No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : লাল সেলাম

    ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : লাল সেলাম

    Story image

       গত পর্বের পর   

     

    ঠিক যেখানে ২৫০ এসে ২৫১-এর হাত ধরেছে সেইখানে কার্লোস জীপ্ রেন্টাল। দোকানের বাইরে সারি সারি জীপ আর গল্ফ কার্ট খদ্দেরের জন্যে অপেক্ষমা। ঠিক উল্টো দিকেই কুলেব্রার ক্ষুদে বিমানবন্দর। যাদের অনেক টাকাকড়ি, তারা ট্যাক্সি, ফেরী, বাস, ট্রেনের চক্করে না গিয়ে পেলব চড়ুই পাখির মতো ছোট্ট ছোট্ট প্লেনে চেপে কুলেব্রা বেড়াতে আসে। এয়ার স্ট্রিপের সবুজে খেলা করছে সমুদ্দুরে হাওয়া।

    উল্কি আমাদের দোকানের সামনে নামিয়ে দিয়েই বাহন সমেত উল্কার মত উধাও। ছিমছাম সাদা রঙের একতলা দোকান। ভেতরে ঘন নীল কাউন্টারের ওপারে এক রকম পোশাক পরা হাসি খুশি মানুষেরা কুলেব্রা দ্বীপের চলাচল বিক্রি করছে। একটি অল্পবয়েসী মেয়ে আমাদের দেখে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো।

    “দেখুন আমরা ২৪ ঘণ্টার জন্য একটা গল্ফ কার্ট ভাড়া নিতে চাই৷ কিন্তু আমরা আগে কখনো গল্ফ কার্ট চালাইনি। একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হবে।”

    “আরে: গল্ফ কার্ট চালানো কোনো ব্যাপারই নয়। চোখ বুজে শিখে ফেলা যায়!”

    এর আগে সাঁতার আর সাইকেল চালানো নিয়ে একই মন্তব্য শুনেছিলাম। ও দুটো প্রচেষ্টায় চোখ এখনও বন্ধই আছে!

    নানারকম কাগজপত্রে সই সাবুদ হল। তাদের একটাতে আমরা মেনে নিলাম যে গল্ফ কার্ট নিয়ে যে কোনো প্রকার অঘটন ঘটলে সব দায় হবে আমাদের। এ বিষয়ে কার্লোস জীপ্ রেন্টালকে কখনই দায়ী করা যাবে না। নির্বিবাদে সই করলাম। জীবনের কোনো নিজস্ব ফর্ম নেই। সে ফর্ম ছাড়াই, ঠিক একই চুক্তিতে, আমাদের দিনাতিপাত করায়।

    লাইসেন্সের ফটো কপি, ভাড়ার টাকা, অঘটনজনিত দায়মুক্তি... সব বুঝে নিয়ে মেয়েটি আমাদের গল্ফ কার্ট পাড়ায় নিয়ে এলো।

    ছিমছাম সাদা রঙের একতলা দোকান। ভেতরে ঘন নীল কাউন্টারের ওপারে এক রকম পোশাক পরা হাসি খুশি মানুষেরা কুলেব্রা দ্বীপের চলাচল বিক্রি করছে। একটি অল্পবয়েসী মেয়ে আমাদের দেখে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালো।

    “আমরা কিন্তু একটা টকটকে লাল রঙের গল্ফ কার্ট ভাড়া নেব”

    “বেশ তো... এই যে এইখানে রয়েছে... আসুন চালানোটা বুঝিয়ে দিই”

    বেশ ঝকঝকে লাল সেলাম বাহন। তার মাথায় রোদ্দুর আটকানো একটা ছাদ... মোট চারজন বসার বন্দোবস্ত রয়েছে। স্টিয়ারিং হুইলে একটা চেন দিয়ে তালা আটকানো।

    “এই নিন চাবি। একটা দিয়ে এই তালাটা খুলবেন আর অন্যটা দিয়ে গল্ফ কার্ট চালাবেন। এইখানে ব্রেক আর এইখানে এক্সিলেটর। এই হাতলটা ডানদিকে ঘোরালে গাড়ি সামনে যাবে আর বাঁদিকে ঘোরালে পেছনে। গাড়ি সবসময় তালা দিয়ে রাখবেন। হারিয়ে গেলে আপনাদের দায়। আপনাদের দিন শুভ হোক।”

    হাসিমুখে মেয়ে দোকানে ফিরে গেল। জেনিফারের কপালে অল্প ভাঁজ...

    খানিকটা সময় গেল স্টিয়ারিং হুইলের তালা খুলতে। লাল সেলামকে মুক্ত করে আমি বসলাম চালকের আসনে... জেনিফার আমার পাশে। চালাবার প্রথম প্রচেষ্টা খুব একটা সুখব্যঞ্জক হলো না৷ ব্যাটে বলে না হওয়ায় লাল সেলাম উচ্চিংড়ের মতো লাফ দিয়ে পাশের এক নিরীহ বাদামী গল্ফ কার্টকে প্রায় রামগোত্তা মারে আর কি!

