বাঘের স্বল্পপরিচিত মাসি বাঘের থেকেও বিপন্ন

বেড়াল বলতেই মূলত মনে আসে দুপুরবেলায় বাড়ির পাঁচিলে গম্ভীর মুখ করে বসে থাকা মজন্তালি সরকার। কিংবা অন্দরমহলে ঘুরঘুর করে টুক করে বিছানায় লাফিয়ে উঠে কোলের কাছে ঘেঁষে আসা একটা তুলোর বল। এছাড়া সাধারণত একটাই পশু মনে আসে – বনবেড়াল। ডোরাকাটা কেঁদো বাঘ। অথচ বেড়াল নামক শ্রেণিটির মধ্যে ৩৭টি ভিন্ন প্রজাতি আছে। সেইসব প্রজাতির মধ্যে অন্যতম হল মেছোবেড়াল। পশ্চিমবাংলায় সুন্দরবন অঞ্চলে এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ধূসর, হাল্কা বাদামি রঙের মাঝারি আকারের বেড়ালটির বৈজ্ঞানিক নাম Prionailurus viverrinus। নলখাগড়ায় বা বাদাড়ে এদের দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু এখানেই যত বিপত্তি, মেছোবেড়ালদের চারণভূমির দ্রুতগতিতে হ্রাস পাচ্ছে। মূল কারণ হচ্ছে শিল্পায়ন। এদের বিচরণ ক্ষেত্র জলা অঞ্চল। সরকারি তথ্য বলছে গত ১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গে জলাভূমি অঞ্চল শতকরা ৪৪ শতাংশ কমেছে। ফলত মেছোবেড়ালও বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রসঙ্গত, এটা খুব কম মানুষই জানেন যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার মেছোবেড়ালকে স্টেট অ্যানিমাল হিসেবে ঘোষিত করেছে ২০১৫ সাল নাগাদ। বেশির ভাগ লোকজনের মধ্যেই এই ভুল ধারণাটা আছে যে রয়াল বেঙ্গল টাইগার পশ্চিমবঙ্গের স্টেট অ্যানিমাল। তথ্য বলছে সুন্দরবনের ডোরাকাটা বাঘের চেয়ে অনেক বেশি বিপন্ন প্রাণী মেছোবেড়াল। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজার্ভেশন অফ নেচার (IUCN), এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটির রেড লিস্টে মেছোবেড়ালকে রাখা হয়েছে, অর্থাৎ এই প্রাণীটি সবচেয়ে বিপন্ন প্রাণীগুলির মধ্যে একটি।
নিজের বাসস্থানে মেছোবেড়াল
সুন্দরবন ছাড়াও এই প্রজাতির বেড়াল দেখা যায় হাওড়া জেলার ডোমজুড় আর পাঁচলা অঞ্চলের নয়নাজুলিতে। হুগলি জেলার ডানকুনির ক্ষয়িষ্ণু জলাভূমিও এদের বিচরণ ক্ষেত্র। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে আজ পর্যন্ত মেছোবেড়ালের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি। প্রাণীগুলির নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করার খাতিরে হয়নি কোনও আদমশুমারিও। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক প্রোফেসর গৌতম সাহা পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটা নির্দিষ্ট জলাভূমিতে মেছোবেড়ালদের আদমশুমারির কিছু কাজ করেছেন। এর ফলে প্রাণী সংরক্ষণ সংক্রান্ত সরকারি, আধা-সরকারি কমিটিগুলোর কাছে মেছোবেড়ালদের সংখ্যা ও বিচরণ ক্ষেত্র নিয়ে আরও তথ্য জমা হয়েছে। এদের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও একটা সম্যক ধারণা তৈরি হচ্ছে। তবে মেছোবেড়ালদের সংরক্ষণ নিয়ে