কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে মেলা করছেন লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা

“বড়ো যদি হতে চাও ছোটো হও তবে” – এই প্রজ্ঞা থেকেই একগুচ্ছ পত্রিকা নিজেদের ‘লিটল ম্যাগাজিন’ বলতে গর্ব অনুভব করে। তারা অবাণিজ্যিক, প্রথাবিরোধী আর সজীব – তাই সবরকম আগ্রাসনের চোখে চোখ রাখার সামর্থ্য রাখে। বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, “লিটল কেন? আকারে ছোটো বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? না কি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সব কটাই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়; ওই ‘ছোটো’ বিশেষণটাতে আরও অনেক অর্থ পোরা আছে। প্রথমত, কথাটা একটা প্রতিবাদ; একজোড়া মলাটের বিরুদ্ধে সবকিছুর আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; বহুলতম প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনও ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়োবাজারে বিকোবে না কোনোদিন, কিন্তু কোনোও একদিন এর একটি পুরোনো সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এইজন্যই যে এটি কখনো মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিল। চেয়েছিল নতুন সুরে কথা বলতে। কোনো এক সন্ধিক্ষণে, যখন গতানুগতিকতার থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিল – নিন্দা, নির্যাতন কিংবা ধনক্ষয়ে প্রতিহত হয়নি। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা – এটাই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম”।
৬৮টি পত্রিকা অংশগ্রহণ করেছে মেলায়
যে কোনো কাজই যখন বড়ো পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন জোট বাঁধা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। লিটল ম্যাগাজিনগুলোও বারবার জোট বেঁধেছে, কখনও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায়, কখনও নিজেদের অস্তিত্বের তাগিদে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের টালমাটাল পরিস্থিতিতে ২০০৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর এমনভাবেই তৈরি হয়েছিল ‘লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চ’। উদ্দেশ্য ছিল ছোটো পত্রিকাগুলির নিজস্ব দাবিদাওয়া, মতামত প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। তারপর ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঠে সমন্বয় মঞ্চের সৌজন্যে বসল লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের নিজস্ব উদ্যোগে প্রথম ‘সারা বাংলা লিটল ম্যাগাজিন মেলা’। সূচনাতেই বিপুলভাবে সাড়া দিলেন লেখক এবং পাঠকেরা। দু’বছর পর জায়গা পাল্টে মেলা বসল কলেজ স্কোয়ারে। তারপর থেকে প্রত্যেক বছরই জানুয়ারি মাসে বিদ্যাসাগর উদ্যানে ধর্মপালের মূর্তির সামনে মেলা আয়োজিত হয়ে আসছে।
বৃহস্পতিবার থেকে কলেজ স্কোয়ারে ১৪ তম ‘সারা বাংলা লিটল ম্যাগাজিন মেলা’ শুরু হল। চলবে শনিবার পর্যন্ত। গত বছরের প্রায় পুরোটাই কেটেছিল কোভিডের আতঙ্কে। এখনও সংক্রমণ পুরোপুরি থামেনি। তারই মধ্যে করোনার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে মেলা আয়োজিত হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চের অন্যতম আহ্বায়ক প্রেমাংশু দাশগুপ্ত জানালেন, “করোনার জন্য এবারের মেলা অনিশ্চিত ছিল। অল্প সময়ে কলকাতা পুরসভা থেকে অনুমতি পেয়েছি। প্রচার করার সময় বেশি পাইনি। কিন্তু প্রত্যাশা ছাড়িয়ে অনেক বেশি পত্রিকা এসেছে।”
মেলা চলবে শনিবার পর্যন্ত
৬৮টি পত্রিকায় অংশগ্রহণ করেছে মেলায়। ‘গুরুচণ্ডা৯’, ‘একক মাত্রা’, ‘জনস্বার্থ বার্তা’, ‘তথ্যসূত্র’, ‘মাতৃভাষা’, ‘আমাদের পদক্ষেপ’, ‘সালপেত্রিয়ে’, ‘কথা’, ‘এবং জলার্ক’, ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা উন্নয়ন’ ‘উৎস মানুষ’ প্রভৃতি বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে থাকছে টোটো ভাষার পত্রিকা ‘টোটবিকো লোইকো দেরেং’। ‘একক মাত্রা’ পত্রিকার অরুণাভ বিশ্বাস জানালেন, “সমন্বয় মঞ্চের মেলায় ‘একক মাত্রা’ প্রথম থেকে আছে। পত্রিকার গ্ৰাহক, পাঠক, লেখকদের সঙ্গে মুখোমুখি আড্ডা হয় এখানে। পুরোনো সংখ্যার বিক্রি তথা গ্ৰাহক পুনর্নবীকরণ ভালোই হচ্ছে। এবারের জনপ্রিয়তম সংখ্যা ‘কার্টুন গ্ৰাফিতি মিম পোস্টার’”।
আরও পড়ুন: কলেজ স্ট্রিটের সবথেকে পুরোনো বইয়ের দোকান
কৃষক আন্দোলনের প্রতি নিবেদিত এবারের মেলা। সমন্বয় মঞ্চের সঙ্গে যৌথভাবে মেলার আয়োজনে রয়েছে ‘ফ্যাসিবাদী বিরোধী সাংস্কৃতিক উদ্যোগ’। প্রয়াত নাট্যকর্মী তথা ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের লড়াকু যোদ্ধা রাজা বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে মেলার মঞ্চের নাম ‘রাজা বিশ্বাস মঞ্চ’। ৩ দিন ধরে নাটক, গান, কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে মৌলবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধের বার্তা। প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি এবং গবেষণাকেন্দ্রের কর্ণধার সন্দীপ দত্ত।
এবারের মেলা কৃষক আন্দোলনের প্রতি নিবেদিত
লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন সফল না ব্যর্থ তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। এই ধরনের কোনো আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা আদৌ আছে কিনা, তা নিয়েও বিতর্ক আছে যথেষ্ট। তার মধ্যে না ঢুকেও বলা যায়, দুর্গাপুজোর মতোই লিটল ম্যাগাজিন পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির অঙ্গ তো বটেই, আমাদের পরিচিতিকে একটা নতুন মাত্রা দিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশেও লিটল ম্যাগাজিনের এত রমরমা নেই, যা দেখা যায় আমাদের রাজ্যে। একথা অনস্বীকার্য যে, কোনো বাণিজ্যিক লাভের কথা চিন্তা না করে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গেলে আজকের যুগে যথেষ্ট কলজের জোর লাগে, এই সব ছোটো পত্রিকার হিম্মতকে তাই শ্রদ্ধা জানাতেই হয়।
ছবি - অরুণাভ বিশ্বাস