    লাল সেলামকে মুক্ত করে আমি বসলাম চালকের আসনে... জেনিফার আমার পাশে। চালাবার প্রথম প্রচেষ্টা খুব একটা সুখব্যঞ্জক হলো না৷

    “ইয়ে... গল্ফ কার্টের কত দাম হয় জানো ?... আমার কোনই ধারণা নেই...”

    জেনিফারের প্রশ্নে বুঝলাম যে ও আমার গল্ফ কার্ট চালনায় খুব একটা ভরসা করতে পারছে না।

    “ঘাবড়ে যেও না৷ হাতটা একটু মকশো হলেই আর কোনো চিন্তা থাকবে না।”

    হাত মকশো করতে করতে জেনিফারকে নিয়ে বেরোলাম কার্লোস জীপ্ রেন্টাল ছেড়ে। ২৫১ নম্বর রাস্তা ধরে ঢিকিশ ঢিকিশ করে এগোলো লাল সেলাম। এই পথ যেখানে শেষ হবে সেইখানে গা এলিয়ে রয়েছে ফ্লামেঙ্ক বীচ। শোনা যায় যে গোটা পুয়ের্তো রিকোয় এইটিই নাকি সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোড়ার নালের মতো অর্ধচক্রাকার এক অসামান্য বেলাভূমি... যেখানে জলের রং দেখলে ময়ূরের পেখমের কথা মনে হয়... যেখানে বালির রং কিশোরীর লজ্জাকে হার মানায়... যার ডানদিকে তাকালে সবুজ পাহাড় হাতছানি দেয় আর বাঁদিকে শান্ত স্নিগ্ধ ক্যারিব সাগরের সীমাহীনতা...

    শুনেছি এই স্বর্গের মতো সুন্দর দ্বীপে এক সময় মার্কিন নৌবাহিনীর ঘাঁটি ছিল। সত্তরের দশক পর্যন্ত এখানে তারা বোমাবর্ষণের মহড়া করত। সেই সময়ের চিহ্নস্বরূপ এই ময়ূরপেখম তটভূমিতে জলের কিনারে কাত হয়ে শুয়ে রয়েছে একটি শের্মান ট্যাঙ্ক। এখন সেখানে ছবি আঁকে স্থানীয় মানুষ... ডিমে তা দেয় শঙ্খচিল... ঢেউ ভাঙে অভিমানে।

    ২৫১ ধরে উত্তর পশ্চিমে চলেছে লাল সেলাম। আমার হাত এখন অনেকটা সড়গড়৷ জেনিফার খানিকটা স্বস্তিতে। পথের দুই ধারে গেরস্তের ঘরকন্না। ছোটো ছোটো একতলা রংচঙা বাড়ি, সামনে একচিলতে বাগানে বাহারি বোগেনভিলিয়ার ঝলমলে হাসিমুখ, চেনাশোনা নারকেল গাছ, পেঁপে গাছ, টগর, গন্ধরাজ... মনে হল দেশে ফিরলাম যেন।

    “জেনিফার... এই রোদ্দুর এই উষ্ণতা, এই রং দেখলে কে বলবে আর খানিক উত্তরে সাদা ধবধবে বরফের কঠিন শৈত্যে অসার হয়ে রয়েছে বস্টন শহর। সে যেন এক অন্য পৃথিবী।”

    জেনিফার চুপ করে হাসলো। ওর প্রিয়জন রয়েছে সেই অসার বরফের কঠিন শৈত্যে।

    “খানিক বাদেই সন্ধে নামবে। আজকে মনে হয় ফ্লামেঙ্ক বীচ ছাড়া আর অন্য কোথাও যাবার সময় হবে না। রাতের অন্ধকারে এই সরু রাস্তায় গল্ফ কার্ট চালানোর মত হাতের মকশো এখনো হয়নি। আমরা কাল খুব ভোরবেলা উঠে বাকি জায়গাগুলি দেখে নেব... ঠিক আছে?”

    জেনিফার মাথা হেলিয়ে হাসিমুখে জানালো যে ঠিক আছে। কুলেব্রা থেকে ফাহার্দ যাবার তিনটি ফেরী আছে। সকাল সাড়ে ছটা, দুপুর একটা আর বিকেল পাঁচটা। ২৫১ ধরে যেতে যেতে ঠিক করলাম যে পরদিন আমরা দুপুর একটার ফেরী ধরতে চেষ্টা করব। ফাহার্দ পৌঁছে আবার সান জুয়ানের ট্যাক্সি খোঁজার ঝক্কিটা বেলাবেলি দিনের আলো থাকতে থাকতে সেরে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে৷ কোনো কারণে যদি সেই ফেরীতে ফেরবার টিকিট না পাই তাহলে তখন থেকেই বিকেল পাঁচটার ফেরীর জন্য লাইন দেব। শেষ ফেরীর টিকিট না পেলে শেষে সান জুয়ানে জাহাজ ফেল হবে! সে এক চিত্তির!

