পৃথিবীতে অসংখ্য মহামূল্য উপহারের মধ্যে সামান্য চিঠিখানিও কম জিনিস নয়

মানুষ তথ্য, জ্ঞান ও ভাবের আদানপ্রদানের জন্য চিঠি লেখা শুরু করে বহুযুগ আগে। ১৮৩৭ সালে রোল্যান্ড হিল ডাকটিকিট আবিষ্কারের পর চিঠি পায় এক সর্বজনীন ভাষা। চিঠি যখন ব্যক্তিগত আবেদনকে অতিক্রম করে সর্বজনীন রূপ নেয়, তখন তা সাহিত্যে পরিণত হয়, যাকে আমরা বলি পত্র সাহিত্য।
গণেশ পাইনের চিঠির ছবি
শ্রীমতি ইন্দিরাদেবীকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, পৃথিবীতে অনেক মহামূল্য উপহার আছে, তার মধ্যে সামান্য চিঠিখানি কম জিনিস নয়। চিঠির দ্বারা পৃথিবীতে একটা নতুন আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা মানুষকে দেখে যতটা লাভ করি, চিঠি পত্র দ্বারা তার চেয়ে আরো একটা বেশি কিছু পেয়ে থাকি। চিঠিপত্রে যে আমরা কেবল প্রত্যক্ষ আনন্দের অভাব দূর করি তা নয়, ওর মধ্যে আরো একটু রস আছে যা প্রত্যক্ষ দেখা-শোনায় নেই। মানুষ মুখের কথায় আপনাকে যতখানি ও যে রকম করে প্রকাশ করে লেখার কথায় ঠিক ততখানি করে না। এই কারণে, চিঠিতে মানুষকে দেখবার এবং পাবার জন্য আরো একটা যেন নতুন ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এই নতুন ইন্দ্রিয়ের সৃষ্টি শিল্প জগৎকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল। কুশল বিনিময় ছাড়াও ছবির টেকনিক নিয়ে আলোচনা, আদর্শগত চিন্তাভাবনার প্রকাশ, নতুন নতুন জায়গার বিবরণ, নতুন মানুষজনের বিবরণ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার বিবরণ উঠে এসেছে এইসব চিঠিতে।
ভিনসেন্টের চিঠি এবং ছবি
চুমুর দাগ-সহ ফ্রিদা কাহলোর চিঠি
নন্দলাল বসুর চিঠিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পের নমুনা, লোক ঐতিহ্যের সারল্যের নথি, দেশপ্রেম, ছবির আর্কাইভ করার প্রয়োজনীয়তা এমন অনেক কিছুরই বিবরণ পাওয়া যায়। শুধুমাত্র শিক্ষক হিসাবে নয়, চিঠির মধ্যে দিয়ে ব্যক্তি নন্দলাল, অনুসন্ধানী নন্দলাল, গ্রাম সভ্যতার পর্যবেক্ষক নন্দলাল, সৃজনশীলতার মিলন ঘটানোর নন্দলালকে পাওয়া যায় যার পা ছিল মাটিতে, মাথা আকাশে। গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাঁর মেয়েকে লেখা চিঠিতে, প্রশান্ত রায়ের রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা চিঠিতে ভ্রমণের এক অত্যন্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও রসিকতার বিবরণ দেখা যায়। চিঠিতে শীতের কলকাতার এক যথাযথ ছবি লিখেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ তাঁর মেয়েকে। বিদেশি সমালোচকদের চোখ দিয়ে নিজের শিল্পচর্চার যাপনকে দেখে রবীন্দ্রনাথ যামিনী রায়কে লিখেছিলেন, “চিত্রকলার জগতে আমি জাহাজের এক কম্পাসহীন নাবিক।” কারণ তৎকালীন ভারতবর্ষে শিল্পচর্চার যে ধারা তার বাইরে গিয়ে ছবি আঁকতেন তিনি।
ভিনসেন্টের চিঠির ছবি
আরও পড়ুন: রবিকাকা বলতেন ‘অবন একটা পাগলা’
রামকিংকর বেইজ-এর চিঠির ছবি
পাশ্চাত্য শিল্পীদের ক্ষেত্রেও ছবিকে বোঝার জন্য চিঠির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বারেবারে। গঁগ্যাকে লেখা ভ্যান গখের চিঠিতে তাঁর নিজের ঘরের যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আছে তা পরবর্তীকালে সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হয়েছিল তাঁর আঁকা 'দ্য বেডরুম' ছবিটিতে। ছোটো ভাই থিওর সঙ্গে তাঁর গভীর সৌহার্দ্যের সম্পর্ক ছিল - আর্থিক, মানসিক, নৈতিক সবদিক থেকে থিও ছিলেন একমাত্র বিশ্বস্ত নির্ভরস্থল। থিওর সঙ্গে তাঁর নিয়মিত চিঠির আদানপ্রদান ছিল। ভ্যান গখ সম্পর্কে এতদিন যতকিছু লেখা হয়েছে তার একটি প্রধান উৎস এই চিঠিগুলো।
নন্দলাল বসুর চিঠির ছবি
শিল্পীদের নিজস্ব বয়ানে তাঁদের জীবনদর্শন ও ভাবনার কথা উঠে এসেছে তাঁদের চিঠিতে। উঠে এসেছে চারপাশের প্রকৃতি, সমাজব্যবস্থা, মানুষজন, রাজনীতি, ভালোবাসা, আশা-হতাশার হরেকরকম বর্ণনা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর আর্ট ইম্প্রেশেনের উদ্যোগে "চিঠির ছবি, ছবির চিঠি" শীর্ষক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি এইসব চিঠিগুলি দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সঙ্গে ছিল বিশিষ্ট শিল্প-ঐতিহাসিক দেবদত্ত গুপ্তের মনোজ্ঞ আলোচনা। হাতে লেখা নয় ব্যক্তি হিসাবে জড়িয়ে যাওয়ার নমুনা পাওয়া যায় ফ্রিদা কালহোর ঠোঁটের ছাপ দেওয়া চিঠিতে। এছাড়াও এই আলোচনায় উঠে এসেছিল বিনোদ বিহারী মুখোপাধ্যায় থেকে গণেশ পাইন, যামিনী রায় থেকে হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার, রামকিংকর থেকে পিকাসো, জন কনস্টেবল থেকে অ্যালেকজ্যান্ডার ক্যাল্ডর, অঁরি মাতিজ থেকে লুসিয়ান ফ্রয়েডের চিঠি। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ইম্প্রেশনের পক্ষ থেকে শুভদীপ দাঁ। আলোচনার লিংক এবং বেশ কয়েকটি চিঠি সাজানো থাকল এখানে।
আলোচনার লিংকঃ
https://www.facebook.com/story.php?story_fbid=335979017481787&id=100032090749454