ক্রমপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন ইন্দ্রজিত আদক। ২২ মে ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভূ-বৈচিত্র্য রক্ষার জন্য 'State Bio-diversity' পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। উনি বার্ষিক মূলত হাওড়া জেলা ঘিরেই উনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কাজ করেন, সেই প্রাণীগুলির মধ্যে অন্যতম হল মেছোবেড়াল, ইংরেজিতে fishing cat. গঙ্গার পশ্চিম পাড়, অর্থাৎ হুগলী ও হাওড়ায় এই প্রাণী বাঘরুল নামেও পরিচিত। সারা গায়ে রুলের মতন দাগ আর রোঁয়া থাকার দরুণ লোকমুখে এমন নামের প্রচলন হয়েছে। গঙ্গার পূর্ব পারে, অর্থাৎ দুই পরগণায় নামের একটু অপভ্রংশ হয়ে বাঘরোল হয়ে যায়। ইন্দ্রজিতবাবু জানালেন, এই মেছোবেড়াল বা ফিশিং ক্যাটের সংখ্যা, যা সরকারি ভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে, তা হল কম-বেশি ২৩০০, গোটা দক্ষিণ এশিয়ায়। অথচ চমৎকৃত করার মতন তথ্য হল, ওঁর নিজের আদমশুমারির দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় উনি নিজে যা অনুমান করেছেন, বর্তমানে শুধু হাওড়া জেলাতেই ২০০০ মেছোবেড়াল বিচরণ করে। এই নিশাচর মাংসাশী প্রাণীটির প্রধান খাদ্য হল কাতলা মাছ, বাটা মাছ, শোল মাছ, কাঁকড়া, মেঠো ইঁদুর, বেজি, ছোট পাখি প্রভৃতি। লোকমুখে এই কথাও শোনা গেছে যে মাঝেমধ্যে খাদ্যাভাবে গৃহস্থের বাড়ির বাইরে বাঁধা ছাগশিশুও তুলে নিয়ে গেছে মেছোবেড়াল। তবে এমন ঘটনা বিরল। ইন্দ্রজিত আদক বহু বছর ধরে প্রাণী সংরক্ষণের জন্যে সচেতনতা অভিযান করেন। অর্জন করেছেন বিভিন্ন অভিজ্ঞতা। আদিবাসীদের শিকার উৎসবের ফলে মেছোবেড়ালদের সংখ্যাসহ অনেক বিপন্ন প্রাণীরই সংখ্যা হ্রাস পায়, উনি জানান। গ্রামের মানুষদের কাছে গিয়ে ইন্দ্রজিতবাবু ওনাদের বিশদের বোঝান যে মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গের সহাবস্থান প্রকৃতিকে আরও সুন্দর করে তোলে। পরিবেশের স্বাস্থ্য টিকিয়ে রাখে। কিছু ক্ষেত্রে গ্রামের লোকদের একটা উৎসুক প্রবৃত্তি কাজ করে মেছোবেড়ালের মতো প্রাণীর ক্ষেত্রে। তারা প্রাণীটিকে অনেক সময়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তবে ইদানীং ইন্দ্রজিতবাবুর সচেতনতা অভিযানের কারণে এটা কমেছে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে সরকারের তরফ থেকে আরও অনেক উদ্যোগ প্রয়োজন আছে মেছোবেড়ালের প্রজাতিটিকে বিপন্ন প্রাণীর তালিকা থেকে বের করে আনার জন্যে।
আরও পড়ুন
জাতক গাছের গল্প
শিকারের অপেক্ষায় মেছোবেড়াল
প্রচলিত নামে বেড়াল থাকার জন্যে প্রাণীটিকে হয়ত একপ্রকার তাচ্ছিল্য করা হয়। এই বাংলার প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদা দেওয়া হয় বাঘকে। সেই রয়াল বেঙ্গল টাইগারের মতোই, মেছোবেড়ালও একটি বিরল প্রজাতির প্রাণী, আর অনেক বেশি বিপন্ন। এই বাংলার ভূখণ্ডে তারও বাঘের মতোই সমান অধিকার আছে।