No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    লিপস্টিক-রঙা দিনের স্বপ্ন

    লিপস্টিক-রঙা দিনের স্বপ্ন

    Story image

    অতঃপর জানা গেলো, এই আট বাই আট ঘুপচি ঘরে, দেওয়ালির শোরগোল পেরিয়ে যে চারটি মেয়ে পরস্পরের কাছাকাছি ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে বসেছে, একে অন্যের থেকে দূর, কিন্তু পরস্পরের হাতে হাত রেখে, আসলে তাদের সক্কলের নাম রোজি। তারা ছেঁড়া পর্নোগ্রাফির কভার জুড়তে জুড়তে হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে এতটাই, যে তাদের অস্তিত্বগুলোকে পৃথক করা যাচ্ছে না। তবে যেহেতু আইডেন্টিফিকেশন জরুরি, তাই অলংকৃতা এখানে তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা নাম দেবেন। তাদের বয়সের ফারাক রাখবেন। তাদের নিয়ে গল্প লিখবেন - আলাদা আলাদা।

    রেহানা
    সদ্য কলেজ-পড়ুয়া। গোঁড়া মুসলিম পরিবারের এই মেয়েকে আব্বু-আম্মি ‘অধিকার দিয়েছে’ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার। রেহানাদের পারিবারিক ব্যাবসা বোরখা তৈরির। সেই পোশাকেই কলেজ যাওয়ার নির্দেশ তার ওপর। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে রেহানা আব্বুর পাশে বসে বোরখা সেলাই করে। একইসঙ্গে সে বেরিয়ে আসতে চায় বোরখার ঘেরাটোপ থেকে, পিতৃতন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া নিয়মানুবর্তিতা থেকে। সে জিন্স পরার অধিকার দাবি করে। সে পুরুষবন্ধুর সঙ্গে মদ্যপান করে। সংকোচ সরিয়ে শরীরী সংযোগে যায়। সে এই পুরুষটিকে বিশ্বাস করতে চায়, সে বাঁচতে চায় নিজের শর্তে। আর এই মুক্তির আস্বাদ আকণ্ঠ পান করে নেওয়ার জন্য রেহানা যাবতীয় প্রচেষ্টা চালায় – সেসব নৈতিক হোক অথবা অনৈতিক।

    লীলা
    পেশায় বিউটিশিয়ান। সকাল সন্ধে বিউটি পার্লারে যায়, মেয়েদের সাজিয়ে তোলে সুনিপুণ দক্ষতায়। লীলার বাবার মৃত্যুর পর সংসার চালানোর জন্য লীলার মাকে এমন পেশার সঙ্গে সংযুক্ত হতে হয় যা আপাতদৃষ্টিতে সম্মানের নয়। কিন্তু দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লীলা তার মাকে প্রশ্ন করে- এই জীবিকায় তিনি নিজে কি আদৌ কখনও স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন নি? লীলার বিয়ের ঠিক হয়। এই বিয়েতে সে সম্মত নয়। ওই কলোনিরই বাসিন্দা, স্টুডিওতে কাজ করা ফটোগ্রাফার যুবকের সঙ্গে সম্পর্ক তার। লীলার এনগেজমেন্টের রাতে তাকে ওই প্রেমিকের সঙ্গে সঙ্গমরত অবস্থায় খুঁজে পায় তার মা।

    শিরিন
    বয়সে যুবতী এই মুসলিম রমণী তিন সন্তানের জননী। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তার শোহর ফিরে আসার পর প্রায় প্রতি রাতে শিরিনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করে। সে যৌনতা নেহাতই যান্ত্রিক, আদরহীন। শিরিন কষ্ট পায়, শরীরে, মনে। এরই মধ্যে তার একমাত্র স্বাধীন যাপনের জায়গাটি হল তার পেশা। গোপনে কনট্রাসেপটিভ পিল খাওয়ার মতোই, সেলসগার্লের চাকরিও করে গোপনে। সেখানে সে আদ্যন্ত সফল। কিন্তু বহু চেষ্টার পরেও শিরিন তার মেগালোম্যানিয়াক স্বামীকে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা বোঝাতে ব্যর্থ হয়।

    ঊষা
    বুয়াজি নামেই কলোনিতে জনপ্রিয়। বিগতযৌবন, সপ্রতিভ। স্বামীর মৃত্যুর পর বিরাট বাড়ি সামলানোর দায়িত্ব তার একার কাঁধে। ভাড়াটে শিরিনের স্বামী, ওই বাড়ি বিক্রি করে শপিং মল বানানোর প্রস্তাব দিলে বুয়াজি একাই লড়ে নেন। রোজ রাতে তিনি রোজির যৌনতার গল্প পড়েন। পুজোর মন্ত্রের বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখা থাকে চটি বই। সৎসঙ্গ শুনতে যাওয়ার অছিলায় ঊষা নতুন সুইমিং কস্টিউম কিনে সাঁতারের ক্লাসে ভর্তি হয়। পেশিবহুল যুবক ইন্সট্রাকটারের প্রতি তীব্র শারীরিক আকর্ষণের বশবর্তী হয়ে নিজের নাম গোপন করে প্রতি রাতে তাকে ফোন করতে থাকে ঊষা। গল্প করতে করতে স্নানঘরে বসে স্বমেহন করে।

    লিপস্টিক ফেমিনিজম ও থার্ড ওয়েভ
    ১৯৭০ পরবর্তী সময়ে নারীবাদী দর্শন স্বতন্ত্র রূপ নিতে শুরু করে। সাতের দশকের আগে নারী আন্দোলন ছিল মূলত দাবিদাওয়া-কেন্দ্রিক। সত্তরের পর, অ্যাক্টিভিজম-এর সঙ্গে সংযুক্ত হতে শুরু করে সমস্যা ও সমাধানের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা। এই সক্রিয় ও বৌদ্ধিক আন্দোলনের সংমিশ্রণকে ‘নিউ ওয়েভ ফেমিনিজম’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৯০-পরবর্তী সময়কালে গড়ে ওঠা থার্ড ওয়েভ মুভমেন্টের একটি বিশেষ অঙ্গ এই লিপস্টিক ফেমিনিজম। নারীবাদী নেত্রী রেবেকা ওয়াকার ১৯৯২-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে প্রথম থার্ড-ওয়েভ শব্দবন্ধের অবতারণা করেন এবং পূর্ববর্তী দ্বিতীয় ধারা থেকে তা কোথায় আলাদা, তারও উল্লেখ করেন। সমস্ত অধিকারের লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে, থার্ড ওয়েভ ফেমিনিজম নারীর শরীরের ওপর তার স্বায়ত্তশাসন (অটোনমি), মেয়েদের স্বাধীন যৌনচেতনা ও ক্যুইয়ার কনসেপ্টকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। একইসঙ্গে কথা বলে জেন্ডার ভায়োলেন্সের মতো নিরন্তর চলতে থাকা সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধেও। দীর্ঘ দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে ঠোঁটে রং লাগানোর মতো বিষয়কে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেশ্যাবৃত্তির লক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত করা হত। থার্ড ওয়েভ ফেমিনিজম-এর অন্তর্গত লিপস্টিক আন্দোলন, সমাজ-নির্ধারিত এই ক্লিশে ধারণার বিরুদ্ধে প্রাথমিক জেহাদ। লিপস্টিক একটি প্রতীকী মাত্র। মেয়েরা ইচ্ছা অনুযায়ী কসমেটিক প্রোডাক্ট ব্যবহার করা মানেই তাকে ‘খারাপ মেয়ে’ হিসাবে চিহ্নিতকরণের যে চিরাচরিত ধারণা, তার বিরুদ্ধে সামগ্রিক প্রতিবাদের রূপক এই লিপস্টিক ফেমিনিজম। রেহানা, লীলা, শিরিন কিংবা ঊষা – সকলেই আদতে, অদ্যবধি চলতে থাকা তৃতীয় ধারার বিপ্লবের শরীকী সত্তা।

    আরতি-অবতরণিকা-মহানগর
    অলংকৃতার ছবি দেখতে দেখতে আমরা ফিরে যাবো ১৯৬৩-তে, যে বছর সত্যজিৎ রায়ের মহানগর ছবিটা মুক্তি পেলো। নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ছোটোগল্প ‘অবতরণিকা’-র পরিবর্ধিত রূপ এই ‘মহানগর’ উপন্যাস, যার কাহিনি অবলম্বনে তৈরি সত্যজিৎবাবুর ছবিটি। ছবির প্রোটাগনিস্ট আরতি মজুমদার মূলত সংসারের আর্থিক সহায়তার জন্য ঘরের চৌহদ্দি ছেড়ে চাকরি করতে বেরোয়। আরতির ইংরেজিভাষী সহকর্মী এডিথ তাকে একটা লিপস্টিক উপহার দেয়। ছয়ের দশকে একজন নিম্ন মধ্যবিত্ত বিবাহিত বাঙালি মেয়ের স্বাধীনযাপন, স্বেচ্ছায় চাকরিতে টিকে থাকা, এবং স্ব-ইচ্ছায় চাকরিতে রেজিগনেশন দেওয়া – আরতির লিপস্টিক প'রে চাকরি করতে যাওয়া এই সামগ্রিক জার্নির অনুষঙ্গে আসে। কিন্তু তৎকালীন মেট্রো সিটির স্বাধীনচেতা মেয়ের যে গল্প বুনতে গিয়ে ‘স্বামীর’ বিদ্রুপে অপমানিত আরতিকে জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে হয় বান্ধবীর সাহসী উপহার, সেই মানিয়ে না নেওয়ার, মেনে না নেওয়ার গল্পই, আজ, ২০১৭-এ এসে অনেকাংশে মুক্ত। ফলত, প্রত্যাখ্যাত ও বিতাড়িত ঊষা তার গুটিকয় জামাকাপড় আর গোটাকতক পর্নোগ্রাফির পৃষ্ঠা নিয়ে রেহানা, লীলা আর শিরিনের সঙ্গে নতুন করে স্বপ্ন দেখার কথা ভাবে। হ্যাঁ, স্বপ্ন। নারীস্বাধীনতার ‘লিপস্টিকওয়ালি সপনে’।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @