বাংলা চলচ্চিত্রের দোলনায় দুলতে থাকা ‘চারু’র ‘সীতা’ ও ‘আরতি’ হয়ে ওঠার লড়াই

প্লেনের ভেঙে পড়া ধ্বংসাবশেষ পেরিয়ে যে মেয়েটি হাঁটছিল; বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী শ্মশানের থমথমে শান্তিতে সে রচনা করছিল এক অসহায়তার আখ্যান। যে অসহায়তা লড়াইতে পরিণত হয় না, শুধু বঁটির ধারালো আঘাতে খানিক রক্ত ছিটকে পড়ে সভ্যতার ওপর! সীতা, অর্থাৎ সেই মেয়েটিকে বীভৎস মজার শহর উপহার দেয় মর্মান্তিক আত্মহনন। আর আরতিকে সেই শহরই ফিরিয়ে দেয় কাঠিন্য, প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক নিগড়।
সত্যজিৎ রায় নির্দেশিত ‘মহানগর’-এর আরতি, ঋত্বিক ঘটক নির্দেশিত ‘সু্বর্ণরেখা’-র সীতা এই দুই নারীর মধ্যে সেতুবন্ধন করেছেন যিনি, তার নাম মাধবী মুখোপাধ্যায়। এইসব ছবির ময়নাতদন্ত বা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, বা এইসব চরিত্রে অভিনেত্রী হিসেবে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের বিষয়ে আলোচনামূলক সন্দর্ভ লেখাও নয়, এ লেখা আদতে একটি অনুসন্ধান। এই অনুসন্ধান এক অভিনেত্রীর সূত্র ধরে কয়েকটি নারীচরিত্রের অন্তর্লীন এক আখ্যান খোঁজার চেষ্টা, যে সমস্ত নারীচরিত্রকে এক সুতোয় বেঁধেছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়, অভিনেত্রী হিসেবে। কাজেই এই আখ্যানে তিনিই আমাদের সঙ্গী হবেন।
ভাবা যাক সীতার কথা। নামটার পেছনে রামায়ণের প্রভাব ঋত্বিকের নিজের সিনেমাদর্শনে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। সীতা পৃথিবীর মেয়ে। একথা তাকে একজন বলে ওই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে, যে প্রান্তর ধারণ করছে যুদ্ধের সমস্ত ক্ষত, সভ্যতার আত্মধ্বংসের অংশীদার যে। পৃথিবীর মেয়ে আবার পৃথিবীর কাছে ফিরে যায় পুরাণের শেষে। আধুনিকতার ক্লেদ বহন করা শহরে তাকে নিজেরই অগ্রজের সামনে গলায় বঁটি চালাতে হয়।
ইয়ুং সমষ্টিগত অচেতনে মিথ-এর উপস্থিতির কথা বলেছেন। ঋত্বিকের কাছে তার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। কালীর বেশে এক বহুরূপীকে দেখে সীতা ভয় পেয়ে যায় তার শৈশবে, সেই পৌরাণিক ভয়াল চেহারাই তাকে ধারণ করতে হবে শহর কলকাতায় একদিন, সে কথা সে জানতেই পারেনি। শুধু বঁটির আঘাত গলায় দিয়ে মৃত্যুকে ডেকে নেওয়ার সময়টুকুতেই সে শক্তিসাধনার মূর্ত রূপ। রামায়ণের গল্প সে একদিন পুরোপুরি শুনবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে বড় হয়ে যায়। গল্প তার শোনা হয় না, সে পৃথিবীর মেয়ে, পৃথিবীর কাছে ফিরে যায় সময়মতন। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, সীতার আত্মহননের পর ঈশ্বর যখন বেরিয়ে আসে তার ঘর থেকে, তার সিল্যুয়েট মনে করিয়ে দেয় রাবণকে।
এই অসম্ভব পরিণতিতে এসে পৌঁছানোর পথ ছিল ‘ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়’-এর পেলবতায় মোড়া। যুদ্ধবিদ্ধস্ত প্রান্তরে সীতার পদক্ষেপের সঙ্গে রবীন্দ্রগানের কলি, “জোয়ার জলে ফেনার রাশি/ আকাশে আজ উঠছে ভাসি” দর্শককে অস্বস্তি দেবে, গ্রীষ্মকালীন চড়া রোদের দহন দেবে। মাধবীর চেহারার লালিত্য, তার অভিনয়ের লালিত্য যেন সীতার পায়ের তলায় চাপা পড়া দেশভাগ, দাঙ্গা, যুদ্ধ, উদ্বাস্তু সমস্যা, খাদ্য আন্দোলনের কঠোরতা ভেঙে দেয়। সলিলের গাঁয়ের বধূর মতোই তার চোখেও স্বপ্ন আছে। তাই সে বাগদি বউ-এর ছেলে অভিরামকে ভালোবাসে, সে ভালোবাসা নিয়ে জেদি হয়। দাদাকে সে যখন বলে তাকে ছেড়ে কোত্থাও যাবে না, তখন সে যতটা শান্ত, ততটাই শান্ত সে দাদার মার খেয়ে বীণায় মাথা ঠুকে যাওয়ার সময়। রাগলে দাদার শরীর খারাপ হয়, এই তখন তার চিন্তার মূল উপজীব্য। তার আগে অবধি মাধবীর সীতা হয়ে ঈশ্বরের দিকে তাকিয়ে থাকা শান্ত, অথচ স্পষ্ট, তীব্র। একই তীব্রতা দাদার মার খাওয়ার পরের উচ্চারিত বাক্যেও। তার মলিন সৌন্দর্য্য স্বপ্নভঙ্গের যাবতীয় আঁধার মেখে যখন রং লাগায় গালে, বিনুর ভরণপোষণের জন্য বাধ্য হয়ে, তখনও তার পেলবতা আভাস দেয় না মুহূর্তপরের বিপর্যয় ও তার ভয়ঙ্করী রূপের। সীতার আত্মহননের মুহূর্তে মাধবী যতটা সত্য, ততটাই সত্য তার আগের মুহূর্তের কোমল মালিন্য। যুদ্ধের পরের পৃথিবীর মেয়ে সে, যে পৃথিবীর ওপর পা ফেলার সময় গান বাজে “জোয়ার জলে ফেনার রাশি...”; পৃথিবীর কাছে সে ফিরে যায়, সেই পেলব পৃথিবীর কাছে।
আরতি যে সীতার মতন চরম পরিণতিতে পৌঁছাবে না, এ যেন কোথাও নির্ধারিত। গৃহস্থবাড়ির বউ সে। শ্বশুরমশায়ের কাছে যাওয়ার জন্য সে ঘোমটা দেয় মাথায়। স্বামীর দায়িত্ব কমাবার কথা ভেবে সে চাকরি নেয়। এসব ক্ষেত্রে মাধবীর অভিনয়ের মমত্ব আরতিকে তার লাবণ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে আনে। দেশভাগের পরের কলোনিজীবন তখন তুঙ্গে। সেই কলোনিরই কোনো এক ঘরে সীতা যখন ঈশ্বরের সামনে আত্মহত্যা করে ও নেশাতুর ঈশ্বরের পাঞ্জাবিতে ছিটকে যায় রক্ত, তখনই আকাশবাণীতে বিশেষ বিশেষ সংবাদে লেভির প্রতিবাদ, প্রফুল্ল সেন এসব নাম ভেসে আসে, খাদ্য আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়ে যায়, আর সেই রেডিও চলার ফাঁকেই আরতি, ঘরের বউ, ঠিক করে চাকরি করবে। পারিবারিক নিগড়ে আঘাত লাগে।
জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী রচিত ‘মীরার দুপুর’-এ গৃহবধূ মীরা যখন হীরেনের অপারগতার জন্য সংসার চালাতে বাড়ির বাইরে যায়, তখন সন্দেহে অবিশ্বাসে কুঁকড়ে আত্মহত্যা করে হীরেন। তার পৌরুষের ইগো সেখানে সন্তুষ্ট হয়। একইভাবে অবিশ্বাসের জালে জড়িয়ে যায় আরতির স্বামী সুব্রতও। আরতির লিপস্টিক, রোদচশমা তাকে সংকটে ফেলে। সে আরতির বসের সঙ্গে দেখা করতে যায় খানিক সন্দেহের বশেই। সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে চাকরির প্রস্তাব তাকে খানিক স্বস্তি দেয়। কারণ সে জানে সে চাকরি পেলে আরতিকে চাকরি ছাড়তেই হবে। অনিল চ্যাটার্জীর অভিনয়ে যেমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব সন্দেহ হীনমন্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়ে তেমনই দৃঢ় হয়ে ওঠে প্রত্যয়। প্রথম মাইনে পেয়ে ফেরার পর সুব্রত যখন দেখে আরতিকে তখন তার সন্দেহের ছাপ তার চোখে থাকে, যে চোখ আরতির ব্লাউজের ভেতরে স্পষ্ট হয়ে ওঠা ব্রা-এর স্ট্র্যাপ দেখে। আরতির শরীর যখন সংসার চালানোর জন্য গড়েপিঠে নেয় নিজেকে, তখন সেই শরীরকে সন্দেহ করে সুব্রতর চোখ। আরতি প্রথম মাইনে পাওয়ার পর অফিসের চ্যাপটা গোল আয়নার ভেতর দিয়ে তাকে দেখে ক্যামেরা, যে ক্যামেরা ধরে পাল্টে যাওয়া আরতিকে। শেষে আরতির পাল্টে যাওয়া স্পষ্ট হয় বসের সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ়ভাবে রেজিগনেশন লেটার দেওয়ার মধ্য দিয়ে। বস তাকে বিস্ময়ে, ক্রোধের চোখে দেখে। আরতি তার কোমলতা ছেড়ে, গৃহস্থ বউ-এর আবরণ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আরতিকে দেখার অনেকগুলো পুরুষ চোখ এভাবেই তৈরি হয় সিনেমার শরীরে।
সুব্রত পাবনা থেকে আসা, ছিন্নমূল। হিমাংশু, আরতির বসেরও শেকড় ওপারে। ভাগ্যের ফেরে আরতি সুব্রতর স্ত্রী, যাদের কাছে আরতি মেশিন বেচতে যায় তাদের সমকক্ষ সে হতেই পারত। তার লজ্জিত হওয়া, ভীত হওয়া এবং স্বামীর দিকে ভরাট দৃষ্টিতে তাকানোতে কোনো খেদ নেই। তাই সীতা যখন ফিরে যায় পৃথিবীর কাছে, যখন বিনু হাঁটা লাগায় ঈশ্বরের হাত ধরে নতুন বাড়ির দিকে, তখন আরতি আর সুব্রত মিশে যায় মহানগরের ভিড়ে, জীবনের সন্ধানে, লড়াইয়ের জেদ এবং বাঁচার আনন্দে।
এই আখ্যানভাগের আরেক শরীর কি ছিল একশো বছর আগে, যেখানে গৃহবধূ চারুলতা বঙ্কিম পড়ছে, অন্দরমহলের দৃষ্টিতে বাহিরকে দেখছে, আর আচমকাই তার লেখনী উদ্ভাসিত হচ্ছে। অমলকে জড়িয়ে ধরার মধ্যে বা অমলের চিঠি বুকে কাঁদার মধ্যে কোনো পাপের আড়ম্বর নেই, আছে নির্লিপ্ত আবিষ্কার। উনিশ শতকীয় নবজাগরণের নারীশিক্ষার চেতনার আলোকে আলোকিত চারু, দোলনায় দুলতে থাকা সেই মুক্তিকামী চারুই কি একই অভিনেত্রীর মাধ্যমে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সীতা ও আরতির মধ্যে?
তবে আরেকটি চরিত্রের মাধ্যমে অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের প্রতি ওড রচনা শেষ হবে, শেষ হবে তার সূত্রে গাঁথা পড়া আখ্যানও। সেই চরিত্রটির নাম পাল্টে যায় বারবার। কখনও সন্ধ্যা চক্রবর্তী, কখনও ঝর্ণা রায়, কখনও রেবা সেন। সেও ছিন্নমূল, পরিচিতিবিহীন। সমাজের ওপরতলার দ্বারা লাঞ্ছিত, প্রবঞ্চিত হয়ে শেষত সে রেখে যায় এক কাল্পনিক ডায়েরি, যা মুখোশ খুলে দেয় নাগরিক নিষ্ঠুরতার। ‘থানা থেকে আসছি’ চলচ্চিত্রে মাধবী মুখোপাধ্যায় অভিনীত চরিত্রটি একবার মাত্র সংলাপ দেয়, যখন সে তার স্বপ্নের কথা বলে। তার বাদবাকি কথা ডায়েরির ভেতর দিয়ে বিবেক দংশনের কারণ হয়ে দাঁড়ায় সমাজের শোষক উচ্চকোটির। এই প্রচণ্ড নীরব চরিত্রটিতে সেই পেলবতা নিয়ে প্রবল অস্বস্তি দিয়ে যান মাধবী। ঠিক তার আত্মহত্যার মুহুর্তে সীতার আত্মহনন ভেসে ওঠে আখ্যানে, ভেসে ওঠে আরতির লড়াইও। আর এক শতাব্দী আগের এক গৃহবন্দী মহিলা নিজেকে আবিষ্কার করেন, জানেন না তখনও নাগরিক প্রগতি কতটা নির্মম হয়ে অপেক্ষা করছে সীতা, আরতি বা সন্ধ্যাদের জন্য।