    তার মানে হলো গোটা কুলেব্রা কাক ভোরে উঠে... লাল সেলামকে নিয়ে আধ বেলায় দেখে ফেলতে হবে৷ ত্রিশ বর্গ কিলোমিটারের একটা দ্বীপ চষে ফেলার জন্য আধ বেলা যথেষ্ট। জেনিফারকে এখন এইসব বলে ঘাবড়ে না দেওয়াই ভালো। রাত্তিরে খাবার সময় ধীরে সুস্থে জানানো যাবে। এতখানি বুদ্ধি খরচ করে শ্রান্ত মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিয়ে মন ভাসালাম নিসর্গে। রোদ্দুর নরম আর স্বর্ণাভ হয়ে আমাদের দিকে চেয়ে রয়েছে। নারকোল পাতায় বাতাসের গা শিরশিরোনো আদর।

    খানিক এগিয়ে আমাদের ডানধারে লাগুনা ডেল ফ্লামেঙ্ক বা ফ্লামেঙ্ক লাগুন৷ ক্যারিব সাগরের জল কোনো একদিন ডাঙায় উঁকিঝুঁকি মারতে এসে ধরা পড়ে গেছে। তার আর ঘরে ফেরা হয়নি৷ কিছু পাথুরে দেয়াল আর গাছ পালা তার পথ আটকে দাঁড়িয়ে৷ এখন সেখানে ছায়া ফেলেছে গুল্ম লতা। এখন সেখানে নানা পাখপাখালির বাস। তাদের এখন বাসায় ফেরার সময়। মাছের আঁশটে গন্ধ আর জীবনের নানা চিহ্ন সেই জলাভূমি জুড়ে।

    লাগুন শুনলেই মনে পড়ে ‘দা ব্লু লাগুন’ আর ব্রুক শিল্ডস। তখন সবে যাদবপুরে প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলাম। রক্ষণশীল কলকাতায় হইচই ফেলে দিয়েছিল এক অচেনা দ্বীপে পরিত্যক্ত সোনার বরণ মেয়ে আর এক স্বর্গীয় নীলাভ জলাশয়। জেনিফার অবশ্য সে সব কথা জানে না। তার চেতনায় এখন কেবল লাগুনা ডেল ফ্লামেঙ্ক।

    ২৫১ ধরে উত্তর পশ্চিমে চলেছে লাল সেলাম। আমার হাত এখন অনেকটা সড়গড়৷ জেনিফার খানিকটা স্বস্তিতে। পথের দুই ধারে গেরস্তের ঘরকন্না।

    খানিক বাদেই পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্য ফ্লামেঙ্ক বীচ। নির্দিষ্ট জায়গায় লাল সেলামকে বাঁধা ছাদা করে এগোলাম দুজনে। খড়ের ছাউনি দেওয়া নারকোল গাছের ছায়ায় তিন চারটে দোকানে পানীয় বিক্রি করছে রোদে সেঁকা কয়েকজন মানুষ। বেশ খিদেতেষ্টা পেয়েছিল আমাদের দুজনের৷ কিন্তু বেলাশেষে খাবার আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

    আমরা ডাব দিয়ে রাম খেতে চাই কি না জিজ্ঞেস করলো দোকানী। আমি চাইলাম শুধু ডাব আর জেনিফার চাইল শুধু এক বোতল বিয়ার। দোকানী আমাদের চাহিদার বৈচিত্র্যে ওবেলিক্সের কায়দায় ‘দিস টুরিস্টস আর ক্রেজি’ জাতীয় কিছু স্বগতোক্তি করে আমাদের চাহিদা মিটিয়ে টাকা বুঝে নিল। আমরা পানীয় হাতে পৌঁছলাম এক স্বপ্নের তটে। শেষ বেলায় সাগর কিনার প্রায় জনহীন... জায়গাটি ঠিক যেমনটি কানে  শুনেছিলাম... অবচেতনে জেনেছিলাম... তেমন।

    ঘোড়ার নালের মতো অর্ধচক্রাকার এক অসামান্য বেলাভূমি... সেখানে জলের রং দেখলে ময়ূরের পেখমের কথা মনে হয়... সেখানে বালির রং কিশোরীর লজ্জাকে হার মানায়... তার ডানদিকে তাকালে সবুজ পাহাড় হাতছানি দেয় আর বাদিকে শান্ত স্নিগ্ধ ক্যারিব সাগরের সীমাহীনতা... ডিমে তা দেয় শঙ্খচিল... ঢেউ ভাঙে অভিমানে...

    এইখানে গভীর রাতে ডিম পারতে আসে আদিম জায়েন্ট লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপ... আসে পাশে তাদের পায়ের চিহ্ন৷ আমি আর জেনিফার পাউডারের মতো মোলায়েম হালকা গোলাপি বালির ওপরে বসলাম কিছুটা সময়... পায়ের পাতা ছুয়ে গেল ময়ূর পেখম জল...

    ক্যারিব সাগরের বাতাস বলল... ‘এলে শেষ পর্যন্ত?’

    আর খানিক বাদে লজ্জায় লাল হয়ে সবুজ পাহাড়ের পেছনে মুখ লুকোলো একটা আশ্চর্য দিন।

    চলবে...

    *বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @