মাধবীকে প্রথম অভিনয়ের জগতে এনেছিলেন শিশির ভাদুড়ী

মায়ের হাত ধরে থিয়েটারের রঙিন দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়। তখন অবশ্য তাঁর নাম ছিল মাধুরী। মা লীলা দারুণ পিয়ানো বাজাতেন। গানের গলাও ছিল চমৎকার। অভিনয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল, কিন্তু বাবা শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় আপত্তি হয়ে উঠেছিল সিনেমার নামার পক্ষে বড়ো প্রতিবন্ধকতা। শৈলেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেলে লীলা ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবিতে অভিনয় করেন। তারপর থিয়েটারে কাজ শুরু করেন তিনি। থিয়েটারের মহড়া দেখতে যেতেন ছোট্ট মাধুরী। মহড়া দেখতে দেখতেই তিনি অভিনয়ের সুযোগ পান। শ্রীরঙ্গম ‘সীতা’ নাটক চলছিল। আশ্রমবালিকা আত্রেয়ীয় চরিত্র যে মেয়েটি করছিল, সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন শিশিরকুমার ভাদুড়ী তাঁকে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেন। সেই থেকেই শুরু। শিশির ভাদুরী, তুলসী চক্রবর্তী, ছবি বিশ্বাস, অহীন্দ্র চৌধুরী, সরযূবালা দেবী, প্রভা দেবীর মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে অভিনয় শেখার সুযোগ পেয়েছেন মাধুরী। ইতিমধ্যে শিখে নিয়েছিলেন নাচ এবং গানও।
সিনেমায় তিনি প্রথম অভিনয় করেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘দুই বেয়াই’ ছবিতে। তখন ছিলেন শিশুশিল্পী। তারপর প্রেমেন্দ্র মিত্রেরই ‘কাঁকনতলা লাইট রেলওয়ে’, ‘সেতু’ ছবিতেও কাজ করেন। ‘কাঁকনতলা লাইট রেলওয়ে’ মুক্তি পেয়েছিল ‘দুই বেয়াই’-এর আগেই। প্রথম নায়িকার চরিত্র পেয়েছিলেন তপন সিংহের ‘টনসিল’ ছবিতে। মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবিতে কাজের সুযোগ পান মাধুরী। ছবির টাইটেল কার্ডে মৃণাল চেয়েছিলেন নায়িকা হিসেবে একজন ‘নবাগতা’-র নাম ব্যবহার করতে। এদিকে মাধুরী ততদিনে সিনেমার নায়িকা হয়ে উঠেছেন। এক স্মৃতিচারণায় অভিনেত্রী জানিয়েছেন, ছবির প্রযোজক বিজয় চট্টোপাধ্যায় এবং ভোলা রায় তাঁর নতুন নাম দিলেন, ‘মাধবী’।
ঋত্বিককুমার ঘটক তাঁর ‘কোমলগান্ধার’ ছবিতে জয়া চরিত্রের জন্য মাধবীকে বেছেছিলেন। কিন্তু মাধবী সেই চরিত্রে অভিনয় করতে চাননি। পরে ঋত্বিকের ‘সুবর্ণরেখা’ ছবিতে তিনি কাজ করেন। ১৯৬৩ সালে মুক্তি পাওয়া সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘মহানগর’-এ হয়েছিলেন ‘আরতি’। সত্যজিতেরই ‘চারুলতা’ ছবিতে নামভূমিকায় তাঁর অভিনয় সাড়া ফেলে দিয়েছিল দিকে দিকে। মাধবী ছিলেন সত্যজিতের ‘কাপুরুষ’ ছবিতেও। বাংলা চলচ্চিত্রের তিন মহীরূহ সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল – এঁদের সবার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাই তাঁর হয়েছে। এছাড়াও নানা স্বাদের ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। টিভি ধারাবাহিকেও দেখা গিয়েছে তাঁকে। বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সেরা অভিনেত্রীদের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন মাধবী মুখোপাধ্যায়।
তথ্যসূত্র -
১. মাধবীবিতান, মাধবী মুখোপাধ্যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, পত্রিকা, ২৪ জুন ২০১৭।
২. স্যমন্তক ঘোষের নেওয়া মাধবী মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার, এবেলা, ২ জুলাই ২০১৬।
৩. ঠাকুরের মুকুট সিলিং ছুঁত, মাধবী মুখোপাধ্যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা, রবিবাসরীয়, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।