাঘাট শুনশান। সন্ধের পরে এখানে খুব একটা দোকান পাট খোলা থাকে না। এদিকে বেশ খিদে পেয়েছে। জাহাজে এত রাতে খাবার পাওয়া যাবে না। ঠিক করলাম একটা ট্যাক্সি ধরে ব্রাউন সুগার বলে একটা রেস্তোঁরায় যাব। সেখানেই রাতের খাওয়াটা সেরে জাহাজে ফিরব। এই রেস্তোঁরার খবর আমাদের সহজাত কাপ্তেন জোর কাছে পেয়েছিলাম। ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। এখানে কোনো মিটার ব্যবস্থা নেই। গাড়িতে ওঠার আগে দরদাম করে নিতে হয়। আমি ট্যাক্সিতে উঠে বেশ ভারিক্কি গলায় বললাম,

    ‘ব্রাউন সুগার যেতে কত নেবে হে?’
    ‘১০ ডলার ম্যাডাম’


    যিনি কথা বললেন আর ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে চেয়ে আলতো হাসলেন তিনি আমার মায়ের বয়েসী একজন ভদ্রমহিলা! মাথায় একটা কালো স্কার্ফ বাঁধা... বেশ রোগা... হাতের শীর্ণ লম্বা আঙুলগুলি স্টিয়ারিং হুইল নিয়ন্ত্রণ করছে। গাড়ি চলছে একাকী রাতের শহরে। গেরস্তেরা প্রায় সকলেই ঘুমে। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম,

    ‘আমি দিন তিনেকের জন্য ব্রিজটাউনে এসেছি। ভারী সুন্দর দেশ আপনাদের। আমার নাম মধুবাণী। আপনার নাম কী?’
    ‘আমার নাম এঞ্জেলা’
    ‘কিছু যদি মনে না করেন... আপনার বয়েস কত?’
    ‘সত্তর পেরিয়েছি কিছুদিন হলো’

    ...নিস্তব্ধতা...

    ‘আমার কাজে কর্মে ব্যস্ত থাকতে ভালো লাগে... তাই ট্যাক্সি চালাই’

    আমার চোখ ফেটে জল আসছিল...
    ‘আজ কেমন সওয়ারী পেলেন?’
    ‘আজ তেমন পাইনি... বিকেলের পরে ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়েছি... এখন পথে লোক কম’

    ...নিস্তব্ধতা...

    ‘আমি ব্রাউন সুগার রেস্তোঁরায় চট করে একটু খেয়ে নেব। আপনি যদি আর কোনো সওয়ারী না পান তাহলে আমার জন্য অপেক্ষা করবেন? আমি ফ্লাওয়ার ডকে ফিরব’

    ‘নিশ্চয়’

    রেস্তোঁরায় খাবার বললাম বটে তবে খিদে পাচ্ছিল না আর। কী পরিস্থিতিতে পড়লে সত্তর বছর বয়েসে একজন মহিলাকে গভীর রাতে শুনশান শহরে কাজে কর্মে ব্যস্ত থাকার জন্য ট্যাক্সি চালাতে হয় তা ভাবতে চেষ্টা করছিলাম... খাবার এলো... নিজের জন্য অল্প একটু রেখে বাকিটা প্যাক করে দিতে বললাম। বিল মিটিয়ে বাইরে এসে দেখি এঞ্জেলা কথামতো অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে একটু হাসলেন। গাড়ি চলল ফ্লাওয়ার ডকের দিকে৷ আমরা দুজনে চুপ করে রাতের শব্দ শুনছি... এঞ্জেলার শীর্ণ লম্বা আঙুলগুলি স্টিয়ারিং হুইলে। ডকে পৌঁছল ট্যাক্সি। নামার সময় তার হাতে সামান্য কিছু টাকা আর খাবার বাক্সটা দিলাম।

    ‘আমি দিন তিনেকের জন্য ব্রিজটাউনে এসেছি। ভারী সুন্দর দেশ আপনাদের। আমার নাম মধুবাণী। আপনার নাম কী?’ ... ‘আমার নাম এঞ্জেলা’ ... ‘কিছু যদি মনে না করেন... আপনার বয়েস কত?’ ... ‘সত্তর পেরিয়েছি কিছুদিন হলো

    ‘রাত হয়েছে। কিছু খেয়ে নিন৷ খুব ভালো থাকবেন আপনি...’

    এঞ্জেলা আমার দুটো হাত ধরে স্মিত হাসলো। মনে হলো মা হাত ধরেছে বুঝি...

    ‘ধন্যবাদ... কৃতজ্ঞ থাকলাম’

    ট্যাক্সির হেডলাইট রাতের শহর চিরে চোখের আড়াল হলো...

    জাহাজের কেবিনে ফিরে শ্রান্ত শরীরটা বিছানায় ঢেলে একটা কথাই ভাবছিলাম...

    হয়তো আবার বছর তিনেক বাদে অনেক রোদ্দুরে দ্বীপ আর ময়ুরকণ্ঠীভনীল সাগর পেরিয়ে ফিরে আসব বার্বাডোসে। আমাদের জাহাজ নোঙর ফেলবে এই ব্রিজটাউনে... মাথার ভেতর কিছু অস্পষ্ট স্মৃতির নিঃশব্দ পায়চারী... গোধূলির পড়ন্ত আলোয় একটা কাঁঠালিচাঁপার গাছ দেখে কলকাতাকে মনে পড়ার কথা... বন্দরে আসার মুহূর্তর জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকার কথা... কলকাতায় টেলিফোন... মায়ের সুস্থ গলার শব্দ... মায়া মমতার শব্দ... ভালোবাসার শব্দের কথা... পান্না হীরে নীলায় সাজানো এক রাজকীয় মহাসমুদ্রর কথা...

    ঈশ্বর করুন... সেদিন যেন শুনশান শহরের ট্যাক্সিতে দেখা একজন চিরসবুজ মানুষের কথাও আমার মনে পড়ে। মাথায় কালো স্কার্ফ বেঁধে, হাতের শীর্ণ লম্বা আঙুলগুলি দিয়ে স্টিয়ারিং হুইল নিয়ন্ত্রণ করতে করতে যে আমায় শান্ত, স্নিগ্ধ, দৃপ্ততায় বলেছিল...

    ‘আমার কাজে কর্মে ব্যস্ত থাকতে ভালো লাগে... তাই ট্যাক্সি চালাই’।

    চলবে...

    ____________________________

    *বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @