No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাংলাদেশে ৭১-এর ইতিহাস আজও জীবন্ত

    বাংলাদেশে ৭১-এর ইতিহাস আজও জীবন্ত

    Story image

    “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল ১৯৭১ সালে সংঘটিত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করে।”

    উপমহাদেশের সবথেকে ভয়ংকর সংঘাতগুলির মধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অন্যতম। যার সম্পর্কে উইকিপিডিয়া এন্ট্রির শুরুতে বলা আছে ওপরের কথাগুলি। ১৯৭১ সালের সেই যুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পক্ষে অংশ নিয়েছিল ভারত। নৃশংস গণহত্যা এবং রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম মানসিকভাবে পূর্ববঙ্গের জনসাধারণকে কতটা বিপর্যস্ত করেছিল, তার সঠিক হিসেব নথিপত্রে পাওয়া সম্ভব নয়। 

    জাদুঘরে গৃহীত হচ্ছে ঐতিহাসিক সামগ্রী 

    নবগঠিত রাষ্ট্রের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নানা কারণে বাংলাদেশ তখন বিপর্যস্ত। ১৯৭০ সালে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ভোলা কেড়ে নিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন। নিষ্ঠুর যুদ্ধের প্রবল নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়েছিল। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এরই মধ্যে ১৯৭৫ নাগাদ মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে স্বৈরতন্ত্রের অভিযোগ উঠতে থাকে। বিরোধী মত প্রকাশে বাধা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি – প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়। সেই বছরের আগস্টে রাষ্ট্রপতি মুজিবুর রহমানের বাড়িতে ঢুকে পরিবারের প্রায় সব সদস্য-সহ তাঁকে হত্যা করেন একদল সেনা আধিকারিক। মুজিবের বহু কর্মচারীও নিহত হন। 

    জাদুঘরের গ্যালারি 

    এরপর শুরু হয় দীর্ঘ সামরিক আমল। প্রথমে জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনকাল, তারপর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক আধিপত্য। নব্বই দশকের শুরু পর্যন্ত ছিল এমনই অন্ধকার সময়। তবে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের পটভূমি হিসেবে সামরিক শাসনের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

    নব্বই দশকের মাঝামাঝি নাগাদ বাংলাদেশের স্বনামধন্য কবি, গবেষক, প্রকাশক তথা প্রাবন্ধিক মফিদুল হক এবং তাঁর সাত বন্ধু উপলব্ধি করলেন, নতুন যুগের গোটা প্রজন্ম বেড়ে উঠছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছাড়াই। কারণ, সামরিক শাসকরা নিজেদের ঢাক এত বেশি পিটিয়েছেন, ইতিহাস এমন বিকৃত করেছেন, মুক্তযুদ্ধের চর্চা শোচনীয়ভাবে গিয়েছে কমে। মফিদুল হকের মতে, “স্বাধীনতার পর যখন প্রায় ২৫ বছর পেরিয়ে গিয়েছে, আমাদের সন্তানরা তখনও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খুব একটা অবগত নয়। কেন মুক্তিযুদ্ধ লড়া হয়েছিল, তার মূল্যবোধ কী কী – এসব নিয়ে ভীষণই কম জানে। পাকিস্তান চাইত ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরতে। তার বিপরীতে আমরা বাঙলির উদার, ধর্মনিরপেক্ষ, জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে চাই।” 

    জাদুঘরে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা 

    সাধ আর সাধ্য এক বিন্দুতে মেলে না সবসময়। কিন্তু মফিদুলরা অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। ইতিহাস সংরক্ষণ করতে তাঁরা ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেই উদ্দেশ্যে ১৯৯৫ সালে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট গড়ে তোলেন। “আমাদের মনে জাদুঘর তৈরির ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠেছিল। অতীতের সত্যকে শ্রদ্ধা জানানোর এটিই ছিল সবথেকে কার্যকরী উপায়,” বলেন মফিদুল, “মুক্তিযুদ্ধের ফলে প্রায় সব পরিবারেই কমবেশি ক্ষতি হয়েছে। আমরা বুঝেছিলাম বিকৃতি এবং ধ্বংসের শিকার হতে হতে ইতিহাস এমন জায়গায় পৌঁছেছে, আমরা কাজ শুরু না করলে অনেক কিছুই চিরতরে হারিয়ে যাবে।”

    স্বাভাবিকভাবেই, প্রথম দিকে বাধা ছিল যথেষ্ঠ। মিউজিয়ামের জায়গা খোঁজা, পুরোনো দিনের জিনিসপত্র সংগ্রহ, তহবিলের জোগান – এসব তো ছিলই। এমনকি সামরিক শাসনে পাকিস্থানের নামও উল্লেখ করা হত না। পাকিস্তানি সৈনদলকে বলা হত ‘হানাদার বাহিনী’। তবে কোনো কঠোর নিয়ম এই নিয়ে তৈরি হয়নি। তাই মফিদুলরা স্বাধীনভাবেই কাজ শুরু করতে পেরেছেন। যেভাবে বললে মানুষের মনে প্রভাব ফেলবে, সেভাবেই ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। 

    দুটো বিষয় নিয়ে ধন্দ ছিল শুরুতে। এক, কীভাবে সংগ্রহ করা হবে ঐতিহাসিক সামগ্রী? দুই, কোন সময়কালকে বেছে নেওয়া হবে সংরক্ষণের জন্য? এত বড়ো কর্মকাণ্ড মাত্র আটজনকে নিয়ে সম্ভব নয়, সেটা বুঝেছিলেন তাঁরা। মফিদুলের মতে, “শুরুতে আমরা কমিউনিটি সাপোর্ট চেয়েছিলাম। পরিকাঠামোর তৈরির সামর্থ্য আমাদের ছিল। কিন্তু, সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের জন্য অনেক লোকের সাহায্য দরকার।”

    নবগঠিত রাষ্ট্রের শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নানা কারণে বাংলাদেশ তখন বিপর্যস্ত। ১৯৭০ সালে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ভোলা কেড়ে নিয়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন। নিষ্ঠুর যুদ্ধের প্রবল নেতিবাচক প্রভাব অর্থনীতিতে পড়েছিল। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেন।

    সময়সীমা নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়। কে প্রথম স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ বলেন শেখ মুজিবুর, কারো মতে জিয়াউর রহমান, কেউ বা মনে করেন মৌলানা ভাসানী প্রথম মুক্তির আহ্বান জানান। “আমরা ঠিক করি, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কাল বেছে নেব (এদিন পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পন করে)। সারা দেশ একসঙ্গে লড়াইয়ে যোগ দেয়। প্রথমে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, তারপর সশস্ত্র যুদ্ধ। প্রচুর আত্মত্যাগ জড়িয়ে তাতে। এই মহাকাব্যিক ইতিহাস তথ্য এবং নথির সাহায্যে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। ব্যাখ্যা করতে চাইনি, যাতে দর্শকরা নিজেদের চেতনার আলোকে বিশ্লেষণ করতে পারেন” বললেন মফিদুল।

    জাদুঘরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান


    ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে অর্থ দিয়েছিলেন ৮ জন ট্রাস্টি এবং তাঁদের পরিজনেরা।  সাধারণ জনগণেরা প্রত্যাশার থেকে বেশি দান করেন। নিজের সংগৃহীত ঐতিহাসিক সামগ্রী তুলে দেন। সাধ্যমতো অর্থসাহায্য করেন। “সেলিব্রিটি এবং সাধারণ মানুষ – সবারই যৌথ অধিকারবোধ দেখা গিয়েছিল। সেটাই ছিল আমাদের লক্ষ্য”, মফিদুল বলেন। 

    প্রথমদিকের দাতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত পাইপ, তামাকের মোড়ক, জেল থেকে লেখা চিঠি প্রভৃতি পাঠান তিনি। “বঙ্গবন্ধু থেকে মুক্তিযুদ্ধের সাধারণ কারাবন্দি – মিউজিয়ামে সবার জন্যই আলাদা জায়গা রয়েছে,” মাফিদুল বলেন।

    ঢাকা শহরে ব্রিটিশ যুগে নির্মিত ‘আনন্দ ভবন’ নামের এক দোতলা ভাড়া বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর শুরু হয়েছিল। তারপর স্থান পরিবর্তন হয়েছে। এখন জাদুঘর রয়েছে এক রাজকীয় প্রাসাদে, ঢাকার শের-ই-বাংলা নগরে। ৫৫:৪৫ অনুপাতে সরকারি এবং বেসরকারি অনুদানে সংগ্রহশালা গড়ে ওঠে। আগের থেকে আকারে ৮০ গুণ বড়ো। নতুন ভবনের জন্য সারা বাংলাদেশ থেকে অর্থ সাহায্য আসে। বিএনপি সরকারের বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামি লিগ সরকারের শেখ হাসিনা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পাশে দাঁড়ান। 

    “আমাদের মনে জাদুঘর তৈরির ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠেছিল। অতীতের সত্যকে শ্রদ্ধা জানানোর এটিই ছিল সবথেকে কার্যকরী উপায়,” বলেন মফিদুল হক।

    ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিতে নির্মিত জাদুঘর পৃথিবীর নানা জায়গায় রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর প্রাচীন কালের প্রত্নবস্তুও সংরক্ষণ করে। বাংলার সঙ্গে রোমের বাণিজ্য, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইসলাম ধর্মের প্রভাব, ঔপনিবেশিক যুগ – সবকিছুই তুলে ধরা হয়েছে। অবশ্যই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের জন্য রয়েছে বিশেষ বিভাগ।

    মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ভবন

    এছাড়াও মোবাইল ভ্যানের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। মূলত স্কুলপড়ুয়াদের জন্যই এমন উদ্যোগ। তাতে যথেষ্ট সাড়াও মিলেছে। মফিদুল জানান, “আমাদের জাদুঘর খুব সক্রিয়। প্রকৃত অর্থেই জনগণের জাদুঘর হয়ে উঠেছে। মোবাইল ভ্যান দারুণ প্রভাব ফেলে ছাত্রছাত্রীদের ওপর।” সেমিনার এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয় সাধ্যমতো। 

    আন্তর্জাতিক স্তরেও স্বীকৃতি পেয়েছে এই জাদুঘর। নিউ ইয়র্কের টেনেমেন্ট হাউজ মিউজিয়াম, দক্ষিণ আফ্রিকার ডিস্ট্রিক ৬ মিউজিয়াম, চেক প্রজাতন্ত্রের অ্যান্টি-হলোকাস্ট মিউজিয়াম, সেনেগালের স্লেভ মিউজিয়াম, কম্বোডিয়ার খমের রোগ মিউজিয়ামের মতোই বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। মফিদুল হকের মতে, “স্মৃতির সংরক্ষণ যে কোনো সমাজেই জরুরি। তবে আমাদের বোধ সবে জাগ্রত হওয়া শুরু করেছে।”